এত গরিব কেন আমরা!

মূল: হুয়ান রালফো

ভাবানুবাদ: মাহমুদ হাসান

মঙ্গলবার , ১ অক্টোবর, ২০১৯ at ১২:২৩ অপরাহ্ণ
66

সবকিছু এখন আস্তে আস্তে খারাপের দিকে যাইতেছে। গত সপ্তায় মিনু চাচি মরলো, আর এই শনিবার মাত্র যখন উনারে কবর দিয়া আসলাম, তখন থেইকা শুরু হইলো এই ঝড়বৃষ্টি। বাপজানের মন তখন থেইকা খারাপ। বাইরে শুকাইতে দেওয়া সমস্ত ধান এখন এই আকাইম্মা বৃষ্টিতে ভিজতে থাকবে। আর আমরা বারান্দার নিচে বইসা এইসব পাকা ধানের পইচা যাওয়া দেখতে থাকব। এদিকে আমার বইনের সাধের গাভীটাও ভাইসা গেল পানিতে গত রাইতে। বারো বৎসর বয়স হইলো আমার বইনের গতকাইল।
তিনদিন আগের মাঝ রাইত থেকা নদীর এই বার বাড়ন্ত। মনে হইতেছিলো নদীর শব্দে বাড়ির ছাদ ভাইঙ্গা পড়বে । ঘুম ভাঙলে ভুল ভাঙে। ডাকু নদীর নেশা ধরা গর্জন আমারে আবার ঘুমের দিকে ডাকে। সকালে উইঠা দেখি আসমান কালা হইয়া আছে , সারারাত ধইরা নিশ্চয় বৃষ্টি পড়ছে! নদীর আওয়াজ ধীরে আসে কাছে , বন্যার গন্ধ আলগোছে নাকে লাগে, একটা পচা বাসি ময়লা মত গন্ধ, যন্ত্রণা হইয়া বইসা থাকে পাশে।
দুপুরে বন্যা দেখতে গিয়া দেখি নদী এর মধ্যেই কূল ভাসাইছে, পাশের রাস্তাটা পার হইয়া করিমন বিবির বাড়ি ভাসাইছে। বন্যার পানি করিমনের মুরগির খোঁয়াড়ে ঢুকে আরে বাইর হয়। মুরগিগুলার লইগা হয়তো করিমনের প্রাণ কান্দে তাই শুকনা রাস্তায় গিয়া একটা একটা কইরা ছাইড়া দেয়। নদীর ওপারে গিয়া দেখি মিনু চাচীর বাড়ির তেঁতুল গাছটাও ভাইসা গ্যাছে। এতো বড় গাছ ! লোকজন ভাবে এই বারের মত বন্যা গত কয়েক বছরে হয় নাই।
বিকালে বইনরে নিয়া গেলাম আবার নদীটারে দেখতে। কালা, ঘোলা ময়লা পানি, ব্রিজটারেও ভাসাইছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধইরা আমরা বন্যার এইসব কীর্তিকলাপ দেখি কোন ক্লান্তি ছাড়া। বইনরে কই চল তো, শুইনা আসি লোকজন কি কইতাছে বন্যা নিয়া! নদীর তর্জন গর্জনে মাইনষের কথা ঢাইকা যায়, লোকজন বিড়বিড় কইরা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করে। এইখানেই খবর পাই বইনের গাভীটা নদীর পানিতে ভাইসা গ্যাছে। আমার ছোট বইন, কুলছুম, গাভীটারে আদর কইরা নাম রাখছিলো পারুল। বানের পানিতে ভাইসা যাওয়া পারুলরে ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে ওর সাদা আর লাল রঙের দুইটা কান ছিল, ওর খুব সুন্দর দুইটা চোখ ছিল..
পারুল যে কেন এই মাতাল নদী পার হইতে চাইলো ! এতটা তো বেকুব ছিল না ও! খুব শান্ত ভাল টাইপ ছিলো বরং। গোয়াল খুললেই দেখতাম দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া ঘুমাইতেছে। ঘুমের মইদ্দে হাঁটার অভ্যাস ছিল বেটিটার। এই অভ্যাসটাই হয়তো শেষ পর্যন্ত পারুলরে খাইছে। হঠাৎ ঘুম ভাইঙ্গা হয়তো দেখছিলো ওই বুক সমান পানি। ভড়কায়া গেছিলো হয়তো খুব! বানের পানি যখন ভাসাইয়া নিয়া দেগল গাভীটারে, হয়তো চিল্লায়া ডাকতেছিল আমার বইনটারে। কুলছুম সেইটা টের পায় নাই, হয়তো টের পাইছিলো আল্লায় । গরু ভাইসা যাইতে দেখছে এমন এক জনেরে জিগাইলাম , লগে কি একটা বাছুরও ভাইসা গেছিলো? নাহ , দেখলাম তো শুধু একটা গরু চাইর পা তুইলা ভাইসা যাইতেছে! এরা ব্যস্ত মানুষ, লাকড়ি কুড়াইতেছে , এদের কী এতকিছু দেখার সময় আছে! বাছুরটাও ভাইসা গেল কীনা কে জানে।
