এবার ‘শাহনুর’ সিন্ডিকেটের সন্ধানে দুদক-পুলিশ

রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতি ।। তদন্তে চার ট্রাভেল এজেন্সির নাম

ইকবাল হোসেন

শুক্রবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৪:২০ পূর্বাহ্ণ
468

রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতি চক্রের একটি সিন্ডিকেট ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে আটক হলেও এবার নতুন আরেকটি সিন্ডিকেটের সন্ধানে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশ। ‘শাহনুর’ নামের এক টেকনিক্যাল এক্সপার্টের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্র থেকে কক্সবাজার জেলার রামু পর্যন্ত বিস্তৃত। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে আটক জয়নাল সহ পাঁচ জনের সরাসরি যোগসাজশ পেয়েছে দুদক। এতে ফেঁসে যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করার সহযোগী হিসেবে তদন্তে রয়েছে চট্টগ্রামের চার ট্রাভেল এজেন্সিও। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমাদের হাত দিয়ে কোন ভোটার হয় না। রোহিঙ্গা ভোটার করার বিষয়ে জড়িত থাকার অভিযোগটিও সত্য নয়।’ তিনি দুই বছর ধরে চট্টগ্রামে কর্মরত রয়েছেন বলে জানান। রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত সংশ্লিষ্ট দুদক ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের এনআইডি প্রজেক্টে টেকনিক্যাল এঙপার্ট হিসেবে কর্মরত আছেন শাহনুর। তিনি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানাধীন বড়উঠান গ্রামের আবদুস ছবুরের ছেলে। শাহনুররা তিন ভাই, তিন বোন। তার আরেক ভাই শাহজামাল চট্টগ্রাম ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত। পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর তাসলিমা আকতার সমস্যাযুক্ত পরিচয়পত্রধারী সংগ্রহ করতেন। বাঁশখালী নির্বাচন অফিসে কর্মরত শাহনুরের ভাগিনা জাহেদ হোসেন। বোয়ালখালী নির্বাচন অফিসে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত আরেক খালাতো ভাই শাহ আলম। রামু নির্বাচন অফিসে অপারেটর হিসেবে কর্মরত হিরো হচ্ছেন শাহনুরের বন্ধু। একইভাবে কঙবাজার সদর নির্বাচন অফিসে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে রয়েছে শাহনুরের আরেক খালাতো ভাই নঈম ইসলাম। নঈম রোহিঙ্গা ভোটার সংগ্রহের পাশাপাশি এনআইডি সংশোধন করার কাজও সংগ্রহ করেন। বর্তমানে এনআইডি হালনাগাদ প্রকল্পে তার আপন দুই খালাতো বোন কাজ করেন বলে জানা গেছে। সিন্ডিকেটের সকলেই ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে শাহনুরের মামা শহীদুল্লাহ ও আরেক ভাগিনা শাহেদ মাঠ পর্যায়ে সমস্যাযুক্ত এনআইডিসহ লোকজন সংগ্রহের কাজ করে শাহনুরকে সহযোগিতা করেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে শাহনুরের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে তার ভাই শাহজামাল বুধবার সন্ধ্যায় অভিযোগ সত্য নয় দাবি করে দৈনিক আজাদীকে জানান, কেউ ষড়যন্ত্র করে হয়তো তাদের নাম বলেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা ভোটার করার বিষয়ে জড়িত নই।’ মামা শহীদুল্লাহ ও ভাগিনা শাহেদের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজামাল তাদের চেনেন না বলে জানান।
তবে বৃহস্পতিবার সকালে অনুসন্ধানে শাহনুরের গ্রামের বাড়ি কর্ণফুলী থানার বড়উঠানে গেলে তারই চাচাতো ভাই সালাউদ্দিন প্রতিবেদককে বলেন, শহীদুল্লাহ হচ্ছেন শাহনুর শাহজামালের মামা সম্পর্কীয়। তবে শাহনুর ও শাহজামাল গ্রামে থাকেন না। পরিবারের সবাই শহরে থাকেন। গ্রামের নির্মাণাধীন বাড়ির নিচতলার বাসা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। গ্রামে জাতীয় পরিচয়পত্র সম্পর্কিত কোন কাজ তারা কখনো করতে দেখেননি বলে জানান সালাউদ্দিন।
