ওষুধের নিম্নমানের কাঁচামাল আনা বন্ধে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে আরো সক্রিয় হতে হবে

বুধবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ
35

চীন থেকে নিম্নমানের এপিআই আনছে স্বনামধন্য দেশীয় ওষুধ কোম্পানি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) নীতিমালা মানছে নাএমন নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান থেকে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করছে দেশের শীর্ষ স্থানীয় একাধিক কোম্পানি। অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্স (এপিআই) হিসেবে কেউ ইন্‌্‌সুলিনের, কেউ ক্যান্সারের, কেউ আবার অ্যান্টিবায়োটিকের কাঁচামাল আনছে। এসব কাঁচামাল আনা হচ্ছে চীনের ঝেজিয়াং হাইসান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি থেকে। নিম্নমানের এ কাঁচামালে উৎপাদিত ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। পত্রিকান্তরে গত ৬ সেপ্টেম্বর এ খবর প্রকাশিত হয়।

খবরে বলা হয়, ওষুধ ও এর কাঁচামাল উৎপাদনে ডব্লিওএইচওর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যা কারেন্ট গুড ম্যানুফেকচারিং প্র্যাকটিস (সিজিএমপি) হিসেবে পরিচিত। ঝেজিয়াং হাইসানের কারখানায় জিএসপি পরিপালনে বড় ধরনের ব্যত্যয় পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)। ঝেজিয়াংকে এজন্য সতর্কও করেছে তারা। ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ এফডিএর তদন্তকারী কর্মকর্তারা চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশ ঝেজিয়াং হাইসান ফার্মাসিউটিক্যালের দেয়া তথ্য যাচাই শেষে এপিআই উৎপাদনে জিএসপি বড় ধরনের ব্যত্যয় চিহ্নিত করেছে এফডিএ। এ ধরনের ব্যত্যয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ফুড, ড্রাগ অ্যান্ড কসমেটিক অ্যাক্টের বেশ কয়েকটি ধারায় উল্লিখিত মান অনুযায়ী ভেজাল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নিম্নমানের এ প্রতিষ্ঠান থেকেই ইনসুলিনের কাঁচামাল ইনসুলিন অ্যাসপার্ট (জেনারিক নাম) আমদানি করছে দেশে প্রথম সারির ওষুধ কোম্পানিগুলোর একটি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ব্লক লিস্টের তথ্য অনুযায়ী এফডিএর সতর্ক করা ঝেজিয়াং হাইসান থেকে গত বছরের ৯ জুলাই ৭৫০ গ্রাম, ৩ মে ২০০ গ্রাম, ৭ মে ২০০ গ্রাম ইনসুলিন অ্যাসপার্ট আমদানি করেছে কোম্পানিটি। একই কাঁচামাল তারা চলতি বছরের ৯ আগস্ট আমদানি করেছে ৫০০ গ্রাম, ৩০ মে ২৫০ গ্রাম ও ৩০ মে ২৫০ গ্রাম। এসব কাঁচামালে গ্লাইসেট ইনসুলিন উৎপাদন ও বিপণন করছে ইনসেপ্টা। দেশে ইনসুলিনের বড় অংশ ইনসেপ্টার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জানতে চাইলে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, প্রডাক্ট রিচার্জ ও গবেষণার জন্য কিছু কাঁচামাল আনা হয়েছে। তবে ইনসেপ্টা কখনও অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানি করে না। তা ব্যবহারও করে না। তাছাড়া ২০১৫ সালে ইউএস সতর্ক করলেও এখন যদি ঝেজিয়াং হাইসান ঠিক মতো কাঁচামাল উৎপাদন করে থাকে তাহলে সমস্যা কোথায়?

মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রধান দুটি হলো খাদ্য ও চিকিৎসা। এ দুটি চাহিদা বা অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। এর মধ্যে চিকিৎসার প্রধান উপকরণ হলো ওষুধ। জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজন খাদ্যের, আর বেঁচে থাকার জন্য দরকার ওষুধ। এজন্য এসব পণ্যের মানও গুণসম্পন্ন ও নির্ভেজাল হতেই হয়। নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের এ দায়িত্ববোধ থেকেই খাদ্য এবং ওষুধের গুণমান ও নির্ভেজালত্ব রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে রয়েছে খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন। আমাদের দেশেও রয়েছে। কিন্তু তারপরও দেশে এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ওষুধের বাজারে এক চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য চলছে। বাজারে নকল ও ভেজাল ওষুধের সাথে সাথে নিম্নমানের ওষুধও রয়েছে। কিছু ছোট কোম্পানির বিরুদ্ধে নকল ও ভেজাল ওষুধের প্রমাণ মিললেও স্বনামধন্য কোম্পানি সম্পর্কে ক্রেতারা উচ্চ ধারণা পোষণ করে আসছিলেন এতদিন। কিন্তু গত ৬ ডিসেম্বর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নিম্নমানের কাঁচামাল আনছে দেশীয় কোম্পানি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি জনগণকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। এতে বলা হয়েছে, এফডিএ তদন্তকারী কর্মকর্তারা চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে ঝেজিয়াং হাইসান ফার্মাসিউটিক্যালের কারখানা পরিদর্শন এপিআই উৎপাদনে সিজিএমপি’র ব্যত্যয় পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ফুড, ড্রাগ অ্যান্ড কসমেটিক অ্যাক্টের বেশ কয়েকটি ধারায় উল্লেখিত মান অনুযায়ী ভেজাল হিসেবে তারা চিহ্নিত করেন। কিন্তু সেই ঝেজিয়াং হাইসান থেকেই দেশের স্বনামধন্য ওষুধ কোম্পানি কাঁচামাল আমদানি করে চলেছে। অবাক করার ব্যাপার হলো, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সেটা বন্ধ করতে কার্যকর কোন উদ্যোগই নেয়নি। কোম্পানিগুলো কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে এফডিএর সতর্ক করা কোম্পানি থেকে কাঁচামাল আনছে। ঔষধ প্রশাসন এতটাই অকার্যকর যে, কোন কোম্পানি কোন আইটেমের কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন নেই, আর কতটুকু আমদানি করে বা আমদানিকৃত কাঁচামালের নিজেরা ব্যবহার করে, কাঁচামাল আমদানির উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, এর কোন হিসেব নেই। কোন তদারকি নেই। ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে ঔষধ প্রশাসনের কাছে যে কাগজ ধরিয়ে দেয়া হয়, সেটাই সব। ফলে অনেক ওষুধ কোম্পানি বিভিন্ন ওষুধ তৈরির লাইসেন্স নিয়ে বিদেশ থেকে নিম্নমানের কাঁচামাল এনে ঔষধ প্রশাসনের অধিদপ্তরের কাজ সেটিও তারা ঠিকভাবে করছে না বলে এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে। কোন ওষুধ কোম্পানি যদি নিম্নমানের কাঁচামাল আমদানি করে, তাহলে সেটি দেখার দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। প্রতিষ্ঠানটি সে দায়িত্ব পালনে সাফল্য দেখাতে পারছে না।

ওষুধ এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে মানুষের জীবনমরণ সরাসরি জড়িত। এর গুণ ও মানগত যে কোন ব্যতিক্রম মানুষের জীবন রক্ষার বদলে মৃত্যুর কারণ হয়। তাই সকল নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন মানুষ হত্যা করার সামিল। এমন অপরাধ যারা করবে, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশের উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করাও হয়। নিম্নমানের কাঁচামালে তৈরি ওষুধ রফতানি করলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট তো হবেই, উপরন্তু টেকসই ওষুধ শিল্পের প্রতিবন্ধক হবে। কিছু কোম্পানির কারণে দেশের ওষুধ শিল্পের সম্ভাবনার বিকাশ যেন রুদ্ধ না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। আমাদের প্রত্যাশা, কর্তৃপক্ষ মানসম্পন্ন ওষুধ শিল্পের জন্য কাঁচামাল নিরীক্ষায় পর্যাপ্ত সুবিধা সংবলিত ল্যাবরেটরি গড়ে তুলবে।

তার সাথে সাথে তদারকি জোরদারের জন্য সংশোধিত ওষুধনীতির বাস্তবায়নসহ একটি কার্যকর ও সক্ষম স্বাধীন সংস্থা গড়ে তুলবে। নইলে ওষুধ শিল্পের সম্ভাবনা কাগুজেই থেকে যাবে, বাস্তবে রূপ নেবে না। কিছু কোম্পানি অতি মুনাফা লাভের আশায় যেন এপিআই আমদানি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে তদারক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কাঁচামাল আমদানি করার আগে সংশ্লিষ্ট এপিআই উৎপাদনকারী কোম্পানির যাবতীয় বিষয় দেখে অনুমতি দিতে হবে। শুধু কম দামে এপিআই পাওয়া গেলেই তা আমদানি করতে হবেএমন মনোভাব পরিহার করতেই হবে।

x