কত অজানারে

ডা. অঞ্জনা দত্ত

মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
34

কিছু মজার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। কিছুদিন আগে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র , চট্টগ্রাম এ যাই। ওখানকার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হারুন আমাদের বন্ধু হন। তিনিই খবর পাঠালেন তাঁর ওখানে ব্রুনেই সুলতানি আম ধরেছে। এই আমের বিশেষত্ব হলো এটি অনেক বড় হয়। ওজন প্রায় আড়াই / তিন কেজির মত হয়। ব্রুনেই তে ৫ কেজির মত হয়। ব্রুনেই রাজপ্রাসাদে এই আমের চাষ হয়ে থাকে। আমাদেরই এক স্বদেশী ওখানে চাকরি করতেন। তিনি দেশে আসার সময় ঐ আমের চারা নিয়ে আসেন এবং নিজ বাড়িতে চাষ করেন। ইতোমধ্যে এই আম মাগুরায় বাজারেও এসেছে। কৃষি গবেষণা ইন্সটিট্যুট এই আম নিয়ে গবেষণা করছে।এর কোয়ালিটি নিরূপণ করে এটির চাষ দেশে জনপ্রিয় করার প্রথম পদক্ষেপের অংশ হিসাবে। আমরা যে গাছটি দেখেছিলাম সেটি বছরখানেক আগে লাগানো হয়েছিল। গাছটি এখনো অনেক ছোট। যে কয়েকটি আম ধরেছিল তার মধ্যে মাত্র একটি আম ছিল গাছে। কেননা আমের ভারে গাছ নুয়ে পড়ছিল। যে আমটি গাছে ছিল তার ওজন আড়াই কেজি।
বাগানের অন্যদিকে গিয়ে দেখতে পেলাম ড্রাগন ফলের গাছ থরে-থরে দাঁড়ানো। কাপ্তাই এর রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র্‌েও দেখেছিলাম। এই সময়টায় ড্রাগন ফলের ফলন হয়ে থাকে। আর সে পদ্ধতির একটা অংশ (স্টেপ) দেখার সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করতে চাইলাম না। ড্রাগন ফলের ফুলগুলি নাইট কুইন ফুলের মত, তবে আকারে অনেক বড়। রাত দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ ফুল ফোটা শুরু করে। ভোরবেলায় ফুলগুলো বুজে আসতে আসতে সকাল ৮টা নাগাদ ফুলগুলো পুরোপুরি বুজে যায়। আর ঐ ফুল থেকে ফল বের হয়। ফুল ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের সুঘ্রাণে কীটপতঙ্গ ছুটে আসে। আর এইভাবে পরাগায়ন হয়ে থাকে। হারুন সাহেব জানালেন এখন পরাগায়নের সময়। আমরা দশটা নাগাদ গেলে এই দৃশ্য দেখতে পাব। আমরা কপোত কপোতী রাত দশটা নাগাদ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে হাজির হলাম। বিশাল সাইজের ড্রাগন ফুলের সৌন্দর্য দেখে মোহিত হলাম । আর কি তীব্র সুঘ্রাণ চারদিকে! ঐ সময়টায় যদিও কীটপতঙ্গদের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার কথা। কিন্তু ওই যে ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না ’ এরাও প্রকৃতির নিয়মে ঘুম থেকে ধড়ফড় করে জেগে উঠে ছুটে আসে মধু পান করতে। আর এভাবেই ঘটে যায় পরাগায়ন। ড্রাগন ফল সচারাচর ম্যাজেন্টা রঙ-এর দেখা যায়। হারুন সাহেব জানালেন নীল , হলুদ , কালো ইত্যাদি রঙেরও দেখা যায়। ফুলগুলোও ঐ রঙ-এর হয়ে থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশে ড্রাগন ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা শুরু হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এর ব্যাপ্তি আরও বাড়বে বলে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
ড্রাগন ফল ছাড়া আর একটি গাছ দেখেছি যেটি অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশে অনেকের ভাগ্যের চাকা বদল করে দিতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আর সেটি হলো কফি গাছ। এ্যারাবিক কফি। কিছুদিন আগে খাগড়াছড়ি গিয়েছিলাম একটা ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে রোগী দেখতে। রাত্রিবাস ছিল খাগড়াছড়িতে ইঅজও (Bangladesh Agriculture Research Institute)’র অতিথি আলয়ে। ড.হারুনই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ওখানকার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুন্সি রাশেদ হাসান এর অতুলনীয় আতিথেয়তার পাশাপাশি কফি চাষ এবং কাজু বাদাম চাষের বিশাল সম্ভাবনার কথা শুনে অনাগত সোনালী দিনের কথা ভেবে আনন্দে চোখ ভিজে উঠেছিল। খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র আড়াই শত একর জমিতে বিভিন্ন ফলের চাষ করে থাকে গবেষণা কাজের জন্য। এরমধ্যে কফি অন্যতম স্থানে রয়েছে। কফির চাষ বাণিজ্যিকভাবে শুরু না হলেও কাজু বাদামের চাষ শুরু হয়েছে। বান্দরবানের রুমা ও থানচীতে কাজু বাদামের ফলন হয় প্রচুর। তবে কফির আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখার জন্য যে প্রসেসিং প্ল্যান্ট এর প্রয়োজন সেটি আমাদের দেশে নেই। একই সমস্যা কাজু বাদাম নিয়ে। যথাযথভাবে প্রসেসিং না হওয়ায় এখানে উৎপাদিত কাজু বাদামের মান ভাল নয়। এই মেশিনটি অত্যন্ত দামি হওয়ায় বেসরকারিভাবে বিনিয়োগ করতে কেউ এগিয়ে আসছে না। আরও মন খারাপ করা খবর হলো আমাদের দেশ থেকে কফি বীনস নিয়ে সেগুলো প্রসেসিং-এর মাধ্যমে পান করার উপযোগী করে ভিয়েতনাম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। ভিয়েতনাম নিজেরা ৫০০০ টন কফি উৎপাদন করে আর ১৬০০০ হাজার টন কফি রফতানি করে। বাকি কফি তারা বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশ হতে আমদানি করে। তবে শুনেছি বর্তমান কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এবং সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এই বিষয়ে নজর দিচ্ছেন এবং কৃষি গবেষণায় নিযুক্তদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। এখানে ছবিতে কফি গাছে কফির বীন থেকে শুরু করে কফির পাউডার বানানোর কয়েকটি ধাপ দেখানো হয়েছে। খাগড়াছড়ি থাকাকালীন বিটিভির একটি টিমের সাথে পরিচয় হয়। তারা ড্রাগন ফলের চাষ এবং এর বাজারজাতকরণ নিয়ে বিটিভিতে কৃষি সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে প্রচার করার জন্য তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে এসেছেন। তারা যে বাগানে গিয়েছিলেন সেই বাগান থেকে ইতিমধ্যে ১২০০ কেজি ড্রাগন ফল বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে। আরও ১২০০ কেজির মতো ড্রাগন ফল বাজারজাত করার সক্ষমতা তাঁদের রয়েছে। এখানে প্রতি কেজি ফল ৪০০ টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে। ফসলের ন্যায্যমূল্য পেলে চাষীরা এবং অন্যান্য অনেকেই চাষের ব্যাপারে উৎসাহিত হবেন। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের মাঠ পর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং মধ্যসত্বভোগীদের শক্তহাতে নিয়ন্ত্রণ করা। এই কাজগুলো ঠিকভাবে করতে পারলে আমাদের দেশ অচিরেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।

x