অন্যদিকে দুদক ও চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ভোটার ও পাসপোর্ট জালিয়াতির বিষয়টি আলোচনায় আসার পর দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম নগরীর দুই পাসপোর্ট অফিসেও অভিযান চালায়। এসময় দুই পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে এসে রোহিঙ্গা বলে সনাক্ত প্রায় ১৫০ আবেদন সংগ্রহ করে দুদক। এগুলোর মধ্যে কিছু আবেদন এনআইডি দিয়ে এবং কিছু জন্ম নিবন্ধন দিয়ে করা হয়েছে। সবগুলো আবেদনেই জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যয়ন রয়েছে। এ রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করার পেছনে নগরীর বাবুস সালাম ট্রাভেল এজেন্সি, কর্ণফুলী ট্রাভেল এজেন্সি, বিবিরহাটের এন কে ও নুর ট্রাভেলস জড়িত বলে জানতে পেরেছে দুদক।
এদিকে টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে নিহত আলোচিত রোহিঙ্গা ডাকাত নুরু ভোটার হওয়ার সময় চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানা নির্বাচন অফিসে কর্মরত ছিলেন আবদুল লতিফ শেখ। তিনি বর্তমানে পাবনা জেলা নির্বাচন অফিসে সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে পদায়িত রয়েছেন। পাবনা জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল লতিফ শেখ বুধবার সন্ধ্যায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ডাকাত নুরুকে ভোটার করার বিষয়টি সম্পর্কে আমি জানি না। আমি এসবের সাথে জড়িত নই।’
এ ব্যাপারে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাহবুবুল আলম গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘গণমাধ্যমের একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতির বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করে দুদক চট্টগ্রাম সজেকা-২। একজন সহকারী পরিচালকের নেতৃত্বে এনফোর্সমেন্ট টিম কাজ করে রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতি চক্রের বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিতও করেছে। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে অফিস সহায়ক জয়নালকে আটকসহ তাকে আসামি করে মামলাও করে নির্বাচন কমিশন। গণমাধ্যমে জেনেছি দেড়-দুই কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করছে জয়নাল। নির্বাচন কমিশনের একজন পিয়নের এত সম্পদ হলে বড় কর্মকর্তাদের সম্পদ কত থাকতে পারে তাও অনুসন্ধানের বিষয়।’
তিনি বলেন, ‘একজন অফিস সহায়কের পক্ষে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ভোটার করে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এতে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাও জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে আমাদের অনুসন্ধান চিহ্নিত করেছে। ইতোমধ্যে আমাদের এনফোর্সমেন্ট টিম একটি প্রতিবেদন দিয়েছে।’
শাহনুর সিন্ডিকেটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শাহনুরের বিষয়টি আমাদের সামনে এসেছে। কিন্তু এবার আমরা চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অনুসন্ধান চালিয়েছি। রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতির সাথে জড়িত সবাইকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য অধিকতর অনুসন্ধান প্রয়োজন। প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধান কার্যালয় যদি অধিকতর অনুসন্ধানের অনুমতি দেয়, তাহলে আমরা সবকটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেব।’
রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতির নতুন সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাচন কমিশনের গঠিত তদন্ত টিমের প্রধান খোরশেদ আলম বুধবার সন্ধ্যায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমি আইটি সেকশন দেখি না। ওই সেকশনটি দেখার অন্য লোক আছে। ওখানে কারা কারা কাজ করে সেটাও জানি না।’ তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তদন্তের বিষয়ে আমাদের অথরিটি কথা বলবে। তদন্ত পর্যায়ে তো কারো কথা বলা যায় না।’

x