এলো আবার বিশ্বকাপ

নজরুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ১:০৪ অপরাহ্ণ
39

সেই ১৯৩০ সালের কথা। পৃথিবীর একেবারে উত্তর প্রান্ত থেকে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ নামক এক আলোক রশ্নি। কালের বিবর্তনে দীর্ঘ ৮৮ বছরের পদ যাত্রায় আজ সে বিশ্বকাপ এখন বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। সেদিনের সাদাকালো যুগ পেরিয়ে আজ বিশ্বকাপ বর্ণিল আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত করছে পুরো বিশ্ব। উত্তর থেকে দক্ষিণ এরপর পূর্ব থেকে পশ্চিম পেরিয়ে আজ মধ্য পৃথিবীতে বিশ্বকাপ। বিশ্বের সবচাইতে বড় দেশ লেলিনের দেশে এবার তাবু গেড়েছে ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বকাপ। রাত পোহালেই শুরু হয়ে যাবে একটি ট্রফির জন্য ৩২ জাতির এই লড়াই। যেখানে সাদাকালোলম্বাখাটো সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে জানপ্রাণ দিয়ে। বিশ্ব কাঁপানো বিশ্বকাপ আবার এসেছে বিশ্ব মাতাতে। আজ থেকে শুরু হলো নির্ঘুম রাত। আনন্দের রাত, উৎকণ্ঠাত, আবেগের রাত আর অনুভূতির রাত। বিশ্বের কয়েকশ কোটি জোড়া চোখ আজ থেকে নিবদ্ধ থাকবে রাশিয়ার ১১টি শহরে। সাত সমুদ্র তের নদীর এপারের মানুষগুলোর যেন টেনশনের শেষ নেই। কেমন করবে প্রিয় দল, কে জিতবে শিরোপা, কেমন করবে প্রিয় খেলোয়াড়টি। কিভাবে বরণ করবে বিশ্বকাপকে তারও যেন অন্ত নেই বিশ্ব জুড়ে। পুরো বিশ্বকে এক করতে পারে তেমন নজির বিশ্বে তেমন একটা নেই। পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ থেকে শুরু করে দারিদ্র বিমোচন কোন কিছুই পুরো বিশ্বকে এক করতে পারেনি কখনোই। কিন্তু একটি বিশ্বকাপ যেন পুরো বিশ্বকে এক জাতিতে পরিণত করে। যে জাতির নাম ফুটবল জাতি।

যেখানে নেই সাদাকালোধনীগরীবউঁচুনিচুলম্বাখাটো কিংবা অন্য প্রজাতি। আগামী একটা মাস যেন সবাই ফুটবল জাতি। যেখানে দেশের শীর্ষ ব্যক্তিটি থেকে শুরু করে একেবারে বস্তির পিচ্ছিটাও মেতে থাকতে চায় ফুটবল উন্মাদনায়। বিশ্বময় এ যে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে কেবল এই বিশ্বকাপ। আর সে প্রাণের বিশ্বকাপ আজ দরজায় উকি দিচ্ছে। শাশ্বত আনন্দের আহবান জানাচ্ছে বিশ্বের শতকোটি মানুসকে। বিশ্বকাপ এমনই এক মহৌষধ যা সেবন থেকে বিরত থাকে না কেউই। বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশের মধ্য থেকে কেবলমাত্র সৌভাগ্যবান ৩২টি দেশ অংশ নেয় বিশ্বকাপে। যাদের আবার এই মহা মঞ্চে আসতে পার হতে হয়েছে অনেক কাটখড়। লক্ষ্যে যারা পৌঁছাতে পারেনি তারা যে আবার মলিন বদনে বিশ্বকাপ দেখা থেকে বিরত থাকে তা কিন্তু না। যারা বিশ্বযুদ্ধের ময়দানে সুযোগ পেয়েছে তারাতো বটেই যারা সুযোগ পাননি তাদের মধ্যে উৎসাহআগ্রহউন্মাদনা যেন আরো বেশি। কারণ বিষয়টা বিশ্বকাপ। তাও আবার আসে চার বছর পরপর।

