ওদের কেন পথে নামতে হলো

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ
18

ওদের রক্তমাখা কেডস কিংবা রক্তমাখা ইউনিফর্ম আমাদের ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই কিশোরকিশোরীরা নিয়ম ভাঙার জন্য নয়, নিয়মভাঙা মানুষগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। প্ল্যাকার্ড হাতে একটা ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, লেখা ছিলআমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখেছি বঙ্গবন্ধুর কাছে। এরপর কি বলার থাকে?

জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার জনদাবির যৌক্তিকতা বুঝতে পারে। স্কুল কলেজের কিশোরকিশোরীরা কেন পথে নেমেছে? জনপরিবহন ব্যবস্থার চূড়ান্ত নৈরাজ্য এবং এবিষয়ে সরকারের নির্লিপ্ততার ফলে জনগণের পিঠ দেওয়ালে ঠেকেছে। কিন্তু কোনোভাবেই পরিত্রাণের পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। অবশেষে সেই পথ দেখাতে রাস্তায় নেমে এল আমাদের শিশুকিশোররা। তাদের ৯টি দাবি। খুবই সুস্পষ্ট।

. বেপরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে। এই দাবি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে

. নৌপরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে

. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে

. প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে

. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগনাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে

. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে

. শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে

. রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে

. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।

নিরাপদ সড়কের দাবি তো আজকের নয়! দিয়া আর রাজীবের মৃত্যু তুমুলভাবে আমাদের সামনে এনেছে। গণপরিবহনের নৈরাজ্যে প্রতিদিন কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, কত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কতজন পঙ্গুত্ব বরণ করছে, কত নারী প্রতিদিন অপদস্ত ও অপমানিত হচ্ছে। রুপা হত্যাকাণ্ডের কথা নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। অতি সম্প্রতি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির একটা ছেলেকে কি নৃশংসভাবে মেরে নদীতে ফেলে দিল? তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরের মত অনেক প্রতিভার অপমৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে বছরে গড়ে আট হাজার মানুষের মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। তাদের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের রাস্তায় বর্তমানে চলমান প্রায় ৫০ লাখ যানবাহনের ৭২ শতাংশের ফিটনেস নেই। তবে ফিটনেস নিয়ে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টা প্রকাশ্য। বিআরটিএ এর কার্যালয়ে গাড়িতে ফিটনেস দেওয়ার জন্য দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এর সাথে সরকারের এক শ্রেণির কর্মকর্তাকর্মচারীর যোগসাজস রয়েছে। দেশের পরিবহন খাতে ২৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এসব শ্রমিকের বৈধ লাইসেন্স নেই। অনেকের বয়স ১৫ এর নীচে। জনপরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে রাজনৈতিক প্রভাবসম্পন্ন কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর হাতে। যারা নৈরাজ্যকেই মুনাফা লাভের মূল পন্থায় পরিণত করেছে, সরকারি হিসেব মতে সারাদেশে ৩২ লক্ষ গাড়ির সরকারি নিবন্ধন রয়েছে কিন্তু ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে ২৫ লক্ষের অর্থাৎ বিশাল সংখ্যক ড্রাইভার কোনো অনুমতি ছাড়াই গাড়ি নিয়ে পথে নেমেছে।

ড্রাইভারদের বিশেষ করে বাস ট্রাকের মতো ভারী গাড়ির লাইসেন্স নিতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হয়। এই লাইসেন্স পেতে মোট ছয় বছর সময় লাগে। ড্রাইভারদের প্রথমে হালকা গাড়ির লাইসেন্স নিতে হয় তার তিন বছর পর মাঝারি গাড়ির লাইসেন্স নিতে হয়। ভারী গাড়ির লাইসেন্স পেতে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। এরপর যেড্রাইভার বাস চালাতে চান তাকে পাবলিক সার্ভিস ভেহিকেল আযারাইজেশন বা পিএসডি নামে ভিন্ন আর একটি লাইসেন্স নিতে হয়। এত ধৈর্য্য কোথায় আমাদের। সবাই সর্টকাটে উপার্জনের পথ খোঁজে। আর মালিকেরা। মুনাফার স্বার্থে অবৈধ ড্রাইভারদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেয়। যানবাহন ব্যবসা সংক্রান্ত আইনকানুন মূলত অকার্যকর হয়ে পড়েছে যেটা এই কয়দিনে আমাদের শিশুকিশোররা দেখিয়ে দিল। পুলিশ নিজেই আইন মানছে না। এই আন্দোলনে এই বিদ্রোহে কোন রাজনীতি নেই, কোন নেতাও নেই; আছে বিবেকের তাড়না, আছে সতীর্থ হারানোর বেদনা, আছে সুস্থ থাকা ও বেঁচে থাকার প্রেরণা। এই আন্দোলনের মধ্যেও কত জনের প্রাণ গেল। ঢাকায় মৌচাকমগবাজারের ফ্লাইওভারের ঠিক গোড়ার দিকে একটি বাস সাইফুল ইসলামকে মোটর সাইকেলসহ টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় প্রায় ৩০ ফুট। ক্ষতবিক্ষত সাইফুলের চেহারা পর্যন্ত চেনা যাচ্ছিল না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুব আবেগপ্রবণ মানুষ এটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। এই একটা ন্যায্য আন্দোলন যেন শেষ হয়ে না যায়। সেই মিনতি থাকলো আপনার কাছে। ওরা যা করছে তা মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য করছে। দিয়া আর রাজীবের মতো আর কারো জীবন না হারানোর জন্য করছে। ওদের চোখে আমরা স্বপ্ন দেখছি নতুন বাংলাদেশের।

গণপরিবহনে নৈরাজ্য নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। আন্দোলন দানা বাঁধতে দেওয়া হয়নি। এসব ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পথে নেমেছে সতীর্থের রক্তের শপথ নিয়ে। দয়া করে ওদের হতাশ করবেন না। ওদের রক্তমাখা কেডস কিংবা রক্তমাখা ইউনিফর্ম আমাদের ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই কিশোরকিশোরীরা নিয়ম ভাঙার জন্য নয়, নিয়মভাঙা মানুষগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। প্ল্যাকার্ড হাতে একটা ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, লেখা ছিলআমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখেছি বঙ্গবন্ধুর কাছে। এরপর কি বলার থাকে?

একটি সন্তানকে গড়ে তোলার জন্য মাবাবা এবং পরিবারের অনেক স্বপ্ন থাকে, সেই স্বপ্নের সাথে জড়িয়ে থাকে মায়ার বন্ধন, আত্মত্যাগ, মাবাবা সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে চেষ্টা করে সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার। সন্তানের এধরনের অপমৃত্যুর ভার মাবাবা বহন করতে পারে না।

আজকের এই শিশুকিশোর আমাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের, সমাজের দায়িত্বে থাকবে। ওদের জীবন আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর কাছেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল শিশুরা। লেখক বাদল সৈয়দের লেখা থেকে জানতে পারলাম, সংগীত শিল্পী সমর দাশের ছেলেকে বঙ্গবন্ধুর হেলিকপ্টারে করে ডুলা হাজেরা পাঠানো হয়েছিল সমস্ত প্রটোকল ভেঙে। সবাই যখন ইতস্তত করছিল তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, শিশুরা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার চেয়েও। আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, থামান গণপরিবহনের নৈরাজ্যতা, থামান আপনার পুলিশ বাহিনী।

x