এসো খুঁজে ফিরি সেই স্কুলবেলা

আকাশ আহমেদ : রাঙ্গুনিয়া

সোমবার , ৫ নভেম্বর, ২০১৮ at ৩:৪২ অপরাহ্ণ
19

স্কুলের আঙ্গিনায় হঠাৎ দেখা কিশোর বয়সের স্কুল জীবনের বন্ধুদের সাথে। আকস্মিক দেখাতে কেউ কাউকে চিনতে পারছিল না। তবে চিনতে তেমন দেরি হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। প্রাণের উচ্ছ্বাসে প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোর আলাপচারিতায় জমে উঠে। একসময় দুজন হারিয়ে যায় স্কুল জীবনের দুরন্তপনা দিনগুলোতে। সেদিনের না বলা অনেক কথাও বলে দু’জন। এভাবে দিনটি কেটেছিল রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৯৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী আবদুল কাদেরের। তার বন্ধু প্রবাসী সেলিমের সাথে দীর্ঘ ২০ বছর পর দেখা হয়েছে তার। তারপর তারা দু’জন মিলে তাদের ব্যাচের অন্যান্য সহপাঠীদের নিয়ে বিদ্যালয় ঘুরে স্কুলের পুরনো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করা শুরু করেন। কোন স্যার তাদের কিভাবে পড়াতেন, কে তাদের খুব মারতেন, কে তাদের খুব ভালবাসতেন, বিদায় নেওয়ার সময় ডায়রিতে কে কি লিখেছেন এসব বলতে বলতে ২০১৮ সাল থেকে দু’জন যেন ফিরে যান পুরনো সেই দুরন্ত ৯০ দশকের স্কুল জীবনের দিনগুলোতে। এভাবে নতুন ও পুরাতন হাজারো শিক্ষার্থীদের পদচারণায় ২০ অক্টোবর শনিবার সকালে প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতেছিল সরফভাটা ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ। ‘এসো খুঁজে ফিরি সেই স্কুলবেলা’ শিরোনামে স্কুলের সাবেক বর্তমান শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘আস্থা অবিচল’-এর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এই মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় পুরাতন ও নতুন শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত আড্ডায় পরিণত বয়সেও শিক্ষার্থীরা হারিয়েছেন ফেলে আসা দুরন্ত কৈশোরে।
সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনটির বিভিন্ন কর্মসূচি। শুরুতেই সকাল ৯টায় বর্ণাঢ্য র‌্যালি শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। র‌্যালিতে অংশ নেন নতুন ও পুরাতন শিক্ষার্থী ছাড়াও বর্তমান পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, কর্মচারী ও এলাকার সুধীজনরা। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শুরু হয় আলোচনা সভা, গুণীজন সংবর্ধনা ও স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান। সভায় বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক আহমদ সৈয়দ মাস্টার (৭৫) বলেন, এই স্কুলটি অনেক চড়াই উতরায় পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। তিনি আকুতি করে আরও বলেন, সরফভাটায় ছাত্রছাত্রীদের কোন খেলার মাঠ নেই। পুরাতন ও নতুন শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি আহবান জানান, তোমরা যেভাবে পারো সরফভাটা স্কুলে একটি খেলার মাঠ প্রতিষ্ঠা করো। আমি বেঁচে থাকতে এই মাঠ দেখে যেতে পারলে শান্তি পাব। প্রাক্তন ছাত্রী ফরিদা বেগম (৫৫) বলেন, আমাদের সময়ে এত সুন্দর ভবন আর এমন শিক্ষার পরিবেশ ছিল না। এখন সরফভাটা স্কুলে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। তোমাদের মাঝে এই স্কুল বেঁচে থাকবে। তিনি স্কুল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা শিক্ষক ও মা-বাবাকে সবসময় শ্রদ্ধা করবে। তাদের শ্রদ্ধা করলে জীবনের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারবে। আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী হাসিনা বেগম (৬০) বলেন, সরফভাটায় সব আছে, শুধু একটি কলেজ নেই। সরফভাটা স্কুলের পুরাতন অনেক শিক্ষার্থী এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। আমি বিশ্বাস করি, সবাই মিলে চেষ্টা করলে এই অভাব দূর হবে। অনুষ্ঠানে আসা কবি রিমঝিম আহমেদ বলেন, জীবন কেবলই কইছালি করে ফিরে যেতে ছোট্টবেলায়। যেখানে জীবনের সব সুখ-স্বপ্ন ফেলে আসে মানুষ। সব বড় (বয়সে) মানুষই শেষ জীবনে এসে ছোট (বয়সে) হতে চায়। ফিরে