এটিএম বুথ থেকে জাল নোট বেরোনো বন্ধে জালিয়াত চক্রকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে

বৃহস্পতিবার , ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৮:৩০ পূর্বাহ্ণ
121

সম্প্রতি এটিএম বুথ থেকে তোলা টাকায় গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বিল পরিশোধ করছিলেন দেশের বিশিষ্ট এক ব্যক্তি। তাঁর দেয়া ৫০০ টাকার একটি নোট সে সময় জাল হিসেবে চিহ্নিত করেন রেস্তোরাঁর ক্যাশ কর্মকর্তা। বিষয়টি নিয়ে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাঁকে। পত্রিকান্তরে ৮ সেপ্টেম্বর এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, একটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে গত মার্চে ৫০ হাজার টাকা তুলেছিলেন ফেনী শহরের বাসিন্দা হাজেরা খাতুন। পরদিন সেখান থেকে ২০ হাজার টাকা অন্য একটি ব্যাংকে জমা দিতে গেলে ১ হাজার টাকার একটি নোট জাল হিসেবে চিহ্নিত করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল হাজেরা খাতুনকে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখায় গিয়ে এটি এম বুথ থেকে জাল টাকা বের হওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি। উল্টো ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে ভর্ৎসনা শুনতে হয়েছে তাঁকে। উপায়ন্তর না দেখে অগত্যা এই জাল নোট ছিঁড়ে ফেলতে হয় তাঁকে। হাজেরা খাতুন ও হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বিল দিতে যাওয়া বিশিষ্ট জনের মতো আরো অনেকেই এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার সময় জাল নোট পাচ্ছেন। শুধু এটিএম বুথ নয়, জাল নোট পাওয়া যাচ্ছে ব্যাংক থেকে একসঙ্গে বেশি টাকা তুললেও। ‘জাল নোটের বাহকই অপরাধী’আইনের এমন বিধানের কারণে গ্রাহকরা জাল নোটসংক্রান্ত অধিকাংশ ঘটনাই হয়রানির ভয়ে চেপে যাচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার হচ্ছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ জানিয়ে ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতিকার পাচ্ছেন না।

উল্লিখিত খবর থেকে দেখা যাচ্ছে এখন এটিএম বুথেও জাল নোটের ছড়াছড়ি। আগে হাটবাজারে জাল নোটের দেখা মিললেও এখন তা ব্যাংক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এটিএম বুথে জাল নোট ঢুকিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকার, সিকিউরিটি এজেন্সির লোকসহ সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। জাল নোট তৈরি দূর অতীতেও যেমন ঘটেছে, বর্তমানেও ঘটছে। বিশ্বের কোন দেশের মুদ্রাই এ হুমকি থেকে মুক্ত নয়। বাংলাদেশে নোট জালকারীদের দৌরাত্ম্য চলছে অনেক আগে থেকেই। আইনে ফাঁকফোকরের কারণে জাল টাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ আমাদের দেশে বড় একটা নেই। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে জাল নোট সম্পর্কিত পাঁচ হাজারেরও বেশি মামলা উচ্চ আদালতসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে ঝুলে আছে। জালনোট শুধু অর্থনীতির ক্ষতি করছে না, প্রতিদিন শত শত মানুষ এ জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জাল নোট প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচারণা চালালেও পুরোনো আইনেই জাল নোট চক্রের বিচার চলছে, যা বর্তমান সময় উপযোগী নয়। বিদ্যমান আইনে বলা হয়েছে, জাল নোটের বাহকই অপরাধীআইনের এমন বিধানের কারণে গ্রাহকরা জালনোট সংক্রান্ত অধিকাংশ ঘটনাই চেপে যাচ্ছেন হয়রানির ভয়ে। এটিএম বুথ ব্যাংক সরাসরি ব্যবস্থাপনা করে বলে গ্রাহকরা নিশ্চিন্তে এখান থেকে টাকা তোলেন। লেনদেন করতে গিয়েই জাল নোট ধরা পড়ে এবং তখন আর উপায় থাকে না। এটিএমে জাল নোট না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের। এটিএমে জালনোট মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে সরাসরি দায়ি করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এটা বাংলাদেশ ব্যাংক সচরাচর করছে না। সব কিছুর আগে দরকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যারা এটিএমে টাকা ঢোকানোর দায়িত্বে থাকেন তারা জালনোট ঢুকিয়ে থাকলে তা বন্ধ করতে যথোচিত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অর্থ নেয়া থেকে এটিএমে প্রবেশ করানোর প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন এটিএম বুথে জাল নোট পাওয়া যাওয়ায় ইদানিং সবার মধ্যে আতংক ও অনিশ্চয়তা আরো বেড়ে গেছে। ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারে জালনোট পাওয়া গেলে তা বদল করা সম্ভব। এটিএম মেশিনে জাল নোট পাওয়া তা বদল করা যাচ্ছে না। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ রয়েছে এটিএম মেশিনে জাল নোট পাওয়া গেলে তা গ্রাহকদের বদলে দেয়ার। কিন্তু ব্যাংকগুলো বেশিরভাগ যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে তা বদলে দিচ্ছে না।

আমাদের দেশে জালনোট শনাক্তকরণের যন্ত্র বা মেশিন এতই কম যে, যার সুযোগ নিচ্ছে ওই অপরাধীরা। যদিও সরকারিবেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে জাল নোট চেনার সহজ উপায় সম্বলিত বাহারি পোস্টার টাঙিয়েই দায় সারা হয়। জালনোট বিস্তারকারী চক্রের লোকজনদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারলে এ প্রবণতা অনেকটা রোধ করা যেত বলে আমাদের ধারণা। জাল নোটের কারবারিদের মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও এখনও পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাল টাকার প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়েছে এবং অপরাধীদের ধরার পরও যখন কঠোর শাস্তি হচ্ছে না, তখন এ চক্র আবারও জাল নোটের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, জনগণ মিলে সচেতন ও সচেষ্ট না হলে জাল নোটের প্রবাহ রোধ করা অসম্ভব। কেবল জাল নোট চেনার বাহারি পোস্টার টাঙালে হবে না। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়াতেই হবে। অন্যথা সুফল পাওয়া যাবে না। চক্রের হোতারা যাতে কোনভাবেই পার না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিভিন্ন দেশ জাল নোট প্রতিরোধে প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশ পিছিয়ে থাকতে পারে না। অনেক উন্নত দেশে এটিএম মেশিনই জাল নোট শনাক্ত করে তা আলাদা করে রাখতে সক্ষম। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোও উন্নত মানের এ মেশিন ব্যবহার করতে পারে। এটিএমে অর্থ প্রবেশের সময় নোট সঠিকভাবে পরীক্ষার জন্য যন্ত্র রয়েছে। ব্যাংকগুলো সেটিও সঠিকভাবে ব্যবহার করছে না। আমাদের বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলে এটিএমে জাল নোটের বিস্তার রোধ করা অসম্ভব হবে না।

x