‘এ কষ্ট গোটা বাংলাদেশের’

সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ
239

মোরশেদ তালুকদার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার জের ধরে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ। এখন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন সেই ফেসবুককেই বেছে নিয়েছেন নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যম হিসেবে! এসব স্ট্যাটাসে ছিল ক্ষোভ, ঘৃণা। কারো সঙ্গে মতের অমিল হলেই ‘শিবির’ ট্যাগ লাগিয়ে অপদস্ত করার যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেটা নিয়েও ছিল সংশয়। অবশ্য আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করায় সরকারের প্রশংসাও করেছেন অনেকে। এমন কয়েকটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দৈনিক আজাদীর পাঠকের কাছে তুলে ধরা হল:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ সজল লিখেন, ‘এমন বহু আর্তনাদ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্রের বুকের ভেতর একটা সময় বসে যায়। কেউ কেউ সারাজীবনেও এসব ট্রমা থেকে বের হতে পারে না। এই কষ্ট শুধু বুয়েটের না, এই কষ্ট কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের না, এই কষ্ট গোটা বাংলাদেশের। আপনারা যারা আমাদের সেরা বিদ্যাপীঠের ছাত্র বলেন, তারা জানেন না আমরা কিসের ভেতর থেকে পাস করে বের হয়ে আসি।’
তরুণ রাজনীতিবিদ ফারাজ করিম চৌধুরী তার পেজে লিখেছেন, ‘ছেলেটার সঙ্গে যুক্তিতে পারলেন না তাই শক্তি খাটালেন। সেটায় বুঝা যায় আপনাদের রাজনৈতিক মেধা কতটুকু। গুণ্ডামি আর রাজনীতির তফাৎ আজও ধরতে পারলেন না। বললেন বিতর্কিত কিছু পেজে লাইক আছে। আরে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মূর্খের দল, আবরারের প্রোফাইলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এমন কি যাদের হাতে তার মৃত্যু সেই বুয়েট ছাত্রলীগের পেজেও তার লাইক আছে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আরিফুল হক সিদ্দিকী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘ছাত্রলীগ কর্তৃক বুয়েটের ট্রিপল-ই ডিপার্টমেন্টের ২য় বর্ষের ছাত্র আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আমার প্রতিক্রিয়া লেখার সময় স্ত্রী হাত জোড় করে বলল, প্লিজ, কিছু লিখ না। তোমার দুই সন্তানের কথা চিন্তা কর। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবার কারণে ওরা তোমাকেও পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে!’
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিদ্যা বিভাগের আরেক সহযোগী অধ্যাপক রেজোয়ানুল হক লিখেন, ‘দেশের কোনো কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও কি আজ হোস্টেল/হলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে? সন্তানরা হলে আছে এরকম একজন অভিভাবকও কি আজ দুচোখের পাতা এক করতে পারবেন? শুধু আজ নয়, আগামীতেও কি সবসময় শিক্ষার্থী/অভিভাবকের মানসপটে আবরারকে নিষ্ঠুরভাবে পেটানোর দৃশ্য ভাসবে না? এই যে বিশ্বাসের জায়গাটা স্থায়ীভাবে নষ্ট হলো, এটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এই ক্ষতি আর কখনো পুষিয়ে দেয়া যাবে না, কখনোই না। এরপরও কি দাবি করবেন, আমরা সভ্য সমাজে বসবাস করি!’
