কক্সবাজারে ৫৪ জনের তালিকা ধরে অভিযান শুরু টাস্কফোর্সের

চকরিয়ায় কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতার বাড়ি তল্লাশি, নারীসহ দুই ইয়াবা কারবারির সাজা

চকরিয়া প্রতিনিধি

শুক্রবার , ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ
344

কক্সবাজারে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে এবার গডফাদার পর্যায়ের তালিকা ধরে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে ট্রাস্কফোর্স। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক দেশের সকল জেলার ন্যায় কক্সবাজারেও মাদক কারবারে জড়িত রয়েছে এমন ৫৪ জন গডফাদারের একটি ‘হিটলিস্ট’ তৈরি করা হয়। যে তালিকায় রয়েছে এমপি থেকে শুরু করে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি এবং হোয়াইট কালার পোশাক পড়ে থাকা কতিপয় নেতাও। সেই গডফাদারদের ধরতে জেলা প্রশাসন থেকে গঠন করে দেয়া হয় টাস্কফোর্স। সেই টাস্কফোর্স গতকাল বৃহস্পতিবার চকরিয়ায় অভিযান শুরু করে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী। সাথে ছিলেন জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) আবদুল মালেক তালুকদার, ডিবি পুলিশ ও আনসার ব্যাটালিয়ানের বিপুল সংখ্যক সদস্য। ছিলেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও। অভিযানের আগে অবহিত করা হয় চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ওসিকেও।

টাস্কফোর্স সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমদিনে চকরিয়া পৌরসভা এলাকার তালিকাভুক্ত দুইজনের বাড়িতে অভিযান চালানো ছাড়াও খুটাখালী ইউনিয়নের দুই ইয়াবা কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছেন একজন নারীও। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে বেশকিছু ইয়াবা পাওয়ায় একজনকে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং নারীকে ৬ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

কারাদণ্ড প্রাপ্ত দুই ইয়াবা কারবারি হলেন উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর পাড়ার মৃত মৌলভী মোহাম্মদ হোছাইনের ছেলে মৌলভী মোক্তার আহমদ (৪২)। এ সময় তার হেফাজত থেকে ৪০ পিস ইয়াবা পাওয়ায় দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া একই ওয়ার্ডের দক্ষিণ পাড়ার নূর মোহাম্মদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় আসমাউল হোসনা নামের এক নারীকে। এসময় ওই নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ তল্লাশি করে ১০ পিস ইয়াবা পাওয়ায় তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। স্থানীয়দের দাবি৬ মাসের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ওই নারী একজন রোহিঙ্গা।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) আবদুল মালেক তালুকদার দৈনিক আজাদীকে জানান, এদিন সকাল ১১টার দিকে অভিযান চালানো হয় টাস্কফোর্সের তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি চকরিয়া পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রেজাউল করিমের বাড়িতে। এসময় টাস্কফোর্স সদস্যদের উপস্থিতি দেখে রেজাউল নিজের পরিচয় গোপন রাখেন এবং নিজেকে মহিউদ্দিন হিসেবে পরিচয় দেন। এ সময় রেজাউলের বাড়ি তল্লাশি করে কিছুই পাওয়া যায়নি।

তিনি আরো জানান, এরপর পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের সবুজবাগ আবাসিক এলাকায় তল্লাশি চালানো হয় চকরিয়া পৌরসভা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম সোহেলের বাড়িতে। এ সময় সোহেল সস্ত্রীক বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। তবে টাস্কফোর্সের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট’র কাছে তিনি বাড়ি তল্লাশির কারণ জানতে চান। এর জবাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘ইয়াবা কারবারের তালিকায় আপনার নাম রয়েছে, তাই বাড়ি তল্লাশি করতে এসেছি।’ এ সময় সোহেল দাবি করেন, এগুলো একেবারেই সাজানো এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় তাকে নিয়ে অপপ্রচার করা হয়েছে। সেজন্য তালিকায় নাম এসেছে।

এ প্রসঙ্গে পৌরসভা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম সোহেল বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক বিভিন্ন মামলা হয়েছিল। সেই মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন করেছিলেন ইতোপূর্বে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিন তদন্ত করতে এসেছিলেন।’

অপরদিকে চকরিয়া পৌরসভার কাউন্সিলর রেজাউল করিম বলেন, ‘আমি কোন মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত নই। আমার জনপ্রিয়তা ঈর্ষাণ্বিত হয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অপবাদ দিয়ে আসছিল। তাই আজ বিষয়টি তদন্ত করতে এসেছিলেন প্রশাসনের লোকজন।’

অভিযানে থাকা টাস্কফোর্সের এক সদস্য জানান, যারা গডফাদার তারা সরাসরি মাদক বিকিকিনি করেন না। মূলত সিন্ডিকেট সদস্যদের দ্বারাই মাদকের কারবার করে থাকেন তারা। তাই জেলার হিটলিস্টে থাকা ৫৪ জনের সকলকেই গোয়েন্দা নজরে রাখা হয়েছে। তাদের সার্বক্ষণিক গতিবিধি পর্যন্ত গোয়েন্দারা পর্যবেক্ষণ করছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, পূর্বের তালিকা হালনাগাদের পর আরো যাচাইবাছাই করে বিশেষ অভিযানের জন্য চূড়ান্ত তালিকা করা হয়। সেই তালিকায় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বড় বড় গডফাদাররাও রয়েছে। আর তালিকাভুক্ত গডফাদারদের ধরতেই এই টাস্কফোর্স তথা যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশের পর চলতি বছরের ১৪ মে সংবাদ সম্মেলন করে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে র‌্যাব। এরপর র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে শতাধিক সন্দেহভাজন মাদক কারবারি নিহত হয়। এ সময় উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজাসহ রকমারি মাদকদ্রব্য।

এদিকে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকের বড় বড় চালান প্রতিনিয়ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার হচ্ছে। সেসব চালানের মধ্যে বেশ কিছু চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তবে বহনকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা আটক হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে নেপথ্যে জড়িত গডফাদাররা। কক্সবাজারের সেই গডফাদারদের ধরতেই ৫৪ জন মাদক কারবারির একটি ‘হিটলিস্ট’ তৈরি করে সরকার।

x