এত দেরিতে গান শিখে কীভাবে শিল্পী হয়ে উঠলাম জানি না – মান্না দে

সাক্ষাৎকার: চন্দন মিত্র

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ
172


প্রবোধ চন্দ্র দে যিনি মান্না দে নামেই পরিচিতি বাংলা সংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসাবে। আধুনিক বাংলা গানের জগতে সর্বস্তরের শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ও সফল সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব। দুই দশক আগে দিল্লির নামকরা সাংবাদিক চন্দন মিত্রকে নিজের সংগীত জীবন নিয়ে এই সাক্ষাৎকার দেন মান্না দে। গত ১ মে ছিল উপমহাদেশের অন্যতম সেরা এই সংগীতশিল্পীর শতবর্ষ জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তার সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেন রাফসান গালিব

কীভাবে গানকেই আপনি ধ্যান-জ্ঞান করে নিলেন?

একদম সত্য কথা বলতে, আমার কাকা কেসি দে (কৃষ্ণ চন্দ্র দে) না থাকলে আমার গান গাওয়া হতো না। তিনি ছিলেন ভারতীয় ফিল্মি গানের কিংবদন্তি শিল্পী। কাকাই আমাকে নিয়ে আসেন গানের জগতে। যৌথ পরিবারে আমরা এক ছাদের নিচে থাকতাম। বাড়িতে আমরা অনেক ভাই-বোন। কিন্তু জানি না, আমাকেই কেন গানের জন্য পছন্দ করলেন কাকা। ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করি, তখনও আমাকে কোনো ধরনের উৎসাহ দেন নাই। এর কিছুদিন পর তিনি আমাকে গানের তালিম দিতে শুরু করলেন। হায় খোদা, কী কঠোর তালিম ছিল। একেবারে টানা কয়েক বছর। গানের ব্যাপারে তিনি কোনো ধরনের ছাড় দিতেন না। নীতির ব্যাপারে ছিলেন খুব কঠোর। কাকা সবসময় বলতেন, যেটি পাওয়ার যোগ্য নও, সেটি কখনো পাওয়ার চেষ্টা করো না।

এত দেরিতে শুরু করে দুর্দান্ত একজন শিল্পী হয়ে ওঠা কীভাবে সম্ভব হলো?

কীভাবে শিল্পী হয়ে উঠলাম আমি আসলে কিছু জানি না। কাকা আমাকে যা বলেছেন, তা-ই আমি করেছি। এটি আসলে নিয়তির খেলা। আমার কাকার ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে। অনেকে জানেন না, ১৩ বছর বয়সে কাকা কিন্তু অন্ধ হয়ে যান। তারপরেই তিনি গানের জগতে খুশবু ছড়াতে শুরু করলেন। ঘরের বয়স্কদের বলতে শুনেছি, ওই ট্র্যাজেডির পরই গানের প্রতি তার মারাত্মক ঝোঁক তৈরি হল এবং দারুণ করতে লাগলেন। তার খ্যাতি দ্রুত ছড়াতে লাগল। সে সময় কলকাতার এক নামকরা জমিদার তার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পাশের ওই জমিদার বাড়ি থেকে প্রতিদিন সকাল নয়টা ঘোড়ার গাড়ি আসত কাকাকে নিয়ে যেতে। সারাদিন তিনি জমিদার বাড়িতেই রেওয়াজ করতেন এবং গান গাইতেন। একেবারে রাত নয়টায় ঘোড়া গাড়ি তাকে বাড়িতে এসে নামিয়ে দিয়ে যেত। বুঝতে পারছেন, একজন অন্ধ কিশোরের জন্য কী কঠোর জীবন ছিল সেটি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে কলকাতাতে তার সুনাম ছড়িয়ে যায়। চারিদিকে সাড়া ফেলে দিলেন। সে সময় এ-শহর ছিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বড় কেন্দ্র। কাকাকেও ফিল্মি দুনিয়া দ্রুত টেনে নিল।

সিনেমায় গাওয়া প্রথম গানের স্মৃতি আপনার মনে আছে কি?

