এখলাস স্যারকে নিয়ে আমার ঘোর আর কাটে না

যাদব চন্দ্র দাস

শনিবার , ১৩ অক্টোবর, ২০১৮ at ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
170

(চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে লিখিত)
১৯৬৩ সালের কথা। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ। নোবেল বিজয়ী পর্দাথবিদ প্রফেসর আবদুস সালাম ডি.আই.সি. কোর্সের ছাত্রদের বললেন, ‘দ্যাখো, আমরা তো সব ছাত্রকে নিতে পারব না, তোমরা এখন থেকে অন্যত্র পিএইচডি’র রেজিস্ট্রেশনের জন্য চেষ্টা করতে থাক।’ অতঃপর ডি.আই.সি. কোর্সের তাত্ত্বিক (থিওরি) পরীক্ষার পর এক ছাত্রকে দেখে প্রফেসর সালাম বললেন, ‘এখনো তুমি কোথাও চেষ্টা করোনি? তুমি তো জানো, আমি শুধু প্রথম স্থান অধিকারীকেই পিএইচডি-তে গাইড করব।’ ছাত্রটি তখন জানতে চাইল- থিওরি পরীক্ষার ফল প্রকাশ পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করবেন কিনা। প্রফেসর সালাম হেসে হেসে বললেন, ‘ডি.আই.সি. কোর্সে প্রথম স্থান পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়, তুমি বরং ইউনিভার্সিটি কলেজে আমার বন্ধু ড. হ্যামিলটনের কাছে যাও।’
ছাত্রটি নোবেল বিজয়ীর ওই কথা শুনে ব্যথাতুর মনে গেলেন প্রফেসর ড. হ্যামিলটনের কাছে। হাই এনার্জি ফিজিঙে ড. হ্যামিলটনের খ্যাতি তখন বিশ্বজুড়ে। ড. হ্যামিলটন সেই ছাত্রের সাক্ষাৎকার নিয়ে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে- তিনি বললেন, ‘রেজাল্ট বের হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। তুমি কাল থেকেই কাজ শুরু করো।’ যথারীতি ডি.আই.সি. কোর্সের থিওরি পরীক্ষার ফল বের হল। দেখা গেল- সেই ছাত্রটিই প্রথম হয়েছেন প্রফেসর সালাম যাকে ড. হ্যামিলটনের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তখন প্রফেসর সালাম প্রথম স্থান পাওয়া সেই ছাত্রটিকে ডেকে তাঁকে পিএইচডি-তে গাইড করবেন বলে প্রস্তুতি নিতে বললে ছাত্রটি বিনয়ের সাথে জানালেন- ‘আমি ড. হ্যামিলটন স্যারের সাথেই কাজ করব।’
সেই আত্মাভিমানী, স্পষ্টবাদী, তুখোড় মেধাবী, জেদী ছাত্রটি আর কেউ নন, তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রয়াত প্রফেসর ড. এখলাস উদ্দীন আহমদ স্যার। যার নামেই চবি’র পদার্থবিদ্যা বিভাগ পরিচিতি লাভ করেছিল। এখন স্যার বিভাগের জন্য অবশ্য স্মরণীয় একটি নাম।
প্রফেসর ড. এখলাস উদ্দীন আহমদের জন্ম ঢাকা জেলার টঙ্গী থানার দত্তপাড়া গ্রামে। ১৯৫৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে। ১৯৫৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় হয়ে। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে। ১৬৬০ সালে বি. এসসি. সম্মানে অর্জন করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান। লাভ করেন রাজা কালী নারায়ণ বৃত্তি। ১৯৬১ সালে এম.এসসি. চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষায়ও লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান। একই বছরের সেপ্টেম্বরে থিসিস জমা দিয়েই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে এসিস্ট্যান্ট টু দ্যা প্রফেসর পদে যোগদান করেন। কাজ করেন প্রফেসর ইন্নাস আলীর সহকারী হিসেবে। ১৯৬২ সালের ২৮ জানুয়ারি বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন হামিদা বানু’র সাথে। একই বছরের এপ্রিলে দু’জনেই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন আণবিক শক্তি কমিশনের লাহোর কেন্দ্রে। এই সময়ে মেধাবী গবেষক এখলাস একই সাথে তিনটি স্কলারশিপ (রয়েল ইঙিবিশন, কমনওয়েলথ ও কলম্বো স্কলারশিপ) লাভ করেন। রয়েল ইঙিবিশন স্কলারশিপ নিয়ে তিনি ডি.আই.সি কোর্সে ভর্তি হন ইম্পেরিয়াল কলেজে। সেই নোবেল বিজয়ী প্রফেসর আবদুস সালামের গ্রুপে।
১৯৬৬ সালে তিনি কলারোডোর বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ে আপার এটমোসফিয়ারিক ফিজিক্সের (বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিদ্যা) উপর একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৭ সালে উচ্চশিক্ষা পাঠ চুকিয়ে দেশে ফিরে যোগ দেন ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনে। ঢাকায় উচ্চশক্তির পদার্থবিদ্যার (হাই-এনার্জি ফিজিক্স) ক্ষেত্র নেই-এই অজুহাতে এসময় তাঁর বদলির আদেশ হয় ইসলামাবাদে। একইসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ইন্নাস আলী তাঁকে ভেবে দেখতে বলেন- আণবিক শক্তি কমিশন ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবেন কিনা। তিনি তখন সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির প্রফেসর সামশুল হক (যিনি একসময় শিক্ষাকমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন) ড. এখলাস উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান তিনি (এখলাস স্যার) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করবেন কিনা? সামশুল হক স্যারের আগ্রহ ও শিক্ষকতা পেশার প্রতি তাঁর ভালোবাসার কারণে ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে।
