ওবিসিটি বা মুটিয়ে যাওয়া

ডাঃ প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১৩ জুলাই, ২০১৯ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
134

আধুনিক জীবন যাত্রার অন্যতম কু-প্রভাব অতিরিক্ত ওজন বা মুটিয়ে যাওয়া। এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে বিভিন্ন রোগাক্রান্ত হয়ে জটিলতা তৈরি করে এবং আয়ু কমিয়ে দেয়। বসে বসে কাজ করা, দেদার জাঙ্ক ফুড খাওয়া এবং ব্যায়ামের অভাব, সব মিলিয়ে ওজন বেড়েই চলে। মুটিয়ে যাওয়া সারা দুনিয়া জুড়ে মারাত্মক অসুখ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে উন্নত দেশে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে ক্যনসার রিসার্চ ইউকে নামের দাতব্য সংস্থার দাবী অন্ত্র, কিডনি, জরায়ু এবং লিভার ক্যানসারের জন্য ধূমপানের চেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে স্থুলতা বা ওবিসিটি।
ওবিসিটি বা মুটিয়ে যাওয়ার কারণ কি : ১. মুটিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বেশি খাওয়া, শারীরিক কাজ কম করা, হরমোনজনিত, বংশগত, মানসিক সমস্যা এবং কিছু ওষুধ সেবন চিহ্নিত করা হয়েছে। যে কারণেই হোক প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ বা কোনো কারণে ক্যালরি কম খরচ হলে বাড়তি অংশ শরীরে জমা হয়। এটাই মুটিয়ে যাওয়ার মূল কারণ। যে কোন বয়সে অতিরিক্ত ওজন বা মুটিয়ে যেতে পারে। তবে বয়স বাড়লেই মোটা হওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। ছোট বেলায় স্থুলতা দেখা দিলে বয়স্ক অবস্থায় তা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। নারী-পুরুষ উভয়ই এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়। তবে যুক্তরাজ্যে নারীদের মধ্যে স্থুলতার হার বেশি। ২. অনেকের স্থুলতা একটা বংশগত ব্যাপার। অনেক সময় হরমোনজনিত কারণেও স্থুলতা দেখা দেয়-সুপ্রারেনাল, পিটুইটারি ও থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যায় স্থুলতা দেখা দেয়। শারীরিক পরিশ্রম কম করার ফলেও এ সমস্যা হতে পারে। ৩. আমরা যা খাবার খাই তা যদি পরিশ্রমের মাধ্যমে খাদ্যশক্তি (ক্যালরি) খরচ না হয় তবে তা শরীরের চর্বি ব্যাংকে জমা হয়। এই ব্যাংক শরীরে বিভিন্ন শাখা স্থাপন করে। বিশেষ করে বিরক্তিজনকভাবে আমাদের শরীরের মধ্যাংশে। ৪. অতিরিক্ত খাবারের জন্য বিশেষ করে মিষ্টিজাতীয় খাবারের জন্য স্থুলতা হতে পারে। ৭০-৯০ শতাংশ স্থুলতা হয় অতিরিক্ত ভোজনের জন্য। বাকি ১০ ভাগ অন্য কারণে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাধারণত সমাজের উচ্চবিত্তের শ্রেণির মাঝে স্থুলতার হার বেশি।
ওবিসিটি বা স্থুলতা কীভাবে বুঝবেন : সাধারণত চোখে দেখেই স্থুলতা আন্দাজ করা যায়। তবুও স্থুলতা নির্ণয়ের জন্য কতগুলো নির্দিষ্ট মানদন্ড আছে সেগুলো হচ্ছে-
* শরীরের ওজন ও শারীরিক উচ্চতা মেপে ব্যক্তির স্বাভাবিক ওজন, কম ওজন ও স্থুলতা নির্ণয় করা যায়। যখন শরীরের ওজন কাঙ্খিত বা আদর্শ ওজনের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি হয় তাকে স্থুলতা বলে। আদর্শ ওজন নির্ধারন করতে ‘আমেরিকার স্ট্যাডফোর্ড হার্ট ডিজিজ প্রিভেনশন প্রোগ্রাম’ এই সহজ ফর্মুলা ব্যবহার করে।
মহিলা : ইঞ্চিতে উচ্চতা ৩.৫ পাউন্ড বিয়োগ ১০৮।
পুরুষ : ইঞ্চিতে উচ্চতা ৪.০ পাউন্ড বিয়োগ ১২৮ (বৃহৎ কাঠামোর বয়স্ক যোগ ৮%, ক্ষুদ্র কাঠামোর বয়স্ক বিয়োগ ৪%)
* চামড়রার পুরুত্ব দিয়ে পরিমাপ : এক ইঞ্চি ভুঁড়ি চিমটি পরীক্ষা যদি আপনি আপনার সবচেয়ে নিচের পাজরের অস্থির নিচের ১ ইঞ্চি পরিমাণ ভুঁড়ি চিমটি দিয়ে ধরতে পারেন তবে আপনি স্থুল।
* ব্রুকা ইনডেক্স : উচ্চতা (সেন্টিমিটার) বিয়োগ ১০০। উদাহরণস্বরূপ-যদি কোনো ব্যক্তির উচ্চতা ১৬০ সেন্টিমিটার হয়, তাহলে তার আদর্শ শারীরিক ওজন হবে (১৬০-১০০)=৬০ কেজি।
