এখনও তিনি একক, অবিসংবাদী

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১১ মে, ২০১৯ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
44

আমাদের মেঘ-বৃষ্টি-রোদ্দুরে
আমাদের সাগরে-শিশিরে-কুয়াশায়
আমাদের ছড়ায়-কবিতায় গল্পে-গানে
এখনও তিনি একক, অবিসংবাদী।

মানবীয় সম্পর্কমাত্রই তুল্যমূল্য। কিন্তু ‘মা’ বিশেষ। তিনিই আদি। মানতে হবে প্রতিটি সম্পর্কই ভালোবাসার, আবেগের, আদরের। এও মানতে হবে মাতৃসম্পর্ক সব সম্পর্কের উর্ধ্বে। ধর্মকথায়, তত্ত্বকথায় কি গল্পকথায় মাতৃবন্দনা তাই অন্তহীন। মায়ের জন্য বিশেষ একটি দিন তাই মাথায় তুলে নিয়েছে সারা দুনিয়া।
মায়ের বয়সের গাছপাথর নেই। মাতৃবন্দনারও। গ্রীক পুরাণে পূজো দেওয়া হতো সেইসব দেবী মায়েদের যারা মা রূপে খ্যাতি পেয়েছিলেন। সুনির্দিষ্ট একটি বসন্ত উৎসব ক্রোনাসের স্ত্রী রিয়াকে উৎসর্গ করা হতো যিনি দেবতার মা বলেই পূজো পেতেন। খ্রিস্টজন্মের ৩০০ বছর আগে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিলারিয়ার মাধ্যমে রোমানরা মাকে সম্মান জানাতেন। দেবী সাইবেলা মা হিসেবে পূজো পেতেন। খ্রিস্টধর্ম প্রচলিত হবার প্রথম দিকে কুমারী মা মেরীকে ‘সানডে ফর মাদার্স’ নামের অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে সম্মান জানানো হতো। ষোড়শ শতাব্দীর বিলেতে ইস্টারের ৪০ দিনের উৎসবের ৪র্থ রোববারে ‘মাদারিং ডে’ উদযাপিত হতো। রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি হতো মাদারিং কেক। ঘরমুখো মানুষ কেক হাতে ছুটতো’; মা কেন্দ্রিক মিলনোৎসবে মেতে উঠতো প্রতিটি পরিবার। যে মা দিবসটি আজ আমরা পালন করি সেটি ইউরোপীয় নয়। খোদ আমেরিকার। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে এ দিবসটির ডাক দিয়েছিলেন যুদ্ধসঙ্গীত রচয়িত্রী জুলিয়া হাউ। ১৯০৭ এ প্রায় ৩৫ বছর পরে অ্যানা জারাভিস মা দিবসের প্রচারণার কাজ নিয়ে আবার সামনে এলেন। এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখতেন তাঁর মা। ৪/৫ বছরের মধ্যে দিবসটির পালে জোর হাওয়া লাগে। দেশব্যাপী উদযাপিত হতে থাকে মা দিবস। ১৯১৪য় প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মাতৃদিবস উপলক্ষে রীতিমতো ছুটি ঘোষণা করে (তখন ২রা মে দিবসটি উদযাপিত হতো) সকলকে তাক লাগিয়ে দিলেন। যে-দেশের নারী ভোটাধিকার পেতে অপেক্ষা করেছে অর্ধশতকেরও বেশি সময় সেখানে মাতৃদিবসের স্বীকৃতি পেতে সময় লাগলো মাত্র অর্ধযুগ। আর মাত্র ১০ বছরের এক জরিপকর্মে দেখা গেল মাতৃদিবসে ফুলের চাহিদা ভালবাসা দিবসকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ যুগলদের ছাপিয়ে ভালবাসার ফুলের আদরে ভেসে যাচ্ছেন মা, একলা মা। কারণটা কি? বোধ করি কারণটা পিছু টান, মনে পড়া।
মায়ের নাড়িছেঁড়া ধনেরা বড় হয়ে মা হয়, বাবা হয়। নিজেদের সংসার সন্তান এবং হাজারো কর্মের ব্যস্ততায় মা পেছনে পড়ে যান আসলে ক্রমশ বড় হতে থাকা সন্তানদের মনের মধ্যে চালান হয়ে যান। বাবা-মা। এবং যেহেতু আমাদের প্রত্যেকের মনের মধ্যে থাকে একটা ঘুর ঘুর করা সর্ষেদানা মন; তাই ঘুরে ফিরে তাদের দেখা হয়। বিস্মৃতির অতলে তাঁরা হারান না। একটা প্রতীকি দিবসের টোকা পড়লে সন্তান যেন সম্বিৎ ফিরে পায়। দিবসের ছায়ায় মাকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে জুড়িয়ে নেওয়ার এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করে না কেউই। এর মধ্যে দিয়ে কত দুর্বহ মনের বেদনার ভার লাঘব হয়। কত ভুলো মনের ঘুম ভাঙে। কত অপরাধী মনে অনুতাপের শিশির জমে। কত শত পাথর মন গলে যায়। এমন একটি দিবস কাম্য নয় কার? এই সঙ্গে একটা প্রশ্নেরও বোধকরি মীমাংসা হয়ে যায়। আমেরিকায় মা দিবসটিই কেন নিল সবাই? কেন ইউরোপের মা দিবস তাকে তোলা রইল? আমাদের উত্তরটি সহজ। আমরা জানি আমাদের মা মানে যখন তখন (তার)শাড়ির আচলে মুখ মুছে নেওয়া মা, আমাদের মা মানে মানবিক গন্ধে ভরা মা। আমাদের মা মানে মেঘে জলে, বৃষ্টিতে-কাদায় মাখামাখি একটা মন। আমাদের মা মানে জলে ভরা চোখ, হাসি ভরা মুখ।
২০০৫ এ দৈনিক প্রথম আলোতে লালমনিরহাটের বেণু বেগমের লেখায় পেয়েছিলাম চমৎকার