ও আমার লাল মেয়েবেলা

রিমঝিম আহমেদ

শনিবার , ১৮ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ
21

আমার ছিল ঘরকুনো স্বভাব। বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে প্রায়শ মার খেয়ে আসতাম আর মাকে বলতে গিয়ে মায়ের হাতে আরেকপ্রস্ত মার খেতেম। ফলে আমার খেলার সাথী কমতে কমতে একমাত্র অবলম্বন হয়ে পড়ে ছাট কাপড়ের পুতুল। সেগুলো নিয়েই মগ্ন থাকতাম। এসব আমার প্রারম্ভিক শৈশবের স্মৃতিকথা বলতে গেলে। তখন দেখতাম ঘরের দরজার পেছনে, রান্নাঘরের পেছনের চালে, ছোট ছোট কাপড়ের টুকরো গুঁজে রাখা। পুতুলের শাড়ি বানানোর জন্য ধরতে গিয়ে একটু খটকা লাগত। কাপড়গুলো কেমন বিশ্রী ছোপ ছোপ দাগে ভরা, স্বাভাবিক কাপড়ের মতো নরম নয়, কেমন শক্ত টাইপের। মামাবাড়ি গিয়েও দেখতামমামীর আলনার পেছনে, ঘরের অন্ধকার কোণাটায় বেড়ার ফাঁকে এবং বাথরুমের বেড়ায় এসব কাপড়। কখনো কখনো আমার পুতুলের গায়ে এসব কাপড় মায়ের চোখে পড়ে গেলে মারত খুব। তারপর সাবান মেখে, সোনারূপা ডুবানো পানিতে গোসল করিয়ে দিতেন। এই বিষয়গুলো নিয়ে নানারকম কৌতূহল তৈরি হয়েছিল কিন্তু সে বয়সে তার তল খুঁজে পাইনি। মাসের একটা সময়ে মাকে দেখতামবালতি বা বদনায় পানি নিয়ে সেখানে সোনারূপা ডুবিয়ে তা সারা ঘরে ছিটাতে। মা বলতেনঘর পবিত্র করছে। কেন করছে, কী অপবিত্র কারণে করছে আমি বুঝতে পারিনি।

মা মরে গেলে আমার একমাত্র সঙ্গী, যার পিছে পিছে ঘুরতাম, সে হল আমার চাচাত বোন ডলিপু। আমারচে বছর পাঁচেকের বড়। একদিন দেখলাম তাকে ঘর থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না, কারো সামনে যেতে দেয়া হচ্ছে না, এমনকি নিজের ছোট ভাইদের সাথে একইঘরে শুতে দেয়া, খেতে দেয়া হচ্ছে না। তাকে আলাদা ঘরে লবণ ও দই দিয়ে ভাত খেতে দেয়া হচ্ছে। ওকে দেখে আমার মনে হয়েছে খুব বড় কোন খারাপ কাজ সে করেছে , যার কারণে এই শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার সাথে দাদী এরকম আচরণ করছে কেন? ও মলিন হেসে বলেছিল–“এই সময় মেয়েদের এইরকমই খেতে হয়, নিয়ম মানতে হয়। ঘরে একটা চালের মটকা ছিল, ওর মটকা ছোঁয়া মানা, পানির কলসি, ভাইদের জামাপ্যান্ট এসব ধরা মানা, ছেলেদের বিছানায় বসা মানা। জানতে চাইলে বলেমেয়েরা এসময় অপবিত্র থাকে। এই অপবিত্র ব্যাপারটা একদিন তোরও হবে সেদিন বুঝবি। এরপর থেকে ডলিপুকে দেখেছি কেমন লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে মাথায়, বুকে ওড়না পেঁচিয়ে বড় বড় ভাব করে হাঁটতে। যেন পৃথিবীর কোথাও বিশাল রকমের পরিবর্তন ঘটে গেছে। ডলিপু আর আগের মতো নেই। কথাগুলো কোন মান্ধাতাআমলের নয়! ১৯৯৬/৯৭ সালের কথা মাত্র!

