ও চাঁদ মামা

রেজাউল করিম

বুধবার , ২৪ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ
40

চাঁদের বয়স কতো। হিসেব অজানা। চাঁদকে নিয়ে সাহিত্য জগতে সৃষ্টির শেষ নেই। শিশুকে নিয়ে মা ঘুম পাড়িয়ে দেন চাঁদের ছড়া বলে। ‘আয় আয় চাঁদ মামা/ টিপ দিয়ে যা/ চাঁদের কপালে চাঁদ/ টিপ দিয়ে যা/ মাছ কাঁটলে মুড়ো দিব/ ধান ভাংলে কুড়ো দিব/ কালো গরুর দুধ দিব/ দুধ খাবার বাটি দিব/ চাঁদের কপালে চাঁদ/ টিপ দিয়ে যা।’ এই চাঁদে নাকি বুড়ি থাকে। যে শুধু চরকা কাটে। চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। অথচ জ্যোস্না রাতে সবাই যায় বনে। ‘চাঁদ জঙ্গলে বাঘসিংহের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়/ পাহাড়ের গায়ে গায়ে হাওয়া দেয়/ মরুভূমির বুকে মরুবিজয়ের কেতন ওড়ায়।’ চাঁদকে নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। কিন্তু চাঁদে মানুষ পা রেখেছে খুব বেশি আগে নয়। মাত্র ৫০ বছর হলো। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মার্কিন নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং চাঁদে পদার্পণের মধ্য দিয়ে মানবজাতিকে স্বপ্ন আর বাস্তবের মিল ঘটাতে শিখিয়েছিলেন। অ্যাপোলো-১১ নভোযানে তিনজন মার্কিন নভোচারী চাঁদে যান। মার্কিন নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং প্রথমে চাঁদের বুকে পা রেখেই একটি উক্তি করেন। সেটা হচ্ছে-‘এটি একজন মানুষের একটি ছোট পদক্ষেপ কিন্তু তা মানবজাতির জন্য বিরাট অগ্রযাত্রা।’ বিশ্বের ৫০ কোটি মানুষ টেলিভিশনে সরাসরি এ ঘটনাটি দেখেন। চাঁদের বুকে অবতরণ করা দ্বিতীয় মানুষ ছিলেন অলড্রিন। অ্যাপোলো-১১ অভিযানে নাসার খরচ হয়েছিল এখনকার অর্থে ২০০ বিলিয়ন ডলার।
আর এখন চাঁদে পর্যটক হিসেবে যেতে চাইছে মানুষ। একদিন স্থায়ী আবাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে। মহাকাশযাত্রায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন নিল আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় মাইলফলক অ্যাপোলো ইলেভেন মিশনের সাফল্য স্বপ্ন দেখিয়েছিলো, একদিন শুধু নভোচারীরা নন, চাঁদে যাবেন সাধারণ মানুষও। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে আবারও চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা আছে নাসার।
পাঁচ দশকে বেসরকারি উদ্যোগ, গবেষণা ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নে মহাকাশযাত্রার খরচ অনেক কমেছে। নাসার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, অনেকের মতে, মহাকাশযাত্রার ভবিষ্যতের চাবিকাঠি একজন ব্যক্তি, আর তিনি হলেন মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক। পে-প্যাল, টেসলার মতো প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট ব্যবসার মালিক মাস্ক। মার্কিন বেসরকারি মহাকাশ পরিবহন প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্বত্বাধিকারী। কম খরচে রকেট ও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে দারুণ জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানটি। ইলন মাস্কের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মানুষ আবারও চাঁদে যাবে, তবে নভোচারী নয়, পর্যটক হিসেবে। একইভাবে মঙ্গল গ্রহ জয়েরও ইচ্ছে তার। এরই মধ্যে চাঁদে প্রথম পর্যটক হিসেবে জাপানি ধনকুবের ইউসাকু মায়েজাওয়ার নাম ঘোষণা করেছে স্পেসএক্স। অ্যাপোলো ইলেভেনের ৫ ভাগের ১ ভাগ খরচে ২০২৩ সালে চাঁদে যাওয়ার লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানটির। মঙ্গলে যাত্রা সহজ করতে এবং মহাকাশ পর্যটনকে সার্বিকভাবে জনপ্রিয় করে তুলতে চাঁদে একটি স্থায়ী আবাসস্থলও গড়ে তুলতে চায় স্পেসএক্স। পৃথিবীর মতো চাঁদও মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসবে একদিন।
তবে ১৯৫৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম সোভিয়েত যান লুনা-২ চাঁদের উপরিতলে উড়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই মিশনে নভোচারীর সাথে রোবটও ব্যবহার করা হয়েছিল। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি চাইনিজ ‘চেঞ্জ’ নামেন ভোজাহাজ চাঁদের দূরের অবস্থানে (অন্ধকার জায়গা) অবতরণ করে। এতে কোনো নভোচারী ছিল না, এটা ছিল রোবেটিক। ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর মার্কিন নভোচারী জিন সারন্যান, জ্যাক স্কিমিট এ্যাপোলো-১৭ অভিযানে যান এবং নভোচারী সারন্যান চাঁদে নামেন। তিনিই সর্বশেষ নভোচারী যে চাঁদের মাটিতে নামলেন। এ ছাড়া রোবোটিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে অনেক।
চন্দ্রাভিযানের ফলে পরবর্তীতে মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তখনকার সময় কিছু প্রযুক্তি আবিষ্কার করে শুধু চাঁদে যাওয়ার অভিযানে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি এখন মানুষের প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। মিশন সফলের জন্য নাসা তখন আবিষ্কার করে নির্ভুল ঘড়ি। কারণ এক সেকেন্ডের সময় এদিক সেদিক হলে নভোচারীদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তখন কোয়ার্টজ ঘড়ির উন্নত সংস্করণ আবিষ্কার করে নভোচারীদের দেয়া হয়। অ্যাপোলো ১১ অভিযানে পানি পরিষ্কারের প্রযুক্তি আবিষ্কার করা হয়েছিল যাতে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস করতে পারত। সে অভিযানে প্রথম আগুন প্রতিরোধী কাপড় আবিষ্কার করে নভোচারীদের দেয়া হয়। হৃদকম্পন মাপতে একটি যন্ত্রও দেয়া হয়েছিল।
চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় রাশিয়া দুইবার আমেরিকাকে পরাজিত করে। কিন্তু তার পরেই নাসা চাঁদে পাঠিয়েছিল অপোলো ১১। যা প্রথমবারের মতো সেখানে মানুষ নিয়ে গিয়েছিল। চীনও চন্দ্রাভিযানে নামে। আর গত ২২ জুলাই ভারত চন্দ্রযান-২ উৎক্ষেপণ করে। ৫৮ দিন পর এটি চাঁদে পৌঁছার কথা রয়েছে। চাঁদকে নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। ভবিষ্যতে কোনো দেশ-স্থান নয়, পর্যটনের আকর্ষণীয় স্থান হতেও পারে চাঁদ। চড়কা কাটা বুড়ির দেখা মিলতেও পারে।

x