পেতে চায় সেই ছোট্টবেলা। আস্থা অবিচল তেমনি কিছু বড় মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছে সেই ছোট্টবেলা। এটি বড় আনন্দের। সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, যাপিত জীবনে মানুষ অষ্ট প্রহর ব্যস্ত থাকে বেঁচে থাকার সংগ্রামে। স্বপ্ন দেখতেই ভুলে গেছে। ভুলে গেছে জীবনকেও একটু আনন্দ আশ্রমে বেড়াতে নিয়ে যেতে হয়। আস্থা অবিচল সেই কাজটিই করেছে তার প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে। একদল স্বপ্ন হারানো মানুষকে নিয়ে এসেছে তাদের ফেলে আসা আনন্দ আশ্রমে। এ জন্যে অশেষ কৃতজ্ঞতা এই সংগঠনটির প্রতি। ডা. মোহাম্মদ আবুল ফজল বলেন, ভুলে যাওয়া স্মৃতি, ভুলে যাওয়া নাম, ভুলে যাওয়া মানুষগুলোকে কাছে পেয়ে সত্যিকার অর্থেই জীবনকে খুঁজে পেয়েছি। সারা জীবন ধরে যা করেছি সবই বেঁচে থাকার জন্যে। আর যে জীবন ফেলে এসেছি মনে হয় সেইটুকুই সঞ্চয়। এখানে এসে মনে হচ্ছে এইটুকু না থাকলে জীবনটা শুধুই বৃথাই থেকে যেতো। সরফভাটা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয়ের ১৯৯০ ব্যাচের শিক্ষার্থী মুজিবুল ইসলাম সরফী বলেন, আস্থা অবিচলের অনুষ্ঠানে এসে আমি নিজেই হারিয়ে গেছি আমার স্কুল জীবনের দিনগুলোতে। খুব ভাল ও প্রাণবন্ত জীবনের স্মরণীয় একটি অনুষ্ঠান এটি। বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিচালনা পরিষদ সভাপতি ও ১৯৯০ ব্যাচের শিক্ষার্থী নিজাম উদ্দিন বাদশা বলেন, নতুন পুরাতনদের মাঝে একটি সেতুবন্ধন আস্থা অবিচল সংগঠন। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আমরা সবাই একত্রিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি এবং স্মৃতিময় একটি দিন পেয়েছি। বিদ্যালয়ের অনেক সমস্যা ও সংকট রয়েছে। যেগুলো সমাধান করতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সহায়তা জরুরি। আস্থা অবিচল সংগঠনের সভাপতি ও বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষক আবদুর রউফ মাস্টার বলেন, আস্থা অবিচল সৃষ্টি হয়েছে শুধুমাত্র সরফভাটা ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলন ঘটাতে। সবার যৌথ উদ্যোগে ‘আস্থা অবিচল’র মাধ্যমে আমাদের প্রাণের এই প্রতিষ্ঠান যেন সারা বাংলাদেশে মডেল হয় সেই প্রত্যাশা করছি। বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি খালেদ মাহমুদ বলেন, ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলে সেই স্বপ্ন কখনো সফল হবে না। জেগে স্বপ্ন দেখতে হবে। তিনি স্কুল কমিটির উদ্দেশ্যে বলেন, স্কুলে অনেক সমস্যা রয়েছে। আপনাদের কর্মপরিধি দিয়ে স্কুলের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে হবে। প্রধান অতিথি ড. হরিশংকর জলদাশ বলেন, মিথ্যা চর্চা দিয়ে জীবন গঠন করা যায় না। জীবনকে পরিণত করতে হলে সত্যের পথে এগুতে হবে। বই ও শিক্ষাকে সম্মান জানাতে না পারলে কখনো সফলকাম হওয়া যায় না। আগের দিনে কাঁচা ঘরে পাকা পড়ালেখা হতো আর এখন পাকা ঘরে কাঁচা লেখাপড়া হয়। সমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান ‘আস্থা অবিচল’ এলাকার সুশিক্ষার পথ দেখাবে। স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে আস্থা অবিচলের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণিকা প্রকাশিত হয়। যেখানে বিভিন্ন গুণীজনদের বাণী, স্মৃতিচারণমূলক লেখা, সরফভাটা ও রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন ইতিহাস ঐতিহ্য, বিদ্যালয়ের সাবেক বর্তমান শিক্ষার্থীদের ছবি সহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। দুপুরের মধ্যাহ্ন ভোজের পর বিকেলে জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। যেখানে রাঙ্গুনিয়াসহ চট্টগ্রামের নামকরা গুণীশিল্পীরা গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন। মনোজ্ঞ এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নেচে গেয়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেন বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। শেষে র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হয়।

x