তারও কিছুদিন পরে, আমি তখন ক্লাস সিক্সে বা সেভেনে পড়ি। আমরা তখন নতুন বাড়িতে। পাশের বাড়ির এক আপা জিজ্ঞেস করলতুই কি বড় হয়েছিস? এই বড় হওয়া বিষয়টা মূলত কী, সেদিনই তার কাছে ব্যাপারটা জেনেছি। ক্লাস এইটের মাঝামাঝি সময়ে আমিও বড় হলাম (তাদের কথায়)। আমার প্রথম ঋতুস্রাব হল। কিছু বুঝতে না পেরে সে আপাকে কথাটা বললাম। সে বলল আরেক খালাম্মাকে। যেহেতু আমার মা নেই, সৎ মা গেছেন বাপেরবাড়ি, খালাম্মা বাবাকে ডেকে বললেন। বাবা গিয়ে পুরনো বাড়িতে দাদীকে বললেন। বিকেলবেলা ডল্থিপু এসে হাজির। বললদাদী পাঠিয়েছে। ততক্ষণে বাবার ছেঁড়া লুঙ্গি, মায়ের শাড়ি এসব টুকরো করে কীভাবে সামলে নিতে হয় ওই খালাম্মাই বলে দিয়েছেন। আমাকে অলিখিত বিধিনিষেধের লিস্ট মুখস্থ করিয়ে দিয়ে চাচাত বোন চলে গেল। সাত দিন বাইরে যাবি না, শুধু লবণদই দিয়ে ভাত খাবি, মাছ, শুঁটকি এসব খাবি না, খেলে রক্তে দুর্গন্ধ হবেইত্যাদি ইত্যাদি। সেদিনই আমি বুঝতে পারি ছোটবেলায় ঘরের কোণে, দরজার পেছনে মা, মামী এসব কীসের কাপড় শুকোতে দিতেন। তারপর থেকে আমি নিজেও এসব কাপড় সে দেখাকে কাজে লাগিয়ে দরজার পেছনে, বাথরুমের বেড়ায় শুকাতে দিতাম। যদিও ঘর থেকে বের হওয়া, যা সব খেয়ে ফেলা থেকে আমাকে কেউ আটকাতে পারেনি। একেক সময় সেসব কাপড় ধুতে গিয়ে নিজেই বমি করে দিতাম ঘেন্নায়। একবার ব্যবহারের পর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করতে খুব অস্বস্তি লাগতো বলে প্রায়শ নতুন কাপড় নিতাম। সৎ মায়ের, মামীর ভালো ভালো শাড়ি ছিঁড়ে ফেলে পরে বকা খেয়ে লজ্জায় পড়তাম। কারণ এটা লজ্জাজনক কাজ হিসেবেই জেনেছি শুরু থেকে। বাবা কেমন আড়ে ঠাড়ে তাকাতেন। নিজে কিছু বলতে না পেরে পাশের বাড়ির খালাম্মাকে দিয়ে বলাতেন। আমার নিজের বাবার অথচ তারচে প্রতিবেশী খালাম্মা কীভাবে সুপরামর্শক বা শুভাকাঙ্ক্ষী হয় আমার ধারণায় আসে না। সে সময় নামাজ পড়া, কোরান পড়া মানা। মা আমাকে সুরা ইয়াসিন, আর দোয়া ইউনুস শিখিয়ে বলেছিলেন, যে কোন ভীতিকর পরিস্থিতিতে এগুলো পড়লে ভয় চলে যায়। পিরিয়ডের সময় রাতে টয়লটে যেতে ভয় করলে আমি দোয়া পড়তে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছি। অপবিত্র শরীরে দোয়া পড়লে যদি গুনাহ হয়!