এর পরের ইতিহাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সংশ্লিষ্ট সকল শিক্ষক অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ সবারই জানা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের প্রথম থেকেই (তৎকালীন সদ্য প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) তিনি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবধরনের গঠনমূলক কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। ড. এখলাস স্যার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অবৈতনিক খণ্ডকালীন অধ্যক্ষও ছিলেন। স্যারের গুণমুখর ছিলেন তাঁর শিক্ষার্থীরা। ক্লাসে তাঁর উপস্থাপনা ও প্রকাশগুণে কোয়ান্টাম মেকানিক্স, তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের মতো জটিল ও কঠিন বিষয়গুলো অতি সহজ-সরল ও সাবলীল মনে হতো। তিনি যে পড়াতেন কিংবা ভালো বুঝাতেন- তাতেই তিনি ক্ষান্ত হতেন না, শিক্ষার্থীরা কতোটুকু গ্রহণ করতে পারছে- সঙ্গে-সঙ্গে তারও মূল্যায়ন করে ছাড়তেন।
বিভাগের ক্লাসে পড়াতে গিয়ে মাঝে-মাঝে তিনি হতাশ হতেন শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার দুর্বল ভিত দেখে। তিনি উপলব্ধি করতেন- গোড়া শক্ত না হলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ফলপ্রসূ শিক্ষা দান সম্ভব নয়। তাই তিনি সময় ও সুযোগ পেলেই কলেজ পরিদর্শনে চলে যেতেন এবং কলেজের লেখাপড়ার মানোন্নয়নের জন্য অনেক মূল্যবান পরামর্শ দিতেন- যা ছিলো অতুলনীয়। বহু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাঁর এই বিরলপ্রজ অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে আজও স্মরণ করেন।
১৯৭৮ সালে তিনি কানাডার এডিনবরাতে মিটিওরলজির একটি ওয়ার্কশপে যোগদান করেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববদ্যিালয়ে আবহাওয়া ইনস্টিটিউট খোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি বিভাগের সভাপতি, বিজ্ঞান অনুষদে ডিন, সিন্ডিকেট সদস্যেরও দায়িত্ব পালন করেন। চবির ফরেস্ট্রি ইনস্টিটিউট স্থাপনে তাঁর অবদান স্মরণীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম স্যারের যোগদানের পেছনেও রয়েছে ড. এখলাস স্যারের ভূমিকা। জামাল নজরুল ইসলাম স্যারের ভাষায় ‘আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে যোগদানের কথা প্রথম ভাবতে শুরু করি, তখন ড. এখলাসের কাছে এ ব্যাপারে প্রথম চিঠি লিখি, সময়টা ১৯৭৭ কি ’৭৬ হবে। তিনি (ড. এখলাস) প্রতিউত্তরে আমার কাছে একটি উৎসাহব্যঞ্জক এবং আন্তরিকতাপ্রবণ চিঠি লিখেন, যা আমার কাছে খুব ভাল লেগেছিল। ১৯৮১-’৮২ সালে আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি তখন তার সঙ্গে আমার কয়েক দফা আলোচনা হয়। আমার প্রতিবারই মনে হয়েছে ড. এখলাস একজন সৎ ও শাণিত চরিত্রের অধিকারী যার অন্তর ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণকামিকায় উন্মুখ।’ বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে যাবার জন্যে, বিজ্ঞানের সুফল সর্বস্তরের লোকের নিকট পৌঁছাবার জন্য, সকলে যাতে বিজ্ঞানচর্চায় অংশগ্রহণ করতে পারে সেজন্যে ড. এখলাস উদ্দীন আহমদ স্যারের অবদান অপরিসীম। এককথায় বিজ্ঞানকে তিনি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আজন্ম কাজ করে গেছেন। তিনি চট্টগ্রাম বিজ্ঞান পরিষদের সভাপতি ও উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করে অগণিত বিজ্ঞানুরাগীকে বিজ্ঞান চর্চায় অনুপ্রাণিত করেছেন। বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও বিজ্ঞান মেলায় নিজের শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও যোগদান করতেন এবং উৎসাহ প্রদান করতেন। ১৯৮৪ সালের ২০ আগষ্ট মহাপ্রয়াণ ঘটে এই ক্ষণজন্মা মহাবিজ্ঞানীর। আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র নই। কিন্তু এটাই সত্যি যে- উনি আমার সর্বকালের শ্রদ্ধেয় ও সেরাশিক্ষক। স্যারের মেধা, পাণ্ডিত্য আর বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা দেখে আমার ঘোর আর কাটে না। স্যারের বিদেহী আত্মার প্রতি রইলো আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

x