আমার বইনের এখন কী হবে আল্লায় জানে। বাপে অমানুষিক খাইটা গাভীটারে বাছুর অবস্থায় কিনছিল। কুলছুম অন্তত গরুর দুধ বেইচা বাঁচতে পারবে , তার বাকি দুই বোনের মত বেশ্যাগিরির দিকে যাবে না। বাপের আফসোস বড় বইন দুইটা নষ্ট হইছে আমরা শুধু এত গরিব বইলা। ছোটবেলা থেকেই অবশ্য দুই বোনের মতিগতির ঠিক ছিলো না। সব আজেবাজে পোলাপাইনের সাথে মিশা খুব তাড়াতাড়ি খারাপ হই গেছিলো। মাঝরাতে পোলাপাইন কেন শীস দিয়া ঘোরাঘুরি করে খুব ভাল কইরাই এরা বুইঝা গেছিলো। ভোরের আগে বাড়ি ফিরতো না। পানি আনতে কইয়া বাইর হইলে দেদখা যাইতো গোয়াল ঘরে গিয়া কার তার সাথে চোদাচুদি করতেছে।
বাপে একদিন আর না পাইরা দুইটারেই বাইর কইরা দিলো। আর কত! অনেক তো করছে। এখন শুনি গঞ্জের কোন এক বাজারে থাকে। বেশ্যাগিরি করে। বাপজান এই কারণেই ভয়ে দিশাহারা, কুলছুম না জানি আবার দুই বইনের মতো হইয়া দাঁড়ায়! গাভীটা থাকলে কুলছুমের একটু ভরসা থাকতো, একটু ভালভাবে বাঁচতে পারতো, হয়তো একটা ভাল মানুষ বিয়া করার স্বপ্ন দেদখতো।
গরুটা হারাইয়া তো এখন মহা বিপদ ! এমন সহায় সম্বলহীন কুলছুমরে কে বিয়া করবে এখন ! এখন শুধু একটাই ভরসা, বাছুরটা হয়তো বাঁইচা আছে এখনো। মায়ের পিছ পিছ হয়তো যায় নাই। আর যদি যায় তাইলে কুলছুমের আর রক্ষা নাই। এই বেশ্যাগিরি কইরাই খাইতে হবে। মা মনে হয় এইটা আর নিতে পারবে না। আল্লায় কেন এমন শাস্তি দিলো এইরকম দুইটা মাইয়া দিয়া! মা কান্দে আর ভাবে। আমাগো বংশে তো এইরকম কেউ ছিল না আগে ! সবাই আল্লা খোদার নাম নিত, মাইনষেরে সমীহ করতো। আমার মাইয়া দুইটা যে কোত্থেকে এইসব পাইলো! মা কপাল চাপড়ায় আর ভাবে। কী এমন পাপ করছিলো যে, এমন দুইটা মাইয়ার মা হইতে হইলো! মা খালি কান্দে আর আল্লারে ডাকে। কয়, আল্লা তুমি রহম করো, আমার মাইয়া দুইটারে তুমি একটু রহম করো।
বাপে কয় এগুলা ভাইবা আর লাভ নাই। এখন কুলছুমরে কেমনে মানুষ করবা সেইটা ভাবো। এখনই মাইয়ার বুক বড় হওয়া শুরু করছে আর এগুলা দেখায়ও তোমার দুই মাইয়ার মত। কোথাও বাইর হইলেই লোকজন এখন কুনজর দেদয়া শুরু করবো। কুলছুমেরও একই অবস্থা হইবে ওর দুই বোনের মত। এইটাও নষ্ট হইবো এগো মতো।
তো কুলছুম কি আর করবে এখন কান্দন ছাড়া ! পারুল ভাইসা যাবার পর দেথকা বইনের আর কান্দন থামে না। আমি আর কি করুম তার পাশে বইসা থাকা ছাড়া ! আমার বইনের দেগালাপি জামা, আমার বইনের এক দৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকাইয়া থাকা, আমার বইনের গাল বাইয়া দেনানা পানি পড়া, আমার বইনের দেছাট্ট বুক দুইটার ধুপধাপ উঠানামা করা, আমার আর কি করার আছে এইগুলা দেখা ছাড়া!
আমার বইনের ভিতরে একটা নদী তৈরি হয় এখন, ওই নদী গুমরাইয়া উঠে দুইকূল ভাঙার, আমার বইনের সামনে তার সর্বনাশের শেষ প্রস্তাব তৈরি হয় ,আমি তারে জড়াইয়া ধরি , ভিতর থেইকা দুই কুল ভাঙার মতো আওয়াজ শুনি। আমার বইনের মুখ থেকে ঘোলা পানি মুইছা দেই আর কীইবা করার আছে আমার আর এইগুলা ছাড়া !
(“Because We Are So Poor” এর ভাবানুবাদ)

হুয়ান রালফো ( ১৯১৭-১৯৮৬ ) মেক্সিকান উপন্যাসিক, ছোট গল্পের লেখক এবং ফটোগ্রাফার। মাত্র একটা উপন্যাস আর এত ছোট গল্পের সংগ্রহ আছে উনার এবং দুইটা বইকেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস আর গল্প সমগ্রের মধ্যে অন্যতম ধরা হয়।

x