এবার বলী আরেক মিতু

বিয়ের আড়াই মাস না যেতেই যৌতুকের জন্য হত্যা, স্বামী গ্রেপ্তার

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
786

বিয়ের পর আড়াই মাস না যেতেই যৌতুকের বলী হয়েছেন শারমিন আফরোজ মিতু (২৬) নামে এক গৃহবধূ। একটি গার্মেন্টসে কর্মরত ওই গৃহবধূকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলার অভিযোগ ওঠে। পরে খুনের ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে চালাতে লাশটি এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। গত সোমবার সন্ধ্যায় পাঁচলাইশ থানাধীন নাজিরপাড়া এলাকায় ঝগড়ার এক পর্যায়ে মিতুকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ সোলেমান হোসেন লিটন নামে নিহতের স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে।
পরিবারের সদস্যরা আজাদীকে জানান, রাউজান উপজেলার উকিলপাড়ার বাসিন্দা মৃত আকতার হোসেনের মেয়ে শারমিন আফরোজা মিতু কেইপিজেড এলাকায় একটি গামেন্টসে ২৫-৩০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করতেন। তার স্বামী লিটন পেশায় রাজমিস্ত্রি। তবে মিতু চান্দগাঁও থানাধীন হাদু মাঝিপাড়ায় বাদশা মেম্বার বাড়ির নানার বাসায় থেকে বড় হয়েছেন। ওখান থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
গত ২৫ জুলাই লিটনের সঙ্গে মিতুর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে স্বামীর সঙ্গে পাঁচলাইশের নাজিরপাড়া মানিক ভিলায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। লিটন নোয়াখালী জেলার মাইজদী উপজেলার উত্তর সুর লেইদ্দা গ্রামের কামাল উদ্দিনের ছেলে। পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শাহাদাত হোসাইন গতকাল আজাদীকে বলেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে ওই গৃহবধূকে প্রহারের পাশাপাশি শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে তদন্তের মাধ্যমে জেনেছি। তার স্বামী ও শাশুড়ি মিলে এই কাজটি করেছে বলে আমাদের ধারণা।
তিনি বলেন, ওই গৃহবধূর গলায় দাগ থাকার পাশাপাশি মুখের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার আসামি হিসেবে নিহতের স্বামী লিটনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তাকে দশদিনের রিমান্ডের আবেদন করেছি।
রাতে তিনি আজাদীকে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লিটন স্বীকার করেছে, পারিবারিক বিরোধ থেকে মারধর করার এক পর্যায়ে ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে স্ত্রীকে খুন করে সে। পরে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে লোকজনকে জানানোর চেষ্টা করে। পরিদর্শক শাহাদাত বলেন, ওই গৃহবধূকে মেরে ফেলার পর তার স্বামী প্রথমে তাকে ডেল্টা হাসপাতালে আনে। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কাউকে কিছু না জানিয়ে সে একাই স্ত্রীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল নিয়ে গিয়েছিল। তা নাটক ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, লিটন নিজেকে বাঁচাতে গলায় দড়ি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করেছিল।
পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে পাঁচলাইশ থানা পুলিশের এসআই মাসুদের নেতৃত্বে একটি টিম চমেক হাসপাতালে আসে। লাশটির ধরন দেখে হত্যাকাণ্ড হিসেবে সন্দেহ হওয়ায় তার স্বামীকে বসিয়ে রাখে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। পরে তাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শীলব্রত বড়ুয়া আজাদীকে বলেন, সোমবার রাতে সোলেমান হোসেন লিটন স্বামী পরিচয়ে ওই গৃহবধূকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনে। সে এটি আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে। হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ওই গৃহবধূর মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক লিটনকে জানায়নি। ওই সময় পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়। লিটন লাশটি রেখে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
মিতুর মামা মো. ইকবাল আজাদীকে বলেন, হাসপাতালের একজন আমাদের ফোন করে মিতুর মারা যাওয়ার কথা জানায়। মিতুর স্বামীর কাছ থেকে নম্বর নিয়ে ফোন করেছিল। পরে আমরা দ্রুত হাসপাতালে যাই।
তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও শ্বাশুড়ি মিলে তাকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে আসছে। বাপের বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসার জন্য সবসময় চাপ দিত। এছাড়া প্রতি মাসে মিতুর বেতনের টাকা কেড়ে নিত। তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হতো। তিনদিন আগে যৌতুক ও বেতনের টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। মিতু ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছিল। এ সময় তাকে মারধরের কথা জানায়। কিন্তু আমরা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। বিয়ের পর থেকে একদিনের জন্যও মিতুকে তার বাপের বাড়ি আসতে দেয়া হয়নি বলে জানান তিনি।
গতকাল দুপুরে হাসপাতাল মর্গ থেকে মিতুর লাশ হাদু মাঝিপাড়ায় নানাবাড়িতে নেয়া হয়। ওই সময় স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিতুর মা পারভীন আক্তার বলেন, বিয়ের পর থেকে আমার মেয়ের কপালে সুখ নেই। মেয়ের সুখের জন্য বিয়ের সময় তার স্বামীকে অনেক কিছু দিয়েছি। এরপরও তারা আমার মেয়েকে নির্যাতন করত।
প্রতিবেশীরা জানান, ছোটবেলা থেকে মেয়েটি এখানে বড় হয়েছে। ও ভালো মেয়ে। তাকে কেন এভাবে মেরে ফেলল?
এর আগে ২০১৬ সালের ৫ জুন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে দুর্বৃত্তরা নগরীর ও আর নিজাম রোডে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে। মাহমুদার পরিবারের দাবি, বাবুলই তাঁর স্ত্রীকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন।

x