এনাফ ইজ এনাফ

জেসমিন ইসলাম

শনিবার , ১৯ মে, ২০১৮ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
29

ভারতীয় ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার একটি চ্যানেল সম্প্রতি ধর্ষণের সংবাদ পরিবেশনের শিরোনাম দিয়েছে ‘এনাফ ইজ এনাফ’। সংবাদ মাধ্যম উল্লেখ করেছে ধর্ষককে আইনের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েটিকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দায়িত্বভার গ্রহণ করা হয়েছে। একই চালচিত্র আমাদের এই দেশেও। দীর্ঘকাল থেকে নারীর প্রতি নিকৃষ্ট এই সহিংসতা বহমান রয়েছে।

আমার মায়ের পিতামহ চাঁদপুরের প্রত্যন্ত এলাকার জমিদার ছিলেন। শৈশবে মায়ের সাথে আমি সেখানে গিয়ে তাঁর পূর্ব পুরুষদের অনেক দান দক্ষিণার কথা শুনেছি, কিন্তু আরো কিছু মানবীয় সম্পর্কের গোঁজামিল শুনতাম, বুঝতাম না। মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য যখন সেখানে বেড়াতে গেলাম তখন শৈশবের না বোঝা কৌতূহল উদ্দীপক মানবীয় সম্পর্কগুলো জানতে পারলাম, ব্যথিত হলাম। জমিদারের কিছু স্বজন পরিজন দাসীদেরকে নিগ্রহ করতো, ফলশ্রুতিতে জন্মের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে যারা জন্মেছিলো তাদের মধ্যে একজনকে আমি দেখেছি। সেইসব অভিজাত পুরুষদের বিবাহিত অন্দর মহলের নারীরা লোকমুখে শুনতেন স্বামীদের অপকীর্তি। বিধাতা যুগে যুগে সাহসী মানুষ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাই জমিদারের একজন আত্মীয়া স্বামীর এই রকম নিকৃষ্ট অপকর্মের তীব্র প্রতিবাদ করে স্বামীকে ত্যাগ করে আজীবন একা ছিলেন। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় অন্দর মহলের অন্য নারীরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই সাহসী নারীকে অনেক নাজেহাল করেছিলো। উপনিবেশিক সময়ের সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থায় এই রকম অনেক ঘটনা অনেকেরই জানা রয়েছে। উত্তর উপনিবেশিক অর্থাৎ ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী তিরোধানের পর সমাজতন্ত্রের চিন্তা চেতনা, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রভাবনা এলো, কিন্তু নারীর নিগ্রহের অবস্থা তথৈবচ।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি দেশে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা, আইন, নাগরিক অধিকার, সাম্য, নাগরিকের সমন্বিতভাবে প্রতিবাদের অধিকার, অর্থাৎ শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থাই কাম্য। কিন্তু নারীর প্রতি ধর্ষণের মতো সহিংসতা ঘটেই যাচ্ছে। দেশের অবহেলিত যেসব জনপদ রয়েছে সেখানে নারীর অবস্থা আরো ভয়াবহ। ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা সামান্য পরিমাণই জেনে থাকি। আরেকটি বিষয়, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবস্থায় নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ যত বাড়ছে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ধর্ষণের সংখ্যা আরো বাড়ছে। দুঃখজনক সত্য, সার্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যেই যেমন আগেও নারীকে ধর্ষণের মত নিগ্রহ থেকে রক্ষা করতে পারেনি, এখনও একই অবস্থা। নারীর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হচ্ছে, আইনি সহায়তা একটি নারী ধর্ষিত হওয়ার পরে পায়, নারী সুরক্ষার জন্য অর্থাৎ ধর্ষকের জন্য কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থাই বলবৎ করলে নারী ধর্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। নারীবান্ধব সরকারি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপর্যস্ত নারীদেরকে নিয়ে আইনি টানাপোড়েন করে প্রতিবাদী না হলে আঁধার আরো নেমে আসতো নারীদের জীবনে। সমাজের বিশাল অবহেলিত শ্রেণির মানুষের কাছে নারী ও কন্যা শিশু মূল্যহীন। এই মূল্যহীন মানুষগুলোকে আঘাত করা যায় অনায়াসে এই রকম মানসিকতা রয়েছে কিছু দুর্বৃত্ত পুরুষের। নারীকে যে পুরুষ ধর্ষণ করে সে মানুষ নয়, মানুষরূপী পশু। আরো দুঃখজনক বিষয়টি হচ্ছে, যে নারীটি ধর্ষিত হয় সে নিজেকেই মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ ভাবতে দীর্ঘদিন লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আপনজনদের সাথেও তার এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অনেক আঁধার পেরিয়ে আলো আমরা হয়ত দেখতে পাবো, যেমন এখন নারী পুরুষ সমন্বিতভাবেই নারীর প্রতি এই ধরনের সহিংসতা প্রতিহত করতে প্রত্যয়ী হয়েছে, প্রতিহত করেছে, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

x