এডিস ও ভিআইপি বিস্ফোরণ

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
14

জাতীয় শোকের মাস আগস্ট। বাঙালিকে স্বাধীনতা এনে দেয়া সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনা শুধু নয়। আরো কয়েকটি দুনিয়া কাঁপানো খুন ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে এমাসে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী বঙ্গবন্ধু অ্যাভেন্যূর সমাবেশে গ্রেনেড ও গুলিবৃষ্টি, ২০০৫ এর ১৭ আগস্টে দেশব্যাপী ৬৪ জেলায় একযোগে তথাকথিত বাংলাভাই ও শায়খ রহমান নেতৃত্বাধীন জেএমবি জঙ্গি গোষ্ঠীর বোমা হামলার সাক্ষীও আগস্ট মাস।
্তু৭৫ এর ১৫ আগস্ট সর্বকালের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন পুরো জাতিকে অন্ধকারের ভয়াল বিভীষিকার আবর্তে টেনে নামানো হয়। যার ক্ষত কোনোকালেই মুছবেনা। অন্ধকারের গর্ভে জন্ম নেয়া বিএনপি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর স্বাধীনতার চরম দুশমন জামাতের জোট সরকার ক্ষমতায় থাকতে ঘটে বাকি দুই বর্বরতম খুন ও দেশব্যাপী একযোগে বোমা হামলার ঘটনা। ২১ আগস্ট সরকারি এজেন্সির সহযোগিতায় পরিচালিত ভয়াল গ্রেনেড হামলায় বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও দলের অন্যতম শীর্ষ নেত্রী আইভি রহমানসহ মারা যান ২৪ নেতাকর্মী। আহতের সংখ্যা অগুনতি। এখনো গ্রেনেড স্প্লিন্টার শরীরে নিয়ে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন বহু নেতাকর্মী। তাই আগস্ট মানেই বাঙালি জাতি ও দেশের জন্য ভয়াল এক মাস। এরমাঝে জাতীয় পর্যায়ে শোকের নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে ১ আগস্ট থেকে।
অপ্রিয় সত্য আড়ালের উপায় নেই, টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় দলটি অনেক বেশি মেদবহুল হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন গণমুখী আওয়ামী লীগের ব্রত ও গতি থমকে গেছে। পুরো দল এবং সরকার জননেত্রী শেখ হাসিনা নির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে নানা বিরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগছে দেশবাসী। সারা বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে তুলে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু উন্নয়নের সাথে তাল রেখে দেশ পরিচালনার জন্য একটি চৌকস, দক্ষ, নিবেদিত দেশপ্রেমিক টিম এখনো দেশে গড়ে ওঠেনি। বারবার কোথায় যেন তাল কেটে যাচ্ছে। সরকারকে ব্যাকআপ বা ফিডব্যাক সহায়তা দেয়ার মত যোগ্য দলীয় নেতৃত্বও কেন জানি গড়ে উঠছে না! অপ্রিয় হলেও জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অভিযাত্রার মহাসড়কে আরো দ্রুত এগিয়ে যেতে বিষয়টাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার সময় এসেছে।
প্রসঙ্গক্রমে পূর্ব ইউরোপীয় দেশ রুমানিয়ার একটা উদাহরণ টানা যায়। ক্থদিন আগে দেশটিতে একজন ১৪ বছরের কিশোরি অপহরণ ও খুনের ঘটনা ঘটে। অপহরণের কয়েকদিন পরও পুলিশ আলেকজান্দ্রা ম্যাকাসানু নামের কিশোরিকে উদ্ধারে ব্যার্থ হওয়ায় পুরো দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাজধানী বুখারেস্টে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। পরে কিশোরীর লাশের হাড়গোড় মিলে একটি পরিত্যক্ত গ্যারেজে। ডিএনএ পরিক্ষার পর লাশ সনাক্ত হয়। অপহরণকারী খুনীও দ্রুত আটক হয়। পুরো দেশে তোলপাড় তোলা ঘটনাটি থিতু হওয়ার আগে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাই মোগার একটি ছোট্ট মন্তব্য তাঁকে গদি ছাড়তে বাধ্য করে। প্রধানমন্ত্রী ভিউরিকা ভেনশিলার নির্দেশে মাত্র এক সপ্তাহ আগে বসা মন্ত্রীর চেয়ার ছাড়তে হয় মোগাকে। আটক ৬৫ বছরের খুনী কিশোরিকে একলা পেয়ে রাস্তা থেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে এই ববর্রতা ঘটায়। এর আগেও লোকটি আরেক তরুনীকে একই কায়দায় যৌণ নিপীড়নের পর খুন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোগার নির্দোষ মন্তব্য ছিল, অজানা-অচেনা কারো গাড়িতে এভাবে উঠা উচিত হয়নি আলেকজান্দ্রার। আমাদের দেশের বিবেচনায় মন্তব্যটা একেবারেই সাধারণ! আর রুমানিয়ায় হলো কিনা মন্ত্রীর পতন!
আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজধানী ডেঙ্গু কবলিত হওয়ার পর বল্লেন, ্তুযেভাবে রোহিঙ্গা পপুলেশন বাড়ে আমাদের দেশে এসে, সেভাবে মসকুউটো পপুলেশন বেড়ে যাচ্ছ্থে! অপর অনুষ্ঠানে বলেন, ুপ্রতিদিন দেশে ১৫ জন দুর্ঘটনায় মারা যায়। দিনে ১০ জন সাপের কামড়ে মরে। কয়েক মাসে মাত্র ৮ জন ডেঙ্গু রোগির মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। আমরা এসব খবর রাখিনাচ! কেমন চাঁছাছোলা মন্তব্য! মশা মারার বল সিটি কর্পোরেশনের কোর্টে ঠেলে দিয়ে এরপর তিনি সপরিবারে মালয়েশিয়ায় ব্যাক্তিগত সফরে পাড়ি জমান। আবার সফর নিয়েও কতো লুকোচুরি! তাঁর জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রী মানিকগঞ্জে বন্যার্তদের ত্রাণ দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বলেন, ঢাকায় আছেন! শেষ পর্যন্ত প্রথম আলো আসল খবর ফাঁস করে দেয়ার পর চাপে পড়ে মন্ত্রী মহোদয় ৩ দিন আগেই ঢাকা ফিরতে বাধ্য হন। ডেঙ্গু ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির দিকে মোড় নেয়ার পরও তিনি কেন মালয়েশিয়া গেছেন? এক সংবাদকর্মীর এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে থামিয়ে দেন মন্ত্রী জাহিদ মালেক! রুমানিয়ার ঘটনার সাথে মিলালে এটা স্পষ্ট, দেশ উন্নতির মহাসড়কে উঠলেও মন্ত্রী, আমলাা, কামলা, নেতারা আছে জঞ্জালের ভাগাড়ে! এরা কী বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার টেকনোক্রাট! একজন যুগ্ম সচিবের জন্য তিন ঘন্টা অপেক্ষায় থাকে ফেরী! অ্যামবুলেন্সেই বাড়তি রক্তক্ষরণে মারা যায় কোমলমতি কিশোর তিতাস। ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পরও এডিশ মশা মারার উপযুক্ত ওষুধের বদলে বাড়তি কথার খই ভাজছেন দায়িত্বশীল ব্যাক্তিরা! হাসপাতাল, ক্লিনিকে ঠাঁই নেই, রোগির সংখ্যা শুধু বাড়ছেই। ডেঙ্গুর সাথে বন্যা পাল্লা টানলেও এখন একটু বিশ্রামে। কিন্তু দেশের লাখ লাখ খেটে খাওয়া মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে বন্যা। ক্ষতি কাটিয়ে উঠার মতো যোগ্য, দক্ষ নিবেদিত জনবল নিয়ে সন্দেহের দোলাচালে পুরো জাতি! এটা স্বীকার করতেই হবে, জনসংখ্যার স্ফীতি দেশের সহন ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। জনসংখ্যাকে জন সম্পদে রূপান্তরিত করার সক্ষমতা আপাতত আমাদের নেই। আরো সর্বনাশা খবর হচ্ছে, মশক, জনসংখ্যা স্ফীতির সাথে পাল্লা টেনে বাড়ছে, ভিআইপির সংখ্যা। বাড়তি জনসংখ্যা ও মশকের মত ভিআইপি যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে পুরো দেশই যে অচল হয়ে পড়বে। তাই সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে নির্দয়ভাবে ভিআইপি ছাটাই করা হোক। প্রয়োজন প্রয়োগযোগ্য কঠিন আইনও।
সবকিছু প্রধানমন্ত্রীকে কেন দেখতে হবে! রাষ্ট্রীয় তহবিলের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে সরকার ও প্রশাসনযন্ত্র কেন পোষা হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী চোখের চিকিৎসা করাতে লন্ডনে। চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই দেশের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে তাঁকে মনোযোগ দিতে হচ্ছে! কেন? এতবড় মন্ত্রীসভা, এমপি, মেয়র, নানা পদাধিকারী, প্রশাসন, এতগুলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান তাহলে কেন আছে! জাতীয় শোকের মাসে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রকমারি অনুষ্ঠান! রকমারি নতুন নতুন মানুষ, সংগঠন! কিছুর পেছনে লীগ নামের লেজুড় অথবা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সব সদস্যের নাম ঝুলছে! রকমারি ডিজিটাল পোস্টার, ব্যানার, ফেষ্টুন তোরণ! চেনা অচেনা অসংখ্য নেতা, ন্যাতা, উঠতি ন্যাতার হাস্যোজ্জ্বল ছবি! সবখানেই। প্লিজ এসব থামান। মহল্লায় মহল্লায়, পাড়ায় পাড়ায় বঙ্গবন্ধু পাঠচক্রের আয়োজন করে মেধাবী, সৎ দেশপ্রেমিক কর্মী ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলার জরুরি কর্মসূচি হাতে নেয়া হোক। রাজনীতির ক্ষয় রোধ, মেধা- মনন ও যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে এর কোনোই বিকল্প খোলা নেই।

x