‘এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে’

রীতা দত্ত

শুক্রবার , ১০ মে, ২০১৯ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ
49

স্কুল জীবনে বৈশাখ মাস এলেই শুনতাম ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে স্কুলে। রিহার্সেল ঘরে চলতো মহড়া। কানে আসত “ওই মহামানব আসে।দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে। মর্তধুলির ঘাসে ঘাসে”, হে নতুন দেখা দিক আর বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ”, ওরে নতুন যুগের ভোরে দিসনে সময় কাটিয়ে বৃথা, সময় বিচার করে।” এ গান শুনতে শুনতে চলে আসত ২৫ বৈশাখ। অনুষ্ঠান মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হতো। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, নাচ, গান পরিবেশিত হতো অত্যন্ত মযার্দার সাথে যাতে শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রনাথকে তাদের অন্তরের ধারণ করতে পারে। প্রতিবছর আমাদের স্কুলে বার্ষিক অনুষ্ঠানে মঞ্চস্থ হতো রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য বাল্মিকী প্রতিভা, শ্যামা, চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, মায়ার খেলা ইত্যাদি নৃত্যনাট্য। এইগুলো দেখে দেখে, শুনে শুনে আমরা প্রবেশ করেছিলাম রবীন্দ্র বলয়ে। মনে আছে রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ কবিতা “আষাঢ়’। এই কবিতায় রাখাল বালক আর তার ধেনুকে পরম মমতায় কবি ফুটিয়ে তুলেছেন “ঐ ডাকে শোনো, ধেনু ঘন ঘন, ধবলীরে আনে গোহালে, এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে। দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ দেখি মাঠে গেছে যারা তারা ফিরেছে কি, রাখাল বালক কে জানে কোথায় সারাদিন আজ খোয়ালে, এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে।” ছোট্ট জোনাকীও তাঁর দৃষ্টিতে অসাধারণ। তিনি লিখছেন, “ও জোনাকী কী সুখে ঐ ডানা দুটি মেলেছ….. তুমি আপন জীবন পূর্ণ করে আপন আলো জ্বেলেছ…. তোমার অন্তরে যে শক্তি আছে তারই আদেশ পেলেছ।” ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় বাংলার অপরূপ মাধুর্য প্রকাশ করেছেন। কবি লিখছেন, নমো নমো, সুন্দরী মম, জননী বঙ্গভূমি! গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি।” এই সবের কোন ইতি করা যায় না। দিনের শুরুতে প্রার্থনায় রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে আশ্রয় খুঁজি। “অন্তর মম বিকশিত করো অন্তর তর হে, নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে”। অধীর আগ্রহে এখনো পড়ছি তাঁর সাহিত্য কর্ম এবং শুনছি তাঁর অসাধাণ গান।
সৃজনশীল ব্যক্তি হিসাবে তিনি কেবল শিল্পের প্রয়োজনে তাঁর কর্মমুখীনতা নির্মাণ করেননি, বরং সৃষ্টি করেছেন বেঁচে উঠার শিল্প, বিকশিত হবার শিল্প। তাঁর অনুদিত ইংরেজী গীতাঞ্জলি ভেঙ্গে দিয়েছে বাঙালির প্রাদেশিকতার সীমানা। বাইরের পৃথিবী এ প্রথম জানল বাঙালি নামক এক সৃজনশীল জাতি আছে, বাংলা বলতে একটি ভাষা আছে, আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামের এক প্রতিভাধর কবি। মননশীলতার এমন কোন দিক নেই যেখানে রবি প্রতিভার স্ফুরন ঘটেনি। অজস্র কবিতা, গান, ছোট গল্প, উপন্যাস, পত্রাবলী, নাটক, প্রবন্ধ, ছবি আঁকা-কোন দিকে নেই তিনি!