বিশ্বজুড়ে এখন মেসিনেইমার উন্মাদনা। সাত সমুদ্র তের নদীর উপারের মেসি কিংবা নেইমার, অথবা সাদা চামড়ার জার্মান সুপার স্টার মুলার, নয়্যার, কিংবা পর্তুগিজ রাজপুত্র রোনালদো যেন পাশের বাড়ির কেউ। যেন যুগ যুগ ধরে পরিচয় কিংবা উঠা বসা তাদের সাথে। আর এ সংযোগ করে দিয়েছে বিশ্বকাপ। আরেকটু বললে ফুটবল। আর সে ফুটবলের মহাযুদ্ধ শুরু আজ। যে যুদ্ধে নেই ঢাল তলোয়ার কিংবা কামান গোলা। পারমাণবিক অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই এই যুদ্ধে। এই যুদ্ধ কেবলই পায়ের। এই যুদ্ধ কেবলই কৌশলের। যে যুদ্ধ বুদ্ধির আর মাঠে দ্যুতি ছড়ানোর। সে যুদ্ধে শামিল হচ্ছে আজ পুরো বিশ্ব। যেখানে সৈনিকের ভূমিকায় কেবল ৩২ দেশের ৭৩৬ জন ফুটবলার। সাথে ৩২ জন সেনানায়ক। যারা মাঠের বাইরে থেকে কৌশল বাতলে দেবেন। যাদের ইশারায় লড়কে ৭৩৬ জন লড়াকু সৈনিক।

বিশ্বকাপ মানে নতুন উন্মাদনা। বিশ্বকাপ এখন কেবল মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই। মাঠের বাইরেও অনেক কিছু দেয় এই বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে নতুন নতুন চমক নিয়ে আসে ফুটবলাররা। কারো চুলের স্টাইল কিংবা কারো দাড়ির স্টাইল। কারো গোল উদযাপনের স্টাইল কিংবা কারো খেলার ধরন। আরো কত কি। এবারে যেমন লিওনেল মেসি বিশ্বকাপের মঞ্চে হাজির হচ্ছেন মুখ ভর্তি দাড়ি নিয়ে। গেল বিশ্বকাপে এই মেসি ছিলেন একেবারে ক্লিন সেভড। তেমনি অনেক কিছু উপহার পাবে এই বিশ্বকাপ।

ইউরোপের পাওয়ার ফুটবল কিংবা লাতিনের শৈল্পিক ফুটবল কিংবা আফ্রিকার দানবীয় ফুটবল বা এশিয়ার ম্যাড়ম্যাড়ে ফুটবল। বিশ্বকাপে স্বাদের যেন শেষ নেই। যদিও বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত কারো জন্য স্বাদের আবার কারো জন্য তিক্ত। সেটা যেমন ফুটবলারদের জন্য তেমনি সমর্থকদের জন্য। তবে বিশ্বকাপ উন্মাদনার যেন শেষ নেই । তেমনি নেই বিতর্কেরও। গ্রামের একেবারে ভাঙা চায়ের দোকান থেকে শুরু রাজ প্রাসাদ পর্যন্ত সর্বত্র বিশ্বকাপের আলোচনা। কে জিতবে শিরোপা। মেসি নাকি নেইমার। রোনালদো নাকি মুলার। কার পায়ে পড়বে সোনার বুট। সালাহ নাকি পগবা। এমন হাজারো আলোচনা আর সম্ভাবনার কথা ফুটে উঠে বিশ্বকাপের সর্বজনীন আলোচনায়।

