এতো হুঁশিয়ারি, তবু পাহাড় কাটা বন্ধ হয় না কেন?

শুক্রবার , ৩ মে, ২০১৯ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
34

বৃহত্তর চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না পাহাড়খেকোদের। বেপোরোয়া ভূমিদস্যুদের থামানো যাচ্ছে না কোনো মতেই। তারা প্রকাশ্যে পাহাড় কাটছে। মাটি লুট করছে। জমি দখল করছে। গড়ে তুলছে অবৈধ বসতি। প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে।
নির্বিচারে পাহাড় কর্তনের ফলে এই অঞ্চলে প্রতিবছরই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। আর তাতে ঘটছে গণমৃত্যুর ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়িসহ এই অঞ্চলে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড় ধসে সড়ক অবকাঠামো, বসতবাড়িসহ সহায় সম্পদের ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকার। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় নিধন ঠেকানো না গেলে পরিবেশে মহাবির্পযয় নেমে আসবে। বাড়বে পাহাড় ধসে প্রাণ ও সম্পদহানির ঘটনা।
এদিকে, গত ২৭ এপ্রিল নগরীর খুলশীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণাগার পরিদর্শন শেষে কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে মতবিনিময় সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এই বলে, ‘পাহাড় কাটলে প্রভাবশালীদেরও ছাড় নেই’। তিনি বলেছেন, পাহাড় কাটা একটি সামাজিক ব্যাধি। চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার সঙ্গে যে প্রভাবশালীরাই জড়িত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অবৈধভাবে পাহাড়-টিলা কেটে পরিবেশের ক্ষতি করা চলবে না। লিজ নিয়ে পাহাড়ে অবৈধভাবে স্থাপনা করলে তাও বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসমৃদ্ধ চট্টগ্রামকে টিকিয়ে রাখতে হবে। লোভের বশে পরিবেশের যাতে বড় ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে সকলকে সজাগ থাকতে হবে। প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে পাহাড়কাটা পুরোপুরি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি উজাড়, অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, পরিকল্পিত বনায়ন না করা, রাস্তা করার ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ ও বিজ্ঞান সম্মত ড্রেন বা নিষ্কাশন ব্যবস্থা না রাখা, যত্রতত্র পাহাড় কেটে বাসস্থান নির্মাণ, আবহাওয়া বা জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার দেখা দিচ্ছে। এছাড়া অতি বৃষ্টি ও ভূমি ক্ষয়ের কারণে পলি জমে প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্ট ছড়া, নালা, খাল-নদী ভরাট হওয়ার প্রেক্ষিতে পানি নিষ্কাশন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা না থাকা, বেলে প্রকৃতির পাহাড়ে বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকায় দীর্ঘ সময় একটানা অতি বৃষ্টির ফলে পানি ভিতরে প্রবেশ করার কারণে ন্যাড়া পাহাড়ের স্থিতিস্থাপকতা-স্থিতিশীলতা যেমন একদিকে বিনষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে সহজেই পাহাড়গুলো ভঙ্গুর হচ্ছে।
বাংলাদেশের পাহাড়গুলোতে কোনো কঠিন শিলা নেই। তাই বৃষ্টির কারণে এ ধরনের মাটি পানি শুষে ফুলতে থাকে। তাছাড়া কঠিন শিলা না থাকায় মাটিগুলো নরম ও পিচ্ছিল হয়ে যায়। ফলে ভারি বর্ষণের সাথে সাথে মাটি ভেঙে পড়ে। তাছাড়া যাঁরা পাহাড়ে থাকেন তাঁরা ঘর নির্মাণের জন্য পাহাড়ের সবচেয়ে শক্ত মাটির স্তরও কেটে ফেলেন। এতে পাহাড় ধসের শঙ্কা আরও তীব্র হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে পাহাড় ধসে প্রাণহানিকে আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত এবং রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন একজন বিশেষজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল এবং পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম পাহাড় ধসের কারণ নির্ণয় বিষয়ক সম্প্রতি গঠিত কারিগরি কমিটির একজন সদস্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে। এক সাক্ষাতকারে তিনি পাহাড় ধসের কারণ হিসেবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়গুলো বালুময় পাহাড় এবং এসব পাহাড়ের ভেতরে অনেক ফাটল থাকায় অতিবৃষ্টির ফলে প্রাকৃতিকভাবেই ‘পাহাড়ের ফাটলে পানি ঢুকে ধস হতে পারে’। তাই পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। তবে
তার জন্য পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে হবে। শুধু পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থলে সরে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের নির্দেশ জারি করলেই চলবে না। এ জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন ব্যবস্থা জরুরি। মনে রাখতে হবে, পাহাড় ঘিরে যদি অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা না যায়, তাহলে পাহাড় কাটা কোনো দিন বন্ধ করা যাবে না।
আমরা সব সময় মন্ত্রী ও জেলা প্রশাসনের হুঁশিয়ারি শুনি, কিন্তু তার বাস্তবায়ন দেখি না। এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি নেই, পাহাড় কাটার কারণে যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ‘পাহাড় কাটা যাবে না’, ‘পাহাড় কাটতে দেব না’ বলে বলে পাহাড় কেটে সাফ করা হচ্ছে, কোনো ব্যবস্থা নেই। এখন আর কথা নয়, শক্তিশালী একটি কমিটি গঠন করতে হবে, যার সদস্যরা কোনোভাবেই প্রভাবিত হবেন না। তাঁরা চিহ্নিত করবেন পালের গোদাকে এবং ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেবেন। পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হলে প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে।

x