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ। তিনি “গজদন্ত মিনারের” কবি ছিলেন না । নিরন্তর কাব্য সাধনা ও সৌন্দর্য সুধা পান করে তিনি দিন কাটান নি। তাঁর বিপুল পরিমাণ রচনা ও সৃষ্টিকর্মের মধ্যেও দেশের তথ্য সারা বিশ্বের মানুষের দুঃখ দুর্দশা ও তার যাবতীয় সমস্যাবলী নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করেছেন, এত কথা বলেছেন যে ভাবলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। তাঁর স্বদেশ ও বিশ্ব ভাবনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাধারণ মানুষ। দেশের নিরন্ন গরীব চাষী ও শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ কষ্ট, শোষণ, অত্যাচারের প্রতিবাদ সারাজীবন তঁাঁর কন্ঠে যে ভাবে ধ্বনিত হয়েছে তার তুলনা নেই। মানুষই ছিল তার আরাধ্য দেবতা। মানুষই তাঁর তীর্থ। তিনি ছিলেন গভীর মানবতাবোধে তাড়িত, কোন গন্ডিবদ্ধ ধর্ম দিয়ে প্রতারিত নন। রবীন্দ্রনাথ আজীবন মানুষকে ধর্মীয় রঙে রঞ্জিত করে দেখেন নি। কোলকাতায় একবার হিন্দু মুসলমানদের দাঙ্গা হয়েছিল। সে সময় কবি জোড়াসাঁকোতে ছিলেন। ভীতসন্ত্রস্ত মুসলমানরা তাঁর বাড়িতে প্রাণভয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। সে সময় গভীর মনোকষ্টে কবি লিখেছিলেন, “এই মোহমুগ্ধ ধর্ম বিভীষিকার চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো।” কবিতায় তিনি লিখেছেন, “হে ধর্মরাজ, ধর্মের বিকাশ নাশি, ধর্ম মূঢ়জনে বাঁচাও আসি।” সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষ তিনি প্রকাশ করেছেন এভাবে, “মানুষ খাটো হয় তখন যখন সে অন্যের সাথে মিলিত হতে পারে না। পরস্পর মিলিয়া যে মানুষ, সে মানুষই পুরো মানুষ। একলা মানুষ টুকরো মাত্র”। তিনি পেয়েছিলেন মানব ধর্মের নির্যাস।
সমাজের পতিত মানুষগুলির জন্য ছিল তাঁর গভীর মমতা। জমিদারী কাজে দীর্ঘদিন তিনি পদ্মার পাড়ের মানুষের জীবন যাত্রা, তাদের দুঃখ কষ্ট দারিদ্র্য অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছিলেন। গ্রামীন বিশ্বে এই তাঁর প্রথম দ্বারোদ্‌ঘাটন। বলা হয়ে থাকে এ সময় থেকে তাঁর মধ্যে গভীর মানবিক অনুভূতি জেগেছিল। তিনি এক সময় লেখেন, জমিদারী ব্যবসা করি, নিজের আয় ব্যয়ের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত, কেবল বণিকবৃত্তি নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। এ নিতান্ত লজ্জার কথা। আমার এই দরিদ্র চাষী প্রজাগুলোকে দেখলে ভারি মায়া হয়। এরা যেন বিধাতার শিশু সন্তানের মত নিরুপায়-এদের মুখে নিজের হাতে কিছু তুলে না দিলে এদের আর গতি নেই। তিনি বলতেন, আমার পেশা জমিদারী, কিন্তু নেশা আসমানদারী। শিলাইদহ বাসকালে পল্লী জনগণের চাষের কাজের সুবিধার জন্য অল্প সুদের বিনিময়ে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে গ্রামীন ব্যাংকের পরিকল্পনা করেন। জানা যায় তিনি নোবেল পুরস্কারের অর্থ পাতিসরে গ্রামীন ব্যাংক এবং সমবায় সমিতির জন্য ব্যয় করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ধনীর ধন দিয়ে গরীবের অভাব মেটানো যায় না। প্রয়োজন অর্থ উপার্জনের পথ তৈরী করা। আর তার জন্য দরকার একতা ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি।
