এবার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করছি

মাধব দীপ

শনিবার , ২৫ মে, ২০১৯ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
372

‘দুই আওয়ামী লীগ নেতাসহ ১৬ জনকে আসামি করে ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র প্রস্তুত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ মামলায় গ্রেফতার ২১ জনের মধ্যে তদন্তে ৫ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। অভিযোগপত্রটি এ মাসের মধ্যে আদালতে জমা দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে তদন্ত সংস্থাটি।…পিবিআইয়ের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের কাজ চলছে।’
-পত্রিকার পাতায় এমন একটি খবর পড়ে বেশ ভালো লাগছে। আরও ভালো লাগছে এই খবর দেখে যে- নুসরাত হত্যার ঘটনা তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইতোমধ্যে জেলা সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া- সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইউসুফ এবং এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইকবাল আহাম্মদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পি কে এম এনামুল করিমের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়।
রাফি হত্যামামলা দায়েরের প্রায় দেড় মাসের মাথায় এমন অগ্রগতিই এই ভালো লাগার কারণ। প্রিয় পাঠক, আপনারা জানেন- গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বর্বর-পাষণ্ড কিছু মানুষ। শরীরের ৮০ শতাংশ পোড়া নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঁচদিন লড়ার পর মারা যান রাফি। করুণ মৃত্যুর এই ঘটনাটি সারা দেশের মানুষকে তখন কাঁদায়।
ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার তদন্তভার পাওয়ার আগেই সোনাগাজী থানার পুলিশ সাতজনকে গ্রেফতার করে। তারা হলেন মো. আফসার উদ্দিন, মো কেফায়েত উল্যাহ, মো. আরিফুল ইসলাম, মো. আলা উদ্দিন, মো. নূর হোসেন ওরফে হোনা মিয়া, মো. সাইদুল ইসলাম ও উম্মে সুলতানা পপি। তাদের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে কেবল মাদ্রাসাশিক্ষক আফসার উদ্দিন ও মাদ্রাসার ছাত্রী উম্মে সুলতানা পপির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
গত ২৪ এপ্রিল আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মাদ্রাসাশিক্ষক এস এম সিরাজ উদদৌলা নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। অধ্যক্ষ তার জবানবন্দিতে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন ও সোনাগাজী পৌরসভা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদ আলমের কথাও উল্লেখ করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে অধ্যক্ষ ছাড়াও সাতজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই আটজনের জবানবন্দিতে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় উম্মে সুলতানা, কামরুন নাহার, শাহাদাত হোসেন, জাবেদ হোসেন ও সাইফুর রহমান মো. জুবায়েরের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এই পাঁচজন মিলে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলাকে তারা হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে দেখছেন। আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলম ঘটনার অর্থায়ন এবং আশ্রয়দাতার কাজ করেছেন। গ্রেফতার বাকি আটজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ২৩ মে, ২০১৯)।
এই অগ্রগতির কারণে ধন্যবাদ দিতে চাই জনাব বনজ কুমার মজুমদারকে। একজন সাধারণ-সচেতন মানুষ হিসেবে উনাকে একজন চৌকষ, বুদ্ধিদীপ্ত ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবেই চিনতাম। কারণ, দীর্ঘদিন তিনি চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। আবারও তিনি প্রমাণ করলেন- তাঁর দক্ষতা, আন্তরিকতা এবং মানবিকতা।
যাই হোক, নিকটঅতীতে সংঘটিত এইধরনের লোমহর্ষক ঘটনার মতো আমাদের শুনতে হলো না- ‘আমরা বাকী অপরাধীদের ধরার জন্য বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়েছি’, ‘আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে’, ‘আসামিকে পাওয়া যচ্ছে না’, আসামি পলাতক’ -ঘরানার গৎবাঁধা কিছু বুলি! জানি- অভিযুক্তদের হাত, অত্যাচারীদের হাত সবসময়ই লম্বা থাকে। আমরা চাই, অতিদ্রুত এই ঘটনার বিচার হোক। দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্যে শাস্তি হোক অপরাধীদের।
এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে সারাদেশে। আমরা চাই, কন্যাশিশু থেকে বয়েসী নারী, পাঁচ বছর কিংবা পঞ্চাশ বছর- সবাই নারীই নিরাপদ থাকুক পুরুষালি থাবা থেকে। নারীর চলাচলের পথ-ঘাট, খেলাধুলার স্থান, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সব জায়গা-ই নিরাপদ থাকুক। আমরা চাই- খাদিজা, পূজা, তনুসহ প্রতিটি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক। নুসরাতকে যারা পুড়িয়ে মারলো সেই অভিযুক্তদের মধ্যে যে বা যারাই চূড়ান্ত বিচারে দোষী সাব্যস্ত হবে- ওদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করছি। এবং সেই শাস্তি দ্রুত কার্যকর হলেই নুসরাত জাহান রাফির বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। আর আমরা কিছুটা হলেও পাবো স্বস্তি।

x