এসেছে বৈশাখ

রেজাউল করিম

বুধবার , ১০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৯:০৫ পূর্বাহ্ণ
49

বছর ঘুরে বৈশাখ দুয়ারে এসেছে। বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/ তাপস নিঃশ্বাস বায়ে/ মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক/ এসো এসো…/ যাক পুরাতন স্মৃতি/ যাক ভুলে যাওয়া গীতি/ যাক অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক/ যাক যাক/ এসো এসো…/ মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা/ অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা…।’
বৈশাখের প্রথম দিনটি বাংলা নববর্ষ। বাঙালির চিরায়ত উৎসব। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ একসময় ছিল গ্রামীণ বাঙালির উৎসব। গ্রামবাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল উৎসবের বিষয়-আশয় ও বিন্যাসগত রূপবৈচিত্র্য। গরুর দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, বলী খেলা, হা-ডু-ডু খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, কবির লড়াই, যাত্রাপালা, জারিসারি–এসব উপাদানেই সাজানো হয় নববর্ষের উৎসব। গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের সাংবাৎসরিক প্রধান উৎস পহেলা বৈশাখ। এদিনে ওই সব উপাদানে নিজেদের দুঃখ-দৈন্য-দারিদ্র্য ভুলে একটু আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকে। গ্রামীণ মানুষের মধ্যেই নববর্ষের গ্রামীণ উৎসব ও হালখাতা নিয়ে যে আমোদ-প্রমোদ তাতে যে সামাজিক সংহতি সৃষ্টি হতো তার গুরুত্বও কম নয়। নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামীণ বাংলাদেশের এই উৎসবকেন্দ্রিক সামাজিক সংহতি বাঙালির সাংস্কৃতিক ভিত্তিভূমিকেও একটি সর্বজনীন রূপ দেয়।
নববর্ষ একসময় আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে উদযাপিত হতো। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয়। তাঁর সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।
বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের শুরুতে তাঁদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। তবে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে এই হালখাতা অনেকটা ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। শহরে অত্যন্ত সীমিত, এমনকি গ্রামেও হালখাতার প্রচলন উঠে যাচ্ছে। এখন বাংলা সনের ব্যবহার সীমিত হয়ে গ্রামবাংলায়ও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। এই বৃদ্ধির কারণও আছে।
গ্রামের চেয়ে নগরে এখন অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। বছরের প্রথম সূর্যোদয়ের সাথে সাথে উৎসবের শুরু হয়। ১৯৬৭ সালে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ গঠনের মাধ্যমে রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনের যে সূত্রপাত ঘটে, তা পাকিস্তান আমলে বাঙালির প্রতিরোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার চেতনার এক দীপ্র প্রতীক হয়ে ওঠে। ছায়ানটের সেই অনুষ্ঠান প্রতিবছর বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে নাগরিক বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে এমন এক জাতীয় উৎসব বাঙালি জীবনের অনন্ত প্রেরণার উৎস। স্বাধীনতার পর বর্ষবরণে আসে নানা রঙ, অনুষঙ্গ। ১৯৮৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র-শিক্ষকরা বর্ষবরণে আনে ভিন্নতা। তারা বের করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। কার্টুন, মুখোশ, বাদ্য-বাজনা, নানা বৈচিত্র্য এতে সন্নিবেশিত হয়। আর এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে। নগরে বর্ষবরণের পাশাপাশি বৈশাখী মেলা বসে। চট্টগ্রামে ডিসি হিল, সিআরবির শিরীষতলায় নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে আয়োজন করা হয় নানা আয়োজনের। সিআরবিতে সাহাবুদ্দীনের বলী খেলা, মোরগ লড়াই বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে এনেছে ভিন্নতা। নগরীর বিভিন্নস্থানে বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়। বসে মেলা। মেলায় স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী পাওয়া যায়।
এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন : চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, নানা ধরনের মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। পাহাড়ে হয় বৈসাবি উৎসব। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু-এই তিনটি উৎসবের আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি উৎসব। পুরানো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে পাহাড়ে তিন দিনের এই উৎসব উদযাপিত হয়। সমতল-পাহাড়ে বাসিন্দাদের কাছে নববর্ষ আসে মঙ্গল কামনায়।

x