অবশ্যই। কীভাবে সেটি ভুলি। ওটি ছিল প্রকাশ পিকচারের রামরাজ সিনেমা। মুম্বাই গেলে সংগীত পরিচালক শঙ্কর রাও আমার প্রচেষ্টা দেখে আমাকে কাছে টেনে নিলেন। হিন্দি ও মারাঠি দুই ভাষাতেই এ সিনেমা রিলিজ হয়। ফলে গানও দুই ভাষায় রেকর্ড হয়। তখন তো রেকর্ডে শুধু নায়ক-নায়িকাদের নাম থাকত। ফলে প্রথম গানের রেকর্ডে আমার নাম ছিল না।

আপনি কিন্তু গানে সুর দেওয়ার কাজ করেননি তেমন, এটি কেন?

আমি বিশ্বাস করি, ওটি আমার লাইন না। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল জানা না থাকা সত্ত্বেও কাকা অনেক গানের দারুণ সুর দিয়েছিলেন। কিন্তু গানের সুর দেওয়ার মতো কঠিন কাজ আমাকে দিয়ে হয়নি। তবে আমার সময়ে শীর্ষ সুরকারদের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। তারা গানে সুর দেওয়ার প্রতি দারুণভাবে নিবিষ্ট থাকতেন। শঙ্কর-জয় কিষানকে দেখতাম টানা দিনরাত সুর নিয়ে খেলা করতে। শচীন কত্তাতো (এসডি বর্মন) সারাক্ষণ সুরের জগতে ডুবে থাকতেন। মেলোডি সুরের প্রতি তার মারাত্মক ঘোর কাজ করতো। একসঙ্গে সুর করা আবার সেটাতে কণ্ঠ দেওয়া খুব কঠিন কাজ। হেমন্ত মুখার্জির মতো খুব কম লোকই এটি ভালোমতো পেরেছেন।

কিন্তু আমার যতদূর মনে পড়ছে, আপনি দারুণ কিছু মেলোডি সুর করেছিলেন যেমন, ‘মেরি ভি এক মমতাজ থি’, ‘শাওন কি রিমঝিম ম্যায় থিরাক থিরাক নাচে’, আবার বাংলায় ‘ললিতা ওকে আজ চলে যেতে বলো না’…

আরেহ, আপনি তো সত্যিই আমার ভক্ত। এগুলো কীভাবে মনে রেখেছেন। হ্যাঁ, সিনেমার বাইরে আমি কয়েকটি গানের সুর করেছি। মধুকর রাজস্থানির মতো কয়েক কবির কবিতা ছিল এগুলো। কিন্তু ফিল্মি গানের বাইরে তেমন কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না, খ্যাতির তাড়নাও ছিল না। বাংলাতে আমি অনেক নন-ফিল্মি গান করেছি। বাণিজ্যিক কাজের বাইরে ব্যক্তিগত প্রশান্তি থেকেই এটি আমি করতাম।

আপনি এস ডি বর্মনের নাম নিলেন কিন্তু আপনি তার ছেলে আর ডি বর্মনের সুরেও তো অনেক গান করেছেন, তার সঙ্গে গান করার আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

সে ছিল অসাধারণ সৃজনশীল ও প্রতিভাবান শিল্পী। তার জীবন যাপনে স্বপ্নে এমনকি নিঃশ্বাসেও ছিল শুধু সংগীত। সুরে দারুণ ছন্দ খেলাতে পারত সে। আমার মধ্যেও সেটা চাইতো সে। গানের মধ্যে সে যেভাবে হা-আহা-হা-আহা-হা ঢুকিয়ে দিত, দুর্দান্ত ছিল। যেভাবে সে শুরু করতো, আলাদা ঢং তৈরি করে দিয়েছিল সে। মানুষ বলে, সে ওয়েস্টার্ন মিউজিক থেকে সুর ধার করতো, সেটি আসলে সত্য নয়। অনুপ্রেরণার জায়গা থেকে সে সেগুলোকে কাজে লাগাতো। যেভাবে তার বাবাও রবীন্দ্র সংগীত এবং লোকগীতিকে ফিল্মিগানে কাজে লাগিয়েছেন।

আপনার প্রজন্মের অনেক পুরুষ সংগীতশিল্পীকে আমরা পেয়েছি। তাদের মধ্যে কাকে আপনার সবচেয়ে বেশি প্রতিভাবান মনে হয়েছে?

