কঠোর পুলিশ, তবুও থামছে না ইভটিজিং

ঋত্বিক নয়ন

বৃহস্পতিবার , ১৩ জুন, ২০১৯ at ৪:৫১ পূর্বাহ্ণ
70

উত্ত্যক্তকারীকে শাস্তি প্রদান এবং কিশোরী, তরুণীদের স্বস্তিদানের লক্ষ্যে চট্টগ্রামে অন্তত পাঁচ বছর আগে ইভটিজিং প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল পুলিশ। উদ্যোগটি কিছুদিন চলমানও ছিল। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রীতিমতো মিডিয়াকে জানিয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে ছাত্রীদের অভয় দেয়ার পাশাপাশি জরুরি ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরে এসে সব থেমে যায়। এরই সুযোগে ইভটিজাররা আবারো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাদের অত্যাচারে মেয়েরা অনেক সময় আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। হত্যারও শিকার হচ্ছে। তবে আশার কথা হল, এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কিশোরী, তরুণীরা। প্রতিবাদ করছে, এমনকি ইভটিজারদের ধরে পুলিশে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির ২০১৮ এর গবেষণা প্রতিবেদনে ইভটিজিং বা যৌন হয়রানির পেছনে আটটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই গবেষণায় বলা হয়- পারিবারিক ও সামাজিক রীতিনীতির লঙ্ঘন, বেকারত্ব ও হতাশাব্যঞ্জক জীবন, মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি ও সুস্থ বিনোদনের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক অবহেলা, আর্থ-সামাজিক কাঠামো, চলমান অবস্থা থেকে শেখা এবং একে অপরের প্রতি মর্যাদা ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব থেকেই ঘটনাগুলো ঘটছে।
তবে ইভটিজারদের বিরুদ্ধে নানাভাবে পুলিশ সক্রিয় আছে জানিয়ে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট প্রধান উপ-পুলিশ কমিশনার মো. শহীদুল্লাহ আজাদীকে বলেন, বর্তমানে ইভটিজিং বা যৌন হয়রানি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটের মতো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে, কেউ এর থেকে নিস্তার পাচ্ছে না। এটা এক ধরনের অবর্ণনীয় নির্যাতন। সাম্প্রতিককালে তা আরো বাড়ছে। এখন আর সামাজিক ব্যাধি বা মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে নয়; এটা চিহ্নিত হচ্ছে সামাজিক বিপর্যয় রূপে। এর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতার বিকল্প নেই বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।
একই প্রসঙ্গে সিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মো. আবদুর রউফ আজাদীকে বলেন, ইভটিজিং প্রতিরোধে পুলিশ সবসময় হার্ডলাইনে। আমরা স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ইভটিজারদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসার সাহস যোগাচ্ছি। এর সুফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের মধ্যে যে সচেতনতার সৃষ্টি হচ্ছে, তার বড় দৃষ্টান্ত কলেজ ছাত্রী ফারহানা নওরীনের প্রতিবাদী হয়ে উঠা কিংবা বাঁশখালীর বাহারছড়া রত্নপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রতিবাদ করতে ইউএনওর শরণাপন্ন হওয়া।
গত ৬ জুন আনোয়ারায় মায়ের পাশে ঘুমিয়ে ছিল লিমা আকতার (১৪)। কিন্তু রাত ৩টার দিকে তার মা ঘুম থেকে উঠে দেখেন পাশে মেয়ে নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মেয়ের লাশ দেখতে পান পাশের ডোবায়। খবর পেয়ে ডোবা থেকে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। লিমার ভাই মো. হান্নান বলেন, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. জামাল লিমাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। ঘটনার কয়েকদিন আগেও সে লিমাকে কুপ্রস্তাব দেয়। তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে এই পরিণতি ভোগ করতে হয়।
গত ২৪ এপ্রিল সকালে নগরের মোগলটুলির বাসায় এক পোশাককর্মী ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে ডবলমুরিং থানায় দায়েরকৃত মামলায় নিহতের বোন অভিযোগ করেন, বাদশা নামে এক যুবক নিয়মিত তাকে উত্ত্যক্ত করত। ক্রমাগত যৌন নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে তার বোন আত্মহত্যা করেছে। মেয়েটি মৃত্যুর আগে কিছু না বললেও যৌন হয়রানির মামলা তদন্ত করতে গিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি প্রকাশ পায়। অভিযুক্ত বাদশাকে গ্রেপ্তারের পর তার স্বীকারোক্তি থেকে পুরো ঘটনা জানা যায়।
১১ এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকায় চলন্ত বাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক ছাত্রী লাঞ্ছিত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় ওই ছাত্রী বাদী হয়ে বাসের চালক ও হেলপারকে (অজ্ঞাত) আসামি করে মামলা করে। বিষয়টি নিশ্চিত করে থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন আজাদীকে বলেন, এ ঘটনায় বাসের চালক বিপ্লব দেবনাথকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাসটিও জব্দ করা হয়েছে।
বাঁশখালী বাহারছড়া রত্নপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা আসা যাওয়ার পথে উত্যক্ত করত বোরহান উদ্দিন (১৪) নামে এক কিশোর। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার ছাত্রীদের সঙ্গে তার হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। সর্বশেষ গত ৯ মার্চ অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে সে উত্যক্ত করে। তবে ওই ছাত্রী প্রতিবাদ করলে তাকে পথেই চড়-থাপ্পড় মারে বোরহান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোমেনা আক্তার বিষয়টি জানতে পেরে বোরহান ও তার অভিভাবক থেকে মুচলেকা নেন।
গত ৬ মার্চ চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রী ফারহানা নওরীন রিকশায় চেপে বাসায় যাচ্ছিল। পথে মোটর সাইকেল নিয়ে দুই বখাটে যুবক তাকে অনুসরণ ও বিভিন্ন ধরনের অশালীন মন্তব্য করে। একপর্যায়ে তার ওড়না ধরে টানও দেয়। এ ঘটনায় জড়িত তানভীর আহমেদ ছিদ্দিক (২৫) নামে একজনকে গত ১৬ মার্চ ভোরে বাকলিয়া থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পাশাপাশি তার মোটরসাইকেলটিও জব্দ করা হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সমীক্ষা অনুসারে, গত বছর সারাদেশে উত্যক্তের শিকার হয়েছেন ১৪০ জন নারী, যার মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একটি প্রতিবেদনে যৌন হয়রানিকে সাম্প্রতিককালের উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয়, উৎপাত শুধু মেয়েটির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; আক্রান্ত হচ্ছেন বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও।

x