বিশ্বকাপে লড়াই কিন্তু শুধু একটি ট্রফির জন্য নয়। মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও অনেক লড়াই জড়িয়ে থাকে বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ মানে বিশ্ব ফুটবলের মিলন কেন্দ্রও। বিশ্বকাপে খেলতে যেমন লড়াই করতে হয়। ঘাম ঝরাতে হয় বছরের পর বছর। তেমনি এই বিশ্বকাপের আয়োজক হতেও পাড়ি দিতে হয় অনেক বাধার পাহাড়। বিশ্বের সেরা সব ফুটবলারের হাট বসবে যে দেশে সে দেশের জন্য চ্যালেঞ্জটা থাকে সবচাইতে বেশি। কারণ বিশ্বকাপ ফুটবলের সাথে দেশটির কৃষ্টি, সংস্কৃতি, পর্যটন, অর্থনীতি সবকিছু পৌঁছে যায় বিশ্ব দরবারে। বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করাটা যেমন কঠিন তেমনি বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়াটাও আরো কঠিন। যেখানে সবকিছু হতে হয় বিশ্বমানের। তবে বিশ্বকাপের ৮৮ বছরের ইতিহাসে দিনে দিনে বেড়েছে বিশ্বকাপ আয়োজনের জৌলুসও। একটা সময় যেমন ছিল সাদাকালো যুগ। আর সে যুগ পেরিয়ে আজ বিশ্বকাপ প্রযুক্তির শিখরেও। তাই বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়ার জন্য যেমন পোহাতে হয় নানা কাঠখড়, ডিঙ্গাতে হয় বাধার পাহাড়, তেমনি এই বিশ্বকাপ আয়োজনকে সফল করতে লড়াইটা যেন আরো বড়। কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি হাল আমলে সবচাইতে বড় দুশ্চিন্তাটি করতে হয় নিরাপত্তা। বিশ্ব পরিস্থিতির বিচারে নিরাপত্তাকে করতে হয় নিশ্চিদ্র। এবারে যেমন সে লড়াইটি বেশি করতে হচ্ছে আয়োজক রাশিয়াকে। কারণ হাল আমলের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছে বিশ্বকাপকে। তবে সে সব নিয়ে কোন ভ্রুক্ষেপই যেন নেই আয়োজক রাশিয়া থেকে অংশ নেওয়া ৩২ দলের । এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সমর্থকদেরও। তাদের সামনে একটাই পথ। আর সেটা বিশ্বকাপ ফুটবল। যে পথে সবাই যেন মিলে মিশে একাকার। বিশ্বের উত্তর থেকে দক্ষিণ আর পূর্ব থেকে পশ্চিম সবাই আজ রাশিয়ামুখী। সবকটি পথ যেন হাজারো ঐতিহ্যের দেশ রাশিয়ায় গিয়ে থেমেছে। রাশিয়ার রাজধানী আর রেড স্কয়ারের মস্কো থেকে শুরু করে পর্যটন নগরী সেইন্ট পিটার্সবার্গ কিংবা সমুদ্র কন্যা সুচি কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ের রাশিয়ার দ্বিতীয় রাজধানী সামারা কিংবা মধ্য রাশিয়ার শহর সানারস্ক সবখানে আজ সাজসাজ রব। আর এই সাজের উদ্দেশ্য একটাই তা হলো বিশ্বকাপ। প্রথমবারের বিশ্বকাপের আয়োজক রাশিয়া চমকে দিতে চায় পুরো বিশ্বকে। এরই মধ্যে ফিফার সভাপতিও বলেছেন রাশিয়া হবে আধুনিক বিশ্বকাপের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

বিশ্বকাপকে ঘিরে ৩২ দেশের ফুটবলারের পাশাপাশি সাবেক ফুটবলার, ফুটবল কর্তা আর দশ লক্ষাধিক পর্যটকের পদভারে মুখরিত এখন বিশ্বের সবচাইতে বড় দেশ রাশিয়া। বিশ্বকাপ উন্মাদনার ঢেউ যেন সেই সুদূর রাশিয়া থেকে আঁছড়ে পড়ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। এক বিশ্ব, এক দেশ, এক গান, এক গল্প, এক সুর যেন আজ এক সুতোয় গাঁথা। যে সুতাটির নাম বিশ্বকাপ ফুটবল। মেসি, নেইমার, রোনালদো, সালাহ, মুলার, ইনিয়েস্তা কিংবা গ্রিজম্যান বন্দনায় যেন মুখর আজ সারা বিশ্ব। একমাসের প্রাণান্তকর লড়াই শেষে আগামী ১৫ জুলাই স্বপ্নের বিশ্বকাপ উঠবে একজনের হাতে। শেষ হাসিটা হাসবে একজন। কিন্তু বাকিরা ফিরে যাবেন আবার পরের আসরের জন্য প্রস্তুতি নিতে। এভাবে চার বছর পর আবার মধ্য প্রাচ্যের দেশ কাতারে সমবেত হবে বিশ্বের ফুটবল স্বপ্নচারীরা। যেখানে হয়তো হারিয়ে যাবেন এ আসরের অনেকেই। যাদের দেখা যাবে না অনেককেই। যারা এবারের আসরে মাঠ মাতাবেন কিংবা বিশ্বকাপ ট্রফি জিতবেন।

বিশ্বকাপ আগামী একমাস একীভূত করে রাখবে পুরো বিশ্বকে। আবার দ্বিধা বিভক্তও করে রাখবে বিশ্বকে। আজ থেকে পুরো বিশ্ব যেন দুই ধারায় বিভক্ত। একদিকে আর্জেন্টিনা আর অন্যদিকে ব্রাজিল। তেমনি বিশ্বকাপকে ঘিরে যেন পুরো বিশ্ব আজ এক মঞ্চে। তবে ত্রিধারা হওয়ারও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। লাতিন আমেরিকার দুই দেশের পাশাপাশি ইউরোপের সমর্থকও কম নয় বিশ্বে। আবার হতে পারে একাধিক ধারাও। তবে সব ধারার চূড়ান্ত মঞ্জিল কিন্তু একটিই। আর সেটি হচ্ছে বিশ্বকাপ। একমাত্র বিশ্বকাপ। কারণ এই বিশ্বকাপেই বিশ্বকাপে। তাইতো বিশ্বজুড়ে একটিই আওয়াজ এলো এলো আবার বিশ্বকাপ এলোরে।

x