* কোমর ও নিতম্বের বেড়ের অনুপাত : কোমরের বেড় স্থুলতা নির্ধারণে একটি সুবিধাজনক ও সহজ পদ্ধতি। কোমরের বেড় সবচেয়ে নিচের পাঁজরের অস্থি ও কোমরের হাড়ের মাঝখান থেকে নিতে হবে। নিতম্বের ব্যাস মাপতে হবে। যদি কোমর ও নিতম্বের ব্যাসের, অনুপাত পুরুষের বেলায় (১১) হয় এবং মহিলাদের বেলা (১.৮৫) হয় তবে বুঝতে হবে পেটে প্রচুর চর্বি হয়েছে।
মুটিয়ে যাওয়ার জটিলতা : * মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত ওজন মুটিয়ে যাওয়া একটি স্বাস্থ্য সমস্যা এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর। একজন লোক যত বেশি মোটা হবে তার অতিরিক্ত মেদবহুল শরীরের অতিরিক্ত রক্ত পাম্প করার জন্য হৃদযন্ত্রকে বাড়তি কাজ ও পরিশ্রম করতে হয়।
* দেহের সর্বত্র পুষ্টি ও অঙিজেন পৌঁছে দিতে হৃদযন্ত্রটিকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফলে উচ্চরক্তচাপ দেখা দেয়। তাছাড়া একজন মেদবহুল ব্যক্তির ডায়াবিটিস হওয়ার আশংকা খুব বেশি থাকে। তার রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি থাকে। এই তিনটিই উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবিটিস এবং রক্তচর্বির উচ্চমাত্রা একসাথে হার্টঅ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি করে।
* স্থুল লোকদের মাঝে কোনো কোনো ক্যান্সার (স্তন ও কোলন ক্যান্সার) হওয়ার আশংখা বেশি থাকে। অতিরিক্ত দৈহিক ওজনের জন্য মেরুদন্ডের ওপর বেশি চাপ পড়ার জন্য কোমর ব্যথা এবং পায়ে সন্ধিতে ক্ষয়জনিত বাতরোগ হওয়ার আশংখা বেশি থাকে।
* আমেরিকায় এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হঠাৎ মৃত্যুর হার স্থুল লোকদের মাঝে স্বাভাবিক ওজনের লোকদের চেয়ে ২০ ভাগ বেশি। তাছাড়া স্থুল মেদবহুল, লোকদের মধ্যে পিত্তের পাথর, বন্ধ্যাত্ব, পায়ে ভেরিকোস, শিরারোগ, পেটের হার্ণিয়া রোগ বেশি দেখা যায়।
ওবিসিটি বা স্থুলতা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ : যেহেতু স্থুলতা কিছু রোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান এবং সুস্বাস্থ্য ও সুখের ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী সে জন্য স্থুলতা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে-
* অতিরিক্ত ভোজনের অভ্যাস ত্যাগ করুন
* প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করুন
* আলস্য ও কর্মবিমুখ জীবন পরিহার করুন
* প্রতিদিনের খাদ্য থেকে চর্বির পরিমাণ কমিয়ে দিন
* বেশি করে আঁশযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করুন
* মদ্যপান এবং অনুরূপ পানীয় ত্যাগ করুন
* প্রতিদিন যথেষ্ট পানি পান করুন
যোগ ব্যায়াম : নিম্নলিখিত আসনগুলো অভ্যাসে ওবিসিটি বা স্থুলতা কমাতে সাহায্য করে যেমন- তোলাঙুলাসন, বজ্রাসন, উষ্ট্রাসন, শশাঙ্গাসন, অধ্যমস্যেন্দ্রাসন, শলভাসন, ধনুরাসন, উত্থিত পদাসন, অর্ধকুর্মাসন, পশ্চিমোত্তানাসন, জানুশিরাসন, শবাসন ইত্যাদি।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : ওবিসিটি বা মুটিয়ে যাওয়া নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে ফলদায়ক ওষুধ আছে। লক্ষণভেদে নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ সেবনে এই সমস্যা নিরাময় করা যায়। যেমন- ১. ফিউকাসভেস, ২. আয়োডিয়াম, ৩. ফাইটোল্লাক্কা, ৪. ক্যালকেরিয়া কার্ব, ৫. মার্কুরিয়াস, ৬. গ্রাফাইটিস, ৭. সেনেগা, ৮. ক্যাপসিকম, ৯. লাইকোপোডিয়াম, ১০. এ্যামোনিয়াম কার্ব, ১১. এমোনিয়াম মিউর, ১২. নেট্রাম মিউর, ১৩. এন্টিম ক্রুড, ১৪. ফেরাম মেট, ১৫. কেলিবাইক্রম, ১৬. সিপিয়া, ১৭. ক্যালিকার্ব, ১৮. ল্যাক-ডি-ফ্লোর সহ আরো অনেক ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x