কথার বন্ধু

জসীম মেহবুব

বুধবার , ২১ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
26

কথার মা ছাদে বাগান করেছেন। বিভিন্ন টব, বালতি আর ড্রামে হরেক রকম শাক- সবজি ও ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। প্রতিদিন সকাল-বিকেল ছাদবাগানে পানি দেন তিনি। পানি দেয়ার সময় কথা তার মায়ের পাশে পাশে থাকে। বাগানে ঘুরে বেড়ায় আর গাছের সাথে কথা বলে। গাছের সাথে কী কথা বলে কথা? তা কথা-ই জানে। কথার মা লক্ষ্য করেছেন, একটু আড়াল গিয়ে কথা গাছের সাথে কথা বলে। মায়ের চোখে চোখ পড়লেই কথা বন্ধ হয়ে যায় কথার। মা মুচকি হাসেন।
কথার কোন বন্ধু নেই। এখনও স্কুলে যাবার বয়স হয়নি ওর। মা একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত তিনি স্কুলেই থাকেন মা। বাবা সারাদিন অফিসে থাকেন। সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেন। এ সময় কথা বাসায় একা। অবশ্য তাদের কাজের বুয়া সে সময় বাসায় থাকেন। থাকলে কী হবে ? বুয়া সারাক্ষণ থাকেন বাসার টুকটাক কাজে। বুয়াকে কিছু জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘‘ আমার অনেক কাজ আফা। কাজ শেষ করতি না পারলি আম্মা আমারে বকবেন। ’’ তাই কথা অপেক্ষা করে মায়ের জন্য।
কথার মা স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছেন। বুয়া কথাকে খাইয়ে দিয়ে ঘুমুতে বলেছেন। কিন্তু কথার চোখে ঘুম নেই। সে রাজ্যের কথা ভাবছে। মা বাসায় ফিরতেই লাফ মেরে উঠে পড়ে। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে, এত দেরী করলে কেন মা? মা হেসে বলেন, কোথায় দেরী মা? ঠিক সময়ই তো এলাম। না, তুমি দেরী করেছ অভিযোগ কথার।
মা ফ্রেশ হয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে কথাকে নিয়ে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ঘুমোও নি কেন মা? ঘুম আসছিল না তাই। কথা জবাব দেয়। আচ্ছা এসো, এবার আমার সাথে ঘুমিয়ে নাও। কথা মা’র গলা জড়িয়ে শুয়ে পড়ে। মা ওকে ছড়া শোনান। গল্প শোনান। একসময় ঘুমিয়ে পড়ে কথা। মাও ঘুমিয়ে পড়েন।
বিকেলে ছাদবাগানে পানি দিতে ওঠেন মা। মা’র সাথে কথাও ওঠে। কথার চোখে-মুখে আনন্দ ঠিকরে পড়ছে। খুশিতে লাফাতে থাকে সে। মা গাছে পানি ঢালেন আর আড়চোখে কথার দিকে তাকান। কথা একটি বেলি ফুলের সাথে কথা বলছে। জানো বেলিফুল, আমার না কোন বন্ধু নেই। তুমি যদি আমার বন্ধু হতে, খুব ভালো হত। এ কথা বলে মায়ের দিকে তাকায় সে। মা না দেখার মত করে গাছে পানি দেন। এরপর গোলাপ ফুলের কাছে যায়, আস্তে আস্তে বলে, কেমন আছ লাল গোলাপ? তোমাদের কত বন্ধু। অথচ দেখ আমার কোন বন্ধু নেই । এভাবে সব ফুলের কাছে যায় সে। একই কথা বলে ওদেরও। মা বুঝতে পারেন কথার দুঃখটা। কথা ফুলের সাথে কথা বলে। গাছের সাথে কথা বলে। কখনও ছোট্ট লেবুর সাথেও কথা বলে সে । কথার দুঃখে মা’র মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু কী করবেন মা? তিনি সকাল নয়টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত স্কুলে থাকেন। সেখানে বাচ্চাদের পড়ান । চাকরি না করেও পারছেন না। শুধুমাত্র কথার বাবার আয় দিয়ে সংসারের সব অভাব মিটছে না। তাই তিনি চাকরিটা নিয়েছেন। কিন্তু সমস্যাও হচ্ছে। কথা এ সময় একা থাকে। ওর একাকীত্ব মাকে গভীর ভাবে ভাবায়। আজ শুক্রবার। গ্রাম থেকে কথার নানা-নানি এসেছেন। সেই থেকে কথার আনন্দ আর ধরে না। সারাক্ষণ-ই