এমন কোনো মাস যায়নি আমি একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা বানাইনি -আব্বাস কিয়ারোস্তামি

মঙ্গলবার , ৯ জুলাই, ২০১৯ at ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ
67


আব্বাস কিয়ারোস্তামি সত্তরের দশকে ইরানের চলচ্চিত্র জগতে শুরু হওয়া নবতরঙ্গ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। ইরানী চলচ্চিত্রকে বিশ্বের কাছে অনন্য বৈশিষ্টরূপে হাজির করা এই অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাতা ১৯৪০ সালে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা করেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা নিয়ে। পরে কাজ শুরু করেন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ও টেলিভিশনে। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে তিনি ইরানী টেলিভিশনের জন্য প্রায় ১৫০টি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। কিয়ারোস্তামি তার প্রথম ছবি ‘দ্য রিপোর্ট’ নির্মাণ করেছিলেন ১৯৭৭ সালে। ইরানী বিপ্লবের পর অনেক চলচ্চিত্রকারের মতো দেশ ছেড়ে না যাওয়া এই স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালক একের পর এক নির্মাণ করেন ৪০টিরও বেশি সিনেমা। ১৯৯৭ সালে তার ‘টেস্ট অব চেরি’ সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার পাম ডি ওর জিতে নেয়। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমা হচ্ছে – ক্লোজআপ, দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস, শিরিন, লাইক সামওয়ান ইন লাভ। ৪ জুলাই ছিল কিয়ারোস্তমির তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তার স্মরণে ফরাসী তরুণ সাংবাদিক বেনোয়িট পাভানের নেয়া সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো।
সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন রাফসান গালিব

তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আপনি কেমন ছিলেন সে সময়?

আজকের দিনে এসে আমি একটা কথা বলতে চাই যে, সে সময় অন্যান্য তরুণ ডিরেক্টারদের মতোই আমি একজন সাধারণ ফিল্ম ডিরেক্টার ছিলাম। আমার ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা ছিল না। এটাকে পেশাগত জীবিকা হিসেবেও ভাবিনি। আমি চারুকলায় পড়েছিলাম কিন্তু চারুশিল্পী হইনি শেষপর্যন্ত। তখন একটা সময় মনে হল সিনেমাই আমার আশ্রয় হতে পারে এবং এটিই সেই মাধ্যম যেটা দিয়ে আমি নিজেকে সবচেয়ে ভালভাবে প্রকাশ করতে পারব।

ক্যামেরার পিছনে দাঁড়ানোর প্রথম অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আমার প্রথম সিনেমা বানানোটা আসলেই খুব কঠিন ছিল। যাক ভাগ্য ভাল যে, এটা বড়ধরনের সাফল্য এনে দিল এবং বেশ স্বীকৃতি পেল। তার মানে আমি এটা বুঝাতে চাচ্ছি না, তখনই আমি চলচ্চিত্রকার হয়ে গেলাম। আমি যদি বিশ্বাস করতাম এখানেই শেষ তাহলে আমি আর এগোতে পারতাম না। কিন্তু না, আমি আরো সিনেমা বানালাম এবং আরো আরো। যখন আমার প্রথম ফিচার ফিল্মটি বানালাম তখন নিজেকে বললাম, একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেই নিজেকে ভাবা উচিত, এটাই আমার কাজ। প্রথম ফিল্ম থেকেই আমি দুই ধরনের দর্শক লক্ষ্য করতে থাকলাম, দর্শকদের একটা গোষ্ঠী আমার কাজ ভালবাসতো আর তাদের বড় অংশটা আমার কাজ ভালবাসতো না। এটা এখন পর্যন্ত সত্য।

প্রথম সিনেমায় সাফল্য পাওয়ার জন্য কি কি বৈশিষ্ট থাকা লাগে?

আমার প্রথম সিনেমা সাফল্য পায়, একটি উৎসবে স্বীকৃতি পায় এবং সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়। আমার জন্য এটাই ছিল বড় সাফল্য। আজকে অতীত পর্যালোচনা করে বলি, আমি মনে করি না একটা ফিল্ম কোনো পুরস্কার জিতলেই সেটা ভাল ফিল্ম। একইভাবে মনে করি না একটি ভাল ফিল্ম বিশাল দর্শকগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করবে অথবা সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পাবে। আমি মনে করি যে এসব মাপকাঠি সাফল্য ধরে রাখার বিষয়। একটা ভাল ফিল্ম শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের বিবেচনায় আমাদের কাছে বিশেষ মূল্য পাবে। আমার স্মরণে আসছে না কে এই সময়টাকে ত্রিশ বছরে বেঁধে দিয়েছে। যেই হোক এটা বলা হয়ে থাকে যে ত্রিশ বছর পর আমরা বিচার করতে পারি যে একটা ফিল্ম টিকে থাকবে কিনা, এমনকি জানতে পারি সেটা এখনো টিকে আছে কিনা নাকি হারিয়ে গেছে।

একজন চলচ্চিত্রকারের ক্যারিয়ারে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র কীরকম গুরুত্বপূর্ণ?

অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ কারণ এগুলো ডিরেক্টরকে সাহসী হতে ও হাত পাকাতে সুযোগ করে দেয়। ডিরেক্টরের চরিত্র শক্তিশালী হয়ে ওঠে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানোর মাধ্যমে। ফিচার ফিল্মে প্রযোজক খোঁজা এবং অর্থের যে অপরিহার্যতা সেটা অনিশ্চিত, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার সেই সঙ্গে দর্শকের রুচির বিষয়টাও। কোন ডিরেক্টরই এই দুইটা বিষয় ইগনোর করতে পারে না। সে দিক দিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটা একেবারেই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা। অগ্রগামী হতে, নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য স্বল্পদৈর্ঘ্যের জায়গাটা আগে নেয়া উচিত এবং সেটাই হবে ডিরেক্টরের প্রথম সিনেমা।

ইরানী চলচ্চিত্রের কথা বলুন। আপনি কি মনে করেন এটা এখন শক্তিশালী অবস্থানে আছে?

আজকের ইরানী চলচ্চিত্রে দুই ধরনের ব্যাপার আছে। একদিকে আছে রাষ্ট্রীয় সিনেমা যেগুলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের আর্থিক সহযোগিতায় নির্মিত হয়। ইরানে এরকম অনেক চলচ্চিত্রকার আছেন যারা রাষ্ট্রকে খুশি করতে বা রাষ্ট্রের জন্যই কাজ করেন। আমি তাদের নিয়ে তেমন চিন্তা করি না এবং তাদের থেকে বেশি কিছু আশাও করি না কারণ তারা শুধু ইরানেই নিজেদের পরিচিত করতে পেরেছে। তাদের ফিল্ম অতিমাত্রায় আঞ্চলিক ও নির্দিষ্ট ভোক্তাশ্রেণীর জন্য। সেখানে আবার এক ধরনের স্বাধীন চলচ্চিত্র হচ্ছে যেটা আন্দোলনে রূপ দিয়েছে। অপরিচিত অনেক চলচ্চিত্রকার উঠে আসছে একদম সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চল থেকে। এজন্য অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয় নতুন প্রযুক্তি সুবিধা ও ছোট ডিজিটাল ক্যামেরাকে। তারা এর মাধ্যমে বেশ উন্নতমানের সিনেমা দিচ্ছে আমাদের। আমার আশা বাস্তবায়নের রূপ দেখতে পারছি এসব মানুষের মধ্যে।

ইরানী নিউওয়েবের পরবর্তী অবস্থা কি, যেটির সাথে আপনি জড়িত ছিলেন?

আপনাকে এই প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞাসা করতে হবে নতুন প্রজন্ম থেকে। তাদের মধ্যে কেউ বলতে পারবে কেন তারা এটা অব্যাহত রাখছে এবং যাই হোক এখানে যেটি উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছে, প্রভাব বলে। একটা বিষয় নিশ্চিত সিনেমা এবং সিনেমামেকাররা এখনের তুলনায় তখন অনেক বেশি স্বাধীন ছিল। আমাদের ছিল ‘কানুন’। এটি ছিল শিশু ও তরুণ প্রজন্ম উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান। এটির পরিচালকরা আমাদের পূর্ণ অধিকার ও স্বাধীনতা দিয়েছিল এবং তারা কখনোই আমাদের কাজে হস্তক্ষেপ করতো না। এটা ছিল অসামান্য এক বিষয় যেটি আমাদের কাজে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যাই হোক এই নিউওয়েব কখনোই ভাঙ্গার নয়। এইসব চলচ্চিত্রকাররা যারা নিজ থেকে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উঠে আসছে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলবো, তারা যেন নবতর কাজ করতে থাকে অবিরত।
এখনো বর্তমানে আপনি কী আশা করেন সিনেমা থেকে?
আমি কোন কিছু আশা করি না। আশা ধারণ করে তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু কোন কিছুর আশা বাদ দিয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি। ফিল্মের নির্যাস হচ্ছে ইমেজ সৃষ্টিতে। এমন কোন মাস যায়নি আমি একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা বানাইনি, একটা ভিডিও অথবা একটা ফটোগ্রাফ নিইনি। হয়তো আমি আজকে যা সিনেমা থেকে আশা করছি- আমাকে এটা জানতে হবে যে, যখন আমি রাতে ঘুমিয়ে পড়ছি তখনো আমি একটা নতুন ইমেজ সৃষ্টি করছি। এটা আমার হয়েছে। ঠিক একজন জেলের মত যে জাল ছোঁড়ার পর থেকে সর্বদা আশায় থাকে মাছ ধরার।

x