কতটা সমাধান এলো সংলাপ থেকে

আন্দোলন জোরদারের কথা বলছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা ।। ভোট পেছানোর প্রস্তাবে অপশক্তি ফেরানোর বাহানা : কাদের।। আলোচনার দরজা খোলা

ঢাকা ব্যুরো

বৃহস্পতিবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ
304

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা শেষে গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বিভিন্ন রাজনীতিক দলের সাতদিনের সংলাপ শেষ হয়েছে। তবে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সংলাপে আগামী নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কতটুকু সমাধান হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। সংলাপের ফলাফল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আজ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করার কথা থাকলেও ‘অনিবার্য কারণবশত’ তা স্থগিত করা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টও তাদের সাতদফা দাবিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাড়া না পেয়ে আন্দোলন জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নির্বাচন পিছিয়ে সংসদের মেয়াদপূর্তির পরের ৯০ দিনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার আদলে ভোট করার দাবি তুলেছেন উল্লেখ করে তা ‘অপশক্তিকে’ ফেরানোর বাহানা বলে মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে তা কাঠোর হস্তে দমনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। প্রধান দুই জোটের পাল্টাপাল্টি এমন বক্তব্যে কার্যত সংলাপের সাফল্য নিয়ে সন্দেহ সংশ্লিষ্টদের। তবে সংলাপ শেষ হলেও আলাপ-আলোচনার দরজা এখনো খোলা রয়েছে বলে জানান ওবায়দুল কাদের। গত সাতদিনের আলোচনায় কী অর্জন হলো, রাজনীতির চলমান জট কী খুলবে, নাকি ফের আন্দোলনেই সমাধান, সংলাপের টেবিল থেকে কোথায় যাচ্ছে রাজনীতি- এমন সব বিষয় এখন সামনে চলে আসছে।
আন্দোলন জোরদারের কথা বলছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা : গতকাল সংলাপ শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা যে প্রস্তাব দিয়েছি, তা জনগণেরই দাবি। সরকার যদি তা মেনে না নেয়, আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা আন্দোলনের অংশ হিসেবেই এই সংলাপে অংশ নিয়েছি। আগামী শুক্রবার রাজশাহীতে আমাদের সমাবেশ হবে। যদি নির্বাচন কমিশন কাল (আজ বৃহস্পতিবার) তফসিল ঘোষণা করে, তাহলে আমরা
নির্বাচন কমিশন অভিমুখে পদযাত্রা করবো।’ নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না সংলাপকে ‘আপাতত অসফল’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে কারণে রাজনৈতিক সংকট, তা আমরা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছি। সংসদ ভেঙে না দিয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন না করলে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না। সংকট মূলত এখানেই। ক্ষমতাসীনরা মূলত এই প্রশ্নে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন। অথচ সংবিধানেই সমাধান রয়েছে। মানুষের কল্যাণেই সংবিধান, আর সংবিধান বহুবার সংশোধন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হলে সবার মঙ্গল। নইলে আন্দোলনের বিকল্প থাকবে না, আর তাতে নতুন করে কোনো সংকট সৃষ্টি হলে সরকার দায় এড়াতে পারবে না।’
ভোট পেছানোর প্রস্তাবে অপশক্তি ফেরানোর বাহানা : আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আলাপ-আলোচনা চলবে, তবে ডায়লগ শেষ।’ তিনি আরো বলেন, ‘তাঁরা নির্বাচন পেছানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাতে উভয় পক্ষেরই বিপদ হতে পারে। তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিতে পারে। তাই নির্বাচন সরকারের মেয়াদের শেষ তিন মাসের মধ্যেই হবে। সংবিধানেও তাই বলা আছে। আর তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে ১০ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ গঠনও সম্ভব নয়। সম্ভব নয় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন। এই সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। তাঁরা সংবিধানের মধ্যে থেকে এসব প্রস্তাব দেয়ার কথা বললেও আসলে এগুলো সংবিধানের বাইরে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তাঁরা খালেদা জিয়ার জামিন চেয়েছেন। আদালত যদি জামিন দেয়, তাহলে তো আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। আর আমরা আইনমন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছি। তাঁরা যে মামলার তালিকা দিয়েছেন, তদন্তে যদি রাজনৈতিক মামলা পাওয়া যায় তা প্রত্যাহার করা হবে।’ কাদের বলেন, ‘তাঁদের কয়েকটি দাবি তো আমরা মেনেই নিয়েছি। লেভেল প্লেইং ফিল্ড তো নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করবে। আমরা সহযোগিতা করব। আমাদের কোনো মন্ত্রী, এমপি সরকারি সুযোগ-সুবিধা নির্বাচনের সময় ব্যবহার করবেন না। মন্ত্রীরা গাড়িতে পতাকাও ব্যবহার করবেন না। আর তাঁরা সভা-সমাবেশ সবই করতে পারবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি বলেন, ‘লং মার্চ বা রোড মার্চ তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাঁরা তা করবেন। কিন্তু যদি আগের মতো বোমাবাজি বা সন্ত্রাস করে, তাহলে তো ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তাঁদের মূল দাবিগুলোই তো মানা হয়নি, এমন মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এখনো আলাপ-আলোচনা শেষ হয়নি। আরো আলাপ-আলোচনার সুযোগ আছে।’
এদিকে সংলাপের আলোচ্য বিষয় নিয়ে দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘একমাত্র সংলাপেই সমাধান আসবে- এমন সভ্য জাতি এখনও আমরা হইনি। রাজনীতিতে সংলাপ আগেও দেখেছি। ব্যর্থ হয়েছে। আবার সংলাপকে কেন্দ্র করেই নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। সংলাপ আলোচনায় সাধারণ মানুষের ভরসা কতটুকু ছিল সেটাও এখন প্রশ্নের ব্যাপার। কারণ লোক দেখানো সংলাপ এবং এর ফলাফল নিয়ে জনগণ অবগত।’
তারা আরো বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আন্দোলনের সঙ্গে সবাই পরিচিত। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এদেশে পরিবর্তন এসেছে।’ গত সাতদিনের সংলাপে সংকট উত্তরণে দৃশ্যমান কোনো পথ বের হয়নি বলেও মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা।
একই ধরনের মন্তব্য করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, ‘বল সরকারের কোর্টে এবং তা যথাযথভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। সংলাপের সময়ও আমরা গ্রেফতার, মামলা দেখছি। আগামীকাল (আজ) তফসিল। রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার হচ্ছে এখনও। এ থেকেই প্রমাণিত হয় আসলে সংলাপের অর্জন কী?
‘রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সংকট আরও বাড়বে’ উল্লেখ করে তারা বলছেন, ‘২০১৪ সাল আর ২০১৮ সাল এক বিষয় নয়। সরকার নিজেও তা উপলব্ধি করছে। আঞ্চলিক রাজনীতিও পরিবর্তন হচ্ছে। আন্দোলনে যে সমাধান আসে, তা টেকসই হয় না। সুতরাং আপাতদৃষ্টিতে সংলাপ ব্যর্থ হলেও আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। এজন্য হয়তো আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।’
সমপ্রতি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চিঠির জবাবে সংলাপে বসার আহ্বান জানান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। ১ নভেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে টানা সাতদিন সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা জোটের সঙ্গে একবার করে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দুই দফা বৈঠকে বসে ক্ষমতাসীনরা। মূলত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার সংলাপ নিয়েই নানা আগ্রহ এবং কৌতূহল দেখা দেয় রাজনীতিতে। তবে এখনও উভয়পক্ষ তাদের স্ব-স্ব অবস্থানে অনড়।

x