সমাজসচেতক কবি দেশে বিদেশে যে কোন ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালা হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ইংরেজ সরকারের দেওয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। হিজলী বন্দি শিবিরে গুলি চালানোর প্রতিবাদে যে সভা অনুষ্ঠিত হয় সে সভার তিনি তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করেন এবং তিনি প্রতিবাদ কমিটির আহবায়ক ছিলেন।সরাসরি রাজনীতিতে না জড়ালেও তিনি দেশীয় সম্যাসার প্রতি উদাসীন ছিলেন না। লর্ড কার্জন এর বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এ প্রেক্ষিতে দেশের মানুষকে উদ্দীপিত করার জন্য কবি লিখলেন,‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল,পুণ্য হউক,পুণ্য হউক হে ভগবান।” কিন্তু দেশপ্রেম তাঁকে সংকীর্ণ করে নি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছিলেন। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে তিনি লিখলেন,ভারতবর্ষের এই একটি জায়গায় সব বন্ধন উঠে যেতে পারে। দেশ-বিদেশের বহু মনীষার বিচরণ ক্ষেত্র এ শান্তিনিকেতন। শান্তিনিকেতনের মননশীলতা, সংস্কৃতিচর্চার মন্ত্র দিয়ে আলোকিত করার পাশাপশি ভুবনডাঙ্গার শ্রীনিকেতনের দরিদ্র মানুষদের উন্নত ধরণের চাষাবাদ ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং জামাতা নগেন্দ্রনাথকে
কৃষিবিদ্যা ও ডেইরী বিষয়ে পড়ালেখা করার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি কর্মের সেরা সৃষ্টি তাঁর গান। গান রচনায় তিনি যে আনন্দ পেতেন তা অন্য কোথাও তেমনভাবে পেতেন না। গান কেবল চিত্ত বিনোদনের উপকরণ নয়। তা আমাদের মনে সুর বেঁধে দেয়। জীবনকে এক অভাবনীয় সৌন্দর্য দান করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান সম্পর্কে বলেছেন, জীবনের আশি বছর অবধি চাষ করেছি অনেক। সব ফসলই যে মাড়াইতে জমা হবে তা বলতে পারি নে। কিছু ইঁদুর খাবে, তবুও বাকি থাকবে কিছু। যুগ বদলায়, কাল বদলায়, তার সাথে সব কিছু বদলায়। তবে সব চাইতে স্থায়ী আমার গান। এটা জোর করে বলতে পারি। বিশেষ করে বাঙালি সুখে দুঃখে আনন্দে শোকে আমার গান না গেয়ে তার উপায় নাই।” যে গভীর প্রত্যয়ে কবি এ কথা উচ্চারণ করেছিলেন তা প্রমাণিত সত্য। তাঁর গান চিত্তের সকল অবস্থায় আমাদের সঙ্গী হয়ে আছে। আমাদের আনন্দে, উৎসবে, শোকে, দেশের সংকট কালে রবীন্দ্রনাথ আমাদের আশ্রয়। মঃপুতে বসে রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, আমাকে ভুলতে পার, আমার গানকে ভুলবে কেমন করে? সত্যিই তাই। কবি বলতেন, কাজ কর্মের মাঝখানে একটা গান শুনলে আমার কাছে এক মুহূর্তে সমস্ত সংসার ভাবান্তর হয়ে যায়। এ সমস্ত চোখে দেখার রাজ্য গান শোনার মধ্য দিয়ে হঠাৎ কি নুতন অর্থ লাভ করে।” কবি লিখেছেন, “যবে কাজ করি প্রভু দেয় মোরে মান, যবে গান করি ভালবাসেন ভগবান।” সংগীত তার ভালবাসার ধন। রবীন্দ্রনাথ আমাদের রুচি তৈরি করেছেন। বাংলার নববর্ষ উদযাপন, বসন্ত উৎসব, ঋতু বন্দনা, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি বাংলার আবহমান সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। রবীন্দ্রনাথের গান এই অনুষ্ঠানগুলোকে মহিমান্বিত করেছে।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের সমগ্র সত্তায় জড়িয়ে আছেন। তিনি মিশে আছেন আমাদের গৃহগত কর্মে, চিন্তা, চেতনায়, প্রার্থনায়, আমাদের চলনে, বলনে, আবেগে, অনুষ্ঠানে। তাই তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলতে পেরেছেন, “তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি। সকল খেলায় করব খেলা এ আমি। আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।” রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে গভীর শ্রদ্ধা জানাই যিনি এত আলো জ্বালিয়েছেন আমাদের হৃদয়ের গভীরে।

x