ওষুধ ছাড়াই সুস্থ থাকার পথ্য বার্লি ফ্লেক্‌স

ডা. রফিকুল ইসলাম খোকন

শনিবার , ১০ নভেম্বর, ২০১৮ at ৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ
334

শুরুতেই একটি পরিসংখ্যান দেওয়া যাক, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যব্যয়ের মাত্র ১৯ শতাংশ খরচ হয় ওষুধপত্রে। উচ্চমধ্য আয়ের দেশ বা উন্নয়নশীল বিশ্বে তা ২৩ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় এ খরচ ৩০ শতাংশ হলেও আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশে এর মাত্রা মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় অর্ধেক। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। নানা অসুখ-বিসুখে তাদের আয়ের বেশিরভাগ টাকাই খরচ করতে হচ্ছে ওষুধ কিনতে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, পিত্তথলি ও কিডনির পাথর-এ ধরনের জটিল-কঠিন রোগের সাথে বর্তমানে আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারই জড়িয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যদের কেউ না কেউ, এক বা একাধিকজন নানা ধরনের জটিল রোগে ভুগছে। হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে দেখা যায় সব সময় অসুস্থ মানুষের ভিড়। চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন, ওষুধ খাচ্ছেন, সুস্থ হয়ে উঠছেন; আবার কিছুদিন পর অসুস্থ হচ্ছেন-এমনভাবেই চলছে অনেক মানুষের জীবন। ওষুধ খেতে খেতে এ মানুষগুলোর শরীর এমনভাবে ওষুধের জালে আটকে পড়েছে যে, ওষুধ ছাড়া আর চলা যায় না। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগীদের তো নিয়মিত ওষুধ খেয়েই বাঁচতে হয়। এ কারণে ওষুধের পেছনে ব্যয় করতে করতে অনেক পরিবার দরিদ্র থেকে আর দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত ওষুধ সেবন কিংবা ওষুধের জালে আটকে পড়াটা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কথায় আছে ‘কুইনিন জ্বর সারাবে, কুইনিন সারাবে কে?’ অর্থাৎ আমরা যে ওষুধগুলো খেয়ে রোগ সরাচ্ছি সেসব ওষুধের দীর্ঘমেয়াদে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে। ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় শরীরে নতুন সমস্যা দেখা দেয়, তা থেকে সুস্থ হতে আবারও ওষুধ সেবনই করতে হয়। এভাবে ওষুধের জালে আটকে পড়েছে অনেক মানুষের জীবন এবং যারা এখনও সুস্থ আছেন তারাও বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেদিকেই ধাবিত হচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে, ওষুধ ছাড়া সুস্থ থাকার উপায় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। মহান দার্শনিক সক্রেটিস ওষুধ চক্রের এ অবস্থার কথা ভেবে বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে চিকিৎসকরা রোগীদের আর ওষুধ দেবেন না, তারা মানুষকে জীবনযাপন পদ্ধতি বাতলে দেবেন আবার খাবারের মাঝেই সুস্থতার সূত্র জানিয়ে দেবেন।’
সতিই প্রকৃতির মাঝেই আছে এর সমাধান। মহান সৃষ্টিকর্তা প্রকৃতিতে উৎপাদিত বিভিন্ন খাদ্যশস্যের মাঝেই দিয়েছেন রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা, সুস্থ থাকার পথ্য। বার্লি বা যব তেমনই উচ্চ পুষ্টিমান সম্পন্ন এক খাদ্যশস্য। ১০,০০০ বছর আগের খাদ্যশস্য হিসেবে বার্লি সারা বিশ্বে এখনও বিদ্যমান, এটি প্রথম চাষযোগ্য প্রাকৃতিক শস্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। বার্লি বিভিন্ন রকম সুষম খাদ্য প্রস্তুতে উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বে অনেক দেশেই বার্লি প্রধান খাবার। নিয়মিত বার্লি ফ্ল্যাক্‌স খেলে স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে এবং এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও পাকস্থলীর কর্ম ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
ইউরোপ-আমেরিকায় বার্লি, বার্লি ফ্ল্যাকস, বার্লি চা, বার্লি জুস ইত্যাদি নিয়মিত খাবার টেবিলে থাকে। এ কারণে সেসব দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভিড় নেই। তারা জীবনযাপন সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন হওয়ায় খাবার টেবিলে বার্লিকে এগিয়ে রেখেছে। আমাদের দেশে কোথাও কোথাও সীমিত পরিসরে বালি বা যবের চাষ হয় তবে তা ব্যাপকভাবে পরিচিত নয়। কিন্তু যেসব বাংলাদেশি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে থাকেন তারা সেসব দেশের খাবারের তালিকায় বার্লির সম্পর্কে বেশ পরিচিত এবং তারা বাংলাদেশে এসেও খোঁজ করেন। আশার কথা হলো, বাংলাদেশেও বার্লি আমদানি শুরু হয়েছে। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ফার্মজিলা বার্লি ফ্ল্যাকস চট্টগ্রামেই নিয়ে এসেছেন খাইরুল ইসলাম চৌধুরী নামে একজন প্রবাসী সমাজহিতৈষী ব্যক্তি। তিনি দীর্ঘদিন ইংল্যান্ডে বসবাস করেছেন, সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বার্লির ভালো গুণাগুণ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং অনুভব করেছেন দেশের মানুষের জন্য এ পথ্য নিয়ে আসা উচিত-ব্যাপকভাবে ওষুধের জালে আটকে পড়া মানুষজনকে উদ্ধারের জন্য। নিয়মিত ওষুধ সেবন করে যাদের বেঁচে থাকা নির্ভর হয়ে গেছে তাদেরকে ওষুধ ছাড়া সুস্থ রাখার পথ্য দিতেই খাইরুল ইসলাম বার্লি ফ্ল্যাক্‌্‌স দেশের মানুষের জন্য নিয়ে আসার চিন্তা করেন। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে তা বাজারজাত হচ্ছে। বড় বড় সুপারশপগুলোতে বার্লি ফ্ল্যাক্‌্‌স পাওয়া যাচ্ছে।
সাধারণভাবে বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এর অনন্য উপকারিতা গুলো হচ্ছে-এটি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। ক্ষতিকারক এলডিএল কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসেরাইডস কমাতে সাহায্য করে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পিত্তথলি এবং কিডনির পাথর প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে। শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং অন্ত্র ও কোলন সুস্থ রাখে।
২০০৬ সালে পুষ্টি গবেষণা প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন বিটা-গ্লুকেন ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য বার্লি ফ্ল্যাক্‌স খেয়েছেন তাদের উল্লেখযোগ্যভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেছে। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এর মধ্যে দ্রবণীয় ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ রয়েছে। ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত বার্লি ফ্ল্যাক্‌স খেলে ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে।
আমেরিকায় কৃষি মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত একটি অণুকে বিচ্ছিন্ন করেছে যার নাম টকোট্রিনোল। এই যৌগিক পদার্থে লিভার কোলেস্টেরল এ খারাপ এলডিএল গঠনকে দমন করার ক্ষমতা আছে। এমনকি বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এর মধ্যে অদ্রবণীয় ফাইবার উপস্থিতিতে খারাপ কোলেস্টেরল এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স রক্তে ট্রাইগ্লিসেরাইডস কমাতে সাহায্য করে। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এ বেশি পরিমাণে ভিটামিন বি আছে, যা কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে স্বাভাবিক রাখে। নিয়মিত বার্লি ফ্ল্যাক্‌স খেলে রক্ত জমাট ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এ অনেক বেশি প্রোটিন আছে, যারা হজম সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য খনিজ লবণ ও ফাইবার খুব দরকারী। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স হজম শূন্য রস উপাদানে উৎসাহিত করে, নিয়মিতভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ এবং পুরো পাচনতন্ত্র রক্ষা করতে সাহায্য করে। মেটাবলিজম (জীবদেহের রাসায়নিক রূপান্তর) দ্রুতগতি করে এবং এটি পেট ফুলে যাওয়া রোগীদের জন্য উপযুক্ত। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এর প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে, যা উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো বৃহৎ অন্ত্রের মধ্যে থাকে এবং অন্ত্রের চলাচলের সুবিধা দেয়। কোলন এবং অন্ত্রকে বিপজ্জনক টঙিনের থেকে মুক্ত রাখতে এটি খুব কার্যকর। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এ অদ্রবণীয় ফাইবার সমৃদ্ধ, যা পিত্তথলিতে লুকিয়ে থাকা পাথরকে এসিড দ্বারা কমিয়ে নিতে পারে, আর এইভাবে কিডনীর পাথর প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এ উপস্থিত ক্যালসিয়াম হাড়কে মজবুত করতে এবং ফসফরাস ও কপার হাড়ের বিভিন্ন রোগের জন্য বিশেষ উপকারী। বার্লি ফ্ল্যাক্‌স এ এসিড আছে যা ত্বক, চুল ও নখের জন্য খুবই উপকারী। এটি সিলেনিয়ামের একটি ভাল উৎস। যার কার্যকলাপ ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা সংরক্ষণে সাহায্য করে, ঠিক একইভাবে চেহারা কুচকানো বা বয়স্ক ছাপ থেকে ত্বককে রক্ষা করে। এই খনিজের অভাবে চামড়ায় ক্যান্সার হতে পারে।

x