নানাভাই আর নানির সাথে ঘুর ঘুর করছে কথা। রাজ্যের কথা আর প্রশ্নবাণে তাদের মাতিয়ে রেখেছে সে। নানা নানিও খুশি। কথাকে আদরে আদরে ভরিয়ে রেখেছেন। দুপুরে খাবার টেবিলে খেতে বসেছেন সবাই। কথাকে চেয়ারে বসিয়ে মা-ই খাইয়ে দিচ্ছেন। কথা কথার তুবড়ি ফুটিয়ে চলেছে। মা বলছেন, আগে খেয়ে নাও মা। পরে কথা বল। কে শোনে কার কথা? তার সব অভিযোগ নানুভাইয়ের কাছে। মা-বাবা ওকে সময় দেন না। কথা বলার কেউ নেই। এখন নানাভাই আর নানি এসেছেন। ওদের সাথেই কথা কথা বলবে। মা বলল, আচ্ছা আচ্ছা। সব ঠিক আছে। আগে খেয়ে নাও মা। খেয়ে নাও। না আগে বল, নানুভাই আর নানি চলে যাবেন না তো? চলে গেলে আমি খাবো না। খুব রাগ করবো।
বিষয়টি কথার নানা নানিকেও খুব ভাবায়। সবাই ব্যস্ত। এই ব্যস্ত সময়ে তার নাতনিকে সময় দেয়ার কেউ নেই। এভাবে চলতে পারে না। কথাকে ওরা কী করে কথা দেবে যে, এখানে থাকবে। চলে যাবে না। অথচ চার-পাঁচদিন পর ওদের গ্রামে ফিরে যেতে হবে। কত কাজ সেখানে। একদিন ঠিক ঠিক সময় ফুরিয়ে আসে। কথার নানা-নানি গ্রামে ফিরে যাবেন। বিষয়টি জানতে পারে কথাও। সেই থেকে কথার কথা বলা বন্ধ। মুখে কোন রা নেই। খুব মন খারাপ ওর। খাওয়া দাওয়া বন্ধ। মা খুব ভাবনায় পড়েছেন। বাবাও ভাবছেন কী করা যায়? হঠাৎ সিদ্ধান্ত দেন কথার বাবা। দুদিন ছুটি নিয়ে সবাই গ্রামে যাবেন। কথাটা তিনি কথার নানা-নানিকে বললেন। আর একদিন দেরী করে সবাই এক সাথে গ্রামে যাবেন। এই সিদ্ধান্তে ঘরে আনন্দের বন্যা বইলো। কথা নাচতে শুরু করে দিল। নানু বাড়ি যাবো। নানু বাড়ি যাবো। ট্রেনের জানালার পাশে বসে সবুজ প্রকৃতি দেখছে কথা। সব শো শো করে পেছন দিকে ছুটছে। মাকে জিজ্ঞেস করে কথা, মা সব পেছন দিকে ছুটছে কেন? মা জবাব দেন, আসলে আমরাই ছুটছি, তাই মনে হচ্ছে ওরা ছুটছে। কথার মা ট্রেনে বসে ভবছেন, তাদের তো তিন-চারদিন পর শহরের বাসায় ফিরতে হবে। কথা আবার একা হয়ে যাবে। কী হবে তখন? কথা যদি আবার মন খারাপ করে? তাহলে উপায়? কথাটা তিনি কথার বাবাকে বললেন। কথার বাবা বললেন, কোন চিন্তা নেই। সব সমাধান হয়ে যাবে। সামনে আমার বড় একটা প্রমোশন হচ্ছে। তখন আমার বেতন অনেক বেড়ে যাবে। তোমাকে আর চাকরি না করলেও চলবে। তখন তুমি বাসায় থেকে কথাকে সময় দেবে। ব্যস সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। চাকরি ছাড়ার কথা ভেবে কষ্ট হলেও কথার কথা ভেবে মা খুশি হলেন। কথার জন্য তিনি সব করতে পারেন।
চারদিন গ্রামে বেড়িয়ে কথারা শহরের বাসায় ফিরে এল। কথা মুখ গোমড়া করে বসে আছে। মা কথাকে বললেন, মামণি চিন্তা করো না, এবার থেকে আমিই তোমার সারাদিনের বন্ধু । আমি থাকবো তোমার সাথে। সারারাত সারাদিন । কথা খুশিতে লাফিয়ে ওঠে । ওর চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক।
দুইদিন পর সকালে কথাকে নিয়ে মা ছাদে উঠেছেন। গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে তাই পানি দিচ্ছেন। কথাও সাথে আছে। হঠাৎ খেয়াল করেন, কথা পাশে নেই। একটু দূরে চোখ ফিরিয়ে দেখেন, কথা ফুলের সাথে কথা বলছে। জানো ফুল বন্ধুরা, আমার সারাক্ষণের বন্ধু পেয়ে গেছি। এখন মা-ই আমার সারাদিন সারারাতের বন্ধু। তাই বলে তোমরা কি পর হয়ে যাবে? তা কিন্তু নয় । তোমরাও বন্ধু। সকাল-বিকেল তো দেখা হচ্ছেই। এখন আমার অনেক বন্ধু। তবে সবচেয়ে বড় বন্ধু হলেন আমার মা বন্ধু। আর তোমরা হলে ফুল বন্ধু । ভালো থেক ফুল বন্ধুরা। ভালো থেক। কেমন?

x