চট্টগ্রামের ছেলে ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক কাজী আনিছ লিখেছেন, ‘শিবির ব্লেইম দিয়ে পেটানো, ঠ্যাঙানো, হল থেকে বের করে দেওয়া নতুন কিছু নয়। এমনকি চাকরিও ঠেকায়। আমি এমন কয়েকজনকে চিনি। তারা খুব শিক্ষিতও আবার। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে মাঝেমাঝে চিক্কুর পারে। আবরার হত্যায় তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছে দেখে হাসি পাচ্ছে। হত্যাকারী আর তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য আমি দেখি না। আমার এক বন্ধু যে কি না শিবিরের ‘শ’ও সহ্য করতে পারে না, সেই তাকে শিবির ব্লেইম দিয়ে হল থেকে বের করে দিয়েছিল এক অসভ্য নেতা। শুনেছি, এই অসভ্যটা চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ক্ষমতা বদলের সঙ্গে তার রূপও পালটে যায়।…
ভাইরে, শিবির ব্লেইম দিচ্ছেন আবার তলে তলে সাচ্চা শিবির আর মওদুদীবাদীদের পুষছেন, নিজের গ্রুপ ভারী করতে অথবা অন্য কোনো বিনিময়ে…আবরার হত্যার প্রতিবাদ আপনাদের করার দরকার নাই। ওইটা আমরা আমজনতা করছি। আপনারা শিবির ব্লেইম দেওয়া সাচ্চা শিবিরদের দল আর বগল থেকে বের করেন… শুদ্ধ হন…।’
রাশেদ খান নামে একজন অনলাইন এক্টিভিস্ট লিখেন, ‘কেউ ক্ষমতাকে ভালোবেসে দেশ দিয়ে দেয়। আর কেউ দেশকে ভালোবেসে জীবন বিলিয়ে দেয়। আবরার নিজের জীবন দিয়ে সবাইকে সেই তফাতটা দেখিয়ে দিয়েছে।’
রাজেশ চক্রবর্তী লিখেন, ‘মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’
গণমাধ্যমকর্মী আল রহমান লিখেন, ‘আবরারের খুনিদের বাঁচাতে অনেক চেষ্টা হবে। ঘটনা ভিন্ন খাতে নেবে। খুনিদের আড়াল করবে। আশ্রয় দেবে। কিন্তু মানুষের ঘৃণা থাকবেই।’
গণমাধ্যম কর্মী নাজমুদ্দিন এরবাকান লিখেন, ‘বুয়েটে কী হয়েছে ভুলে যান। কয়েকদিন এটা নিয়ে মিডিয়া একটু মাতামাতি করবে। তারপর বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনে সব চাপা পড়বে!’
মুহাম্মদ নাজমুল হাসান লিখেছেন, ‘কে মারে কে মরে, এ দায় বলো কার? অভিশাপ দিয়ে যায়, কত শত আবরার!’
মুস্তফা ইউসুফ লিখেছেন, ‘টর্চার সেল ছিল পাক হানাদার বাহিনীর। রাজাকারদের তথ্যে তারা স্বাধীনতাকমী বাঙালিদের ধরে এনে অমানষিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করত। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও এদেশের ক্ষমতাওয়ালাদের ঘরে ঘরে টর্চার সেল। আপনি যে অভূতপূর্ব অসীম ক্ষমতার মালিক, টর্চার সেল একটা না থাকলে সেটা প্রমাণ করা যায় না, তাই না?’
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদ নুরুল আজিম রনি তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘বুয়েটে হত্যাকাণ্ডের শিকার শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করা হোক। যদি রাজনৈতিক কারণেও এই হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে তবে সকল খুনিদের বিচারের আওতায় আনা হোক। জোট সরকার আমলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে যে লাশের মিছিল আমরা দেখতে পেয়েছিলাম তা থেকে শেখ হাসিনার শাসনামলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ অনেক বেশি নিরাপদ রয়েছে। খুন ও খুনীদের প্রশ্রয় দেয়ার কলঙ্ক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও পরিবারের সকল সদস্যদের হারানোর পরেও খুনিদের জানে খতম করার রাজনীতি করেননি। দুই দফা ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে তিনি বিচারের আওতায় এনে খুনিদের সাজা দিয়েছেন। মোদ্দা কথা, রাজনীতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাশের গন্ধ থাকা উচিত নয়। আমি শতভাগ নিশ্চিত, খুনিদের আইনের আওতায় এনে সরকার তা আবার প্রমাণ করবে।’

x