বাবা নেই ; তখন মামার বাড়িতে থাকি। পিরিয়ডের সময়টাতে মামী বলতেন এসব কাপড় গোপনে শুকোতে দিস, ছেলেদের গায়ে যেন না লাগে; এসব অশুচি। রোজার সময় বলতেন— “ছেলেদের কেউ জানতে চাইলে বলবিরোজা রেখেছিস। দিনেরবেলা মামী লুকিয়ে খেতে দিতেন, কারো পায়ের আওয়াজ পেলেই বলত–” আসতেসে, লুকা লুকা।নিজেকে চোর চোর মনে হত তখন। মামীকে, অন্যান্যদেরকেও ঋতুস্রাবকে অসুস্থ হয়েছেবলতে শুনেছি। ঋতুস্রাবের মতো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক একটা ঘটনাকে কেন অসুস্থতা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয় তা আমি এখনো ভেবে পাই না। বরং এটাকে সামাজিক অসুস্থতা বলে আখ্যা দেওয়াই ভালো। পথেঘাটে, কোন অপ্রস্তুত পরিস্থিতে কারো স্রাবের ঘটনা ঘটে তা কাপড়ে লেগে গেলে এবং সে পরিস্থিতিতে কেউ দেখে ফেলেছে এমন ঘটনায় সেসব নারীদের লজ্জায় কুঁকড়ে যেতে দেখেছি, যেন ধরিত্রী দ্বিধা হলেই তিনি ঢুকে পড়বেন। ঋতুস্রাব নিয়ে এমন ঢাকঢাক গুড়গুড় কেন জানি না। এসব রাখঢাক, লজ্জা, শঙ্কা দেখলে মনে হতো মেয়েজন্ম কি তবে পাপ? একটা মানুষের প্রাকৃতিক ঘটনাকে কেন অশুচি ভেবে সারাজীবন আতঙ্কে কাটাতে হবে! প্রজননপ্রস্তুত কোন মেয়ের স্বাভাবিক এই ঘটনাকে কবে সহজ করে দেখা হবে পরিবারে, সমাজে? নারী শরীরের অন্যতম একটি বড় ঘটনার নাম ঋতুস্রাব। এই ঋতুস্রাবকে ঘিরে নানা বিধিনিষেধ, যেন মেয়েরা মানুষ থেকে কোন বিচ্ছিন্ন প্রাণি। পুরুষতন্ত্র এই স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়াকেও নারীর অশৌচ আচারের আওতায় এনে যে ট্যাবুতে পরিণত করেছে তার পথপরিক্রমা কম সময়ের নয়। অথচ সে সময় একজন কিশোরীর খুব বিশ্বস্ত সঙ্গ দরকার। দরকার মাকে, বাবাকে। এই ঋতুস্রাবকে ঘিরে রাখঢাক মেয়েকে বাবামার কাছ থেকে যোজন দূরে নিয়ে যায়। মেয়েটি তখন এই ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে, নিজেকে অপরাধী মনে করে। মাবাবার চেয়ে সন্তানের কে বেশি আপন এই পৃথিবীতে? অথচ মাকে কিছুটা কাছে পেলেও বাবা যেন ভিনগ্রহের মানুষ হয়ে যায়। বাবার কি তবে ভূমিকা নেই কোনও? অনেক পরে জেনেছি। নিজে বই পড়ে, নানাভাবে জেনেছিএসব কাপড় জীবাণু মুক্ত হতে হয়, কড়া রোদে শুকাতে হয় এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে হয় এসময়। কিন্তু আমার কিংবা আমাদের অভিভাবকের অন্ধতা, সামাজিক ট্যাবু কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে আমাদের? এখনো এই সময়ে এসে কজন মেয়ে কোন ছেলেকে নির্দ্বিধায় বলতে পারে নিজের পিরিয়ডের কথা? জন বাবা তার মেয়ের পিরিয়ডের ডেট জানে? জন বাবা বা ভাই তাদের মেয়ে বা বোনেকে প্যাড কিনে এনে দেয়? এখনো কি মেয়েরা দোকান থেকে প্যাডের প্যাকেট কোন কাগজের মোড়কে না জড়িয়ে নিয়ে আসতে পারে, নাকি কেউ দেখে ফেলার ভয়ে সংকোচিত হয়ে থাকে? প্যাড কেনা নিয়ে গোপনে হাসাহাসি, রঙ্গতামাশা কি এখনও চলে না পাড়ার মোড়ে ছেলেদের আড্ডায়!

চোখের পর্দাটা একটু সরে যাক। নারীর এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি মোটেই অশৌচ কিছু নয়, বরং গৌরবের। এটা প্রজনন প্রস্তুতির একটা বিশেষ অংশ। এসব ট্যাবু, অন্ধতা ছেড়ে খোলাখুলি আলোচনাই একজন কিশোরীকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। হ্যাপি টু ব্লিড।

x