নিঃসন্দেহে কিশোর কুমার। সে আসলেই অসাধারণ শিল্পী ছিল। সংগীতে কিন্তু তার আনুষ্ঠানিক কোনো তালিম ছিল না। খুব বর্ণিল জীবন ছিল তার। সারাক্ষণ হাসতো, অন্যকেও হাসাতো। তবে সে অনেক পেশাদার গায়ক ছিল। অর্থকড়ির ব্যাপারে ছাড় দিত না। এমনও শুনেছি, অগ্রিম সম্মানী না দেওয়ায় রেকর্ডের মাঝপথে গান ছেড়ে চলে এসেছিল সে। আবদুল নামে তার এক ড্রাইভার ছিল। তার সঙ্গে কিশোরের অন্যরকম সম্পর্ক ছিল। কিশোরের রেকর্ডিংয়ের সময় স্টুডিওর পার্টিশানের ওপারে থাকতো আবদুল। আবদুলের ইশারায় কিশোরের গানের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যেত। গান গাওয়া শুরু করলে আবদুলের ইশারার দিকে তাকাতো সে। তার ইশারা যদি ইতিবাচক হয় তাহলে কিশোর গাইতো। নয়তো মাঝপথেই থামিয়ে দিত। সে ছিল আসলে বিস্ময়কর একজন শিল্পী। শোলে সিনেমায় ইয়ে দোস্তি গানে তার সঙ্গে আমি যখন গলা মেলাতাম, আমি সুর হারিয়ে ফেলতাম। সে এমন সম্মোহিত করে ফেলতো।

সে সময়ের অন্যান্য গায়কদের সামর্থ্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

তালাত মাহমুদের সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। সে অভিনেতা হতে গিয়ে আসলে তার গানের প্রতিভাকে নষ্ট করেছে। আমার মতে, কিশোর ছিল সবচেয়ে সেরা। এরপরে মোহাম্মদ রফি এবং হেমন্ত। এদের মধ্যে কিশোর আর হেমন্তের ছিল খোদাপ্রদত্ত গলা। আর রফি হচ্ছে তালিম আর গলার সামঞ্জস্য। সত্যি বলতে আমি তাদের মতো ছিলাম না। আমার গলা ছিল পুরোটাই রেওয়াজের ফসল। আমার বলতে কোনো দ্বিধা নেই, তারা ছিল আমার থেকেও প্রতিভাবান।

আপনি বিভিন্ন ভাষায় গান করেছেন। এর জন্য কি বিশেষ কোনো প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?

অবশ্যই। কাওয়ালি এবং গজল গাওয়ার আগে আমি উর্দু এবং ফার্সি শিখেছিলাম ভালমতো। বেশিরভাগ কাওয়ালিই গেয়েছি আমি সিনেমাতে। যদিও অধিকাংশ মানুষ মনে রেখেছে ‘বারাসাত কি রাত’ সিনেমার ‘না তোহ কারভান কি তালাশ হ্যায়’। আমি মীর তকি আর মির্জা গালিবের মারাত্মক ভক্ত ছিলাম। তাদের অনেক গজল আমার মুখস্ত ছিল। খুব সহজভাবে কঠিন সব চিন্তাকে তারা গজলের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বাঙালি সুরকার পেয়েছিলাম আমি, যাদের মাধ্যমে এসব গজলকে বাংলা ভাষাতে করা সম্ভব হয়েছিল।

লতা মুঙ্গেশকরের সঙ্গে অনেক রোমান্টিক গানে ডুয়েট করেছেন আপনি। তার ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কি?

তিনি দুর্দান্ত একজন শিল্পী। তার সঙ্গে ডুয়েট করতে আমার কোনো ধরনের ঝামেলা হতো না। আমি যখন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, সে তখন একেবারে বাচ্চা। যতদূর মনে পড়ছে, অনিল বিশ্বাসের জন্য বম্বে টকিজে একটি রেকর্ডিং করতে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম, লম্বা বেণী করা ছোট কালোমত একটি মেয়ে বেঞ্চে বসে আছে। অনিল দা বলল, সে দীননাথ মুঙ্গেশকারের মেয়ে। তখন লতাকে একটা গান শোনাতে বলল অনিলদা। সঙ্গে সঙ্গে লতা দারুণ কিছু ক্ল্যাসিকাল গান শোনাল। তার কণ্ঠ সত্যিকার অর্থেই ছিল মধুমিশ্রিত। আমি তখন অনিলদাকে বললাম, এ মেয়ে বিস্ময়কর। পরে তো ফিল্মি দুনিয়ায় নানা প্রতিকূলতার মধ্যে সে মারাত্মক লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যার কারণে ফিল্মি গানে লতার একচ্ছত্র বিস্তার নিয়ে যখন কেউ কটূ মন্তব্য করে আমি রেগে যাই। তার বোন আশা ভোশলেও, একই ধরনের প্রতিভাবান শিল্পী। নিজেদের জায়গা তৈরি করতে অমানষিক পরিশ্রম করেছে তারা।

অনেকেই বলে থাকে, দারুণ প্রতিভাবান শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও ফিল্মি দুনিয়ায় সে পরিমাণ মূল্যায়ন পাননি আপনি।

ব্যাপারটা আমার আসলে সয়ে গিয়েছিল। তবে নায়কের জন্য গান রেকর্ডিংয়ে আমাকে যখন উপেক্ষা করা হতো, তখন বিষয়টা আমাকে আহত করতো। নওশাদ সাহেবদের মতো কিছু সংগীত পরিচালক আমাকে কখনোই ব্যবহার করেননি। তারা সবসময় নির্ভর করতেন মোহাম্মদ রফির ওপর। ফলে পর্দায় দিলীপ কুমারের জন্য আমার কখনো গান গাওয়া হয়নি। তবে কিছুক্ষেত্রে খোদা আমার পক্ষে ছিল। যেমন, ভারত ভূষণ ৫০ এর দশকে মুম্বাইয়ের বড় নায়ক ছিল। তার বাইজু বাওরা ছিল খুব হিট ছবি। তার বড় ভাই শশী ভূষণ বসন্ত বাহার ছবি প্রযোজনা করবেন, এর সংগীত পরিচালনার জন্য নিলেন শঙ্কর-জয়কিষানকে। শঙ্কর তো তখন নামকরা সুরকার। ক্ল্যাসিকাল সুরের বা দ্রুতলয়ের গানের জন্য তিনি আমাকে বেছে নিতেন। ‘সুর না সাজে’ গানের অসাধারণ সুর করলেন তারা। রিহার্সেলও শেষ। আমরাও তখন রেকর্ডিংয়ে যাব। এমন সময় শশিভূষণ এসে শুনলেন আমি গান গাইছি তখন তিনি বললেন, এ পারবে না, রফিকে নাও। শঙ্কর তাকে অনেক বুঝালেন কিন্তু তিনি মানছিলেন না। আমার তখন মারাত্মক অপমানিত লাগছিল। পরে তাদের মধ্যে অনেক তর্ক হলো। শেষমেশ শশীভূষণ রাজি হলেন, মান্নাই গাইবে। পরে তো এই গান চরম হিট করলো। এখনো মঞ্চে গাইতে উঠলে সেই সেটি গাওয়ার অনুরোধ আসে।

x