এয়া : নৈসর্গিক কাব্যপ্রহর

আকেল হায়দার

শুক্রবার , ৮ জুন, ২০১৮ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ
26

চলতি বছর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তরুণ কবি জুননু রাইনের কবিতার বই ‘এয়া’। কবিতার সাথে এই কবির সংসার বেশ দীর্ঘদিনের। তবে কবিতাকে কাগজের ঘুড়িতে মেলে ধরে আত্মপ্রকাশে এটাই তার প্রথম প্রয়াস। সংগ্রহ করে কবিতাগুলো পড়ার পর থেকে বইটি নিয়ে কিছু লেখার তীব্র তাগিদ অনুভব করছিলাম। একটু দেরি হয়েও উচ্ছ্বসিত এই ভেবে যে ব্যতিক্রমী কিছু এই কবিতা সংকলন নিয়ে লেখার সুবর্ণ সময়টা শেষ পর্যন্ত হাতে পেয়েছি।

কবি তার কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছেন ‘এয়া’। নামের মধ্যেই অন্তর্হিত আছে এক গূঢ় রহস্য। অভিধান আশ্রয়ী কেউ যদি শব্দটির এর অর্থ খুঁজতে যান তাহলে তাকে ফিরতে হবে শূন্য হাতে। কেননা বইয়ের নামে ব্যবহৃত শব্দটি নেয়া হয়েছে আদি মহাকাব্য ‘গিলগামেশ’ থেকে। ‘এয়া’ মূলত একজন দেবতার নাম। যিনি প্রতিনিধিত্ব করেন সত্য, সুন্দর আর মঙ্গলের। বইটিতে এয়া সিরিজে সাইত্রিশটি কবিতাও স্থান পেয়েছে। সতেরোটি স্বতন্ত্র কবিতাসহ মোট চুয়ান্নটি কবিতার সংকলন ‘এয়া’।কবিতার বিষয়বস্তুতে বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে প্রকৃতি, প্রেম, রাজনীতি, সমাজনীতি ও সমসাময়িক নানান ঘটনার কথা। প্রতিটি কবিতাই যেন প্রতিনিধিত্ব করে বর্তমান সমাজের একেকটি অধ্যায়। অনাচার, বৈষম্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবিতার শব্দেরা সোচ্চার ধ্বনিতে সামনে এসে দাঁড়ায় সচেতন বিবেকের মতো। তনু, ফেলানী, বিশ্বজিৎ, সাগররুনী,হজরত আলী,আয়েশা জানান দেয় চলমান সমাজের খণ্ড খণ্ড বেদনার্ত বার্তা (ব্যর্থতাগুলোর গভীর সফলতা)। ধিক্কার দেয় নির্বোধ কূপমন্ডুক জঙ্গিদের। নিষ্পাপ শিশুদের কান্না, অকাল মৃত্যু, রক্তে রঞ্জিত হওয়ার বার্তা লিখেন মিয়ানমারের নেত্রী সুচির উদ্দেশ্যে (শান্তি)। বিচারহীন সংস্কৃতি দেখে দেখে তিনি স্বগতোক্তি করেন ‘খুন হতে হতে খুন শব্দটিই মরে গেলে তোমার কিছুই করার থাকবে না বাহাদুর (মহামান্যের বিষণ্ন বাগানে)। ‘আমার হাতটা কেটে হলেও আমাকে বাঁচান’ রানা প্লাজার নির্মম দুর্ঘটনা নিয়ে লেখা ‘সাভার ট্রাজেডি’ ২৪//১৩ সহজে নাড়া দেয় পাঠক হৃদয়। মাকে নিয়ে তিনি লিখেন ‘মাকে খুব মনে পড়ছে অনেকগুলো ঝরে পড়া মুখরতা পরে (মায়ের জন্য কবিতা)। একাকিত্ব আর বিষণ্নতার মাঝে কখনো প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে বলেন ‘তোমাকে আমার যেন কিছু বলার নেই শুধু নাম ধরে ডাকা ছাড়া’ (খুশবু)

এয়া সিরিজের কবিতাগুলো বেশ ব্যতিক্রমী। প্রতিটি কবিতার বিষয়বস্তু ও চিত্রকল্পেও রয়েছে ভিন্নতা। বর্তমান সময়ে বসে তিনি লিখেছেন অনাগত দিনের অনুক্ত সব কথকথা। আগামী দিনের পাঠকের জন্য লিখেন আজকের ফুল, পাখি, নদী, মাঠ আর পাহাড়ের কথা। ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের স্রোতে এক সময় যা হয়তো হারিয়ে যাবে আমাদের কাছ থেকে। জুননু রাইন নাগরিক কবি হলেও কবিতায় গ্রাম ও প্রকৃতির প্রভাব বিস্তর। তার কবিতায় ঘুরে ফিরে বার বার আসে নদী, মাঠ, ফসল, হাট, কৃষকের কথা। শহুরে সোডিয়াম আলোয় বসে তিনি খোঁজেন মাটির ঘ্রাণ, স্পর্শ করেন সবুজ উল্লাস, বৃষ্টির হেঁটে যাওয়া। শহুরে বিজলী বাতির ভেতর খুঁজে বেড়ান কুপির আলো। কখনো ভালোবাসার বিকেল একাকী বিকেল সঞ্চয় করে রাখেন তার জন্য। অনিন্দ্য সুর ও সংগীতে স্বাগত জানান তাকে নিজের নৈসর্গিক রাজ্যে। কখনো ভালোবাসার নিঃসীম আকাশে একাকী খুঁজে বেড়ান ঈশ্বরের অস্তিত্ব।

অজস্র কবি ও কবিতার ভিড়ে জুননু রাইনের এই গ্রন্থ নিঃসন্দেহে একটি ভিন্ন মাত্রার সংযোজন। সাবলীল শব্দ বুননে কাহিনীকল্পের সফল রূপায়ন কবিতাগুলোর শক্তিশালী দিক।প্রতিটি পঙক্তিতে তিনি পাঠকের জন্য রেখে যান বর্তমান সময়ের অনেক ইতিহাস। বৈচিত্র্যময় কাব্যরসে যারা মত্ত তাদের সংগ্রহে রাখার মতো কবিতার বই ‘এয়া’। সমকালীন কবিতার ভিড়ে কেউ যদি কাব্যের আলাদা জগতে যেয়ে ভিন্নতার স্বাদ নিতে চায় তাদের জন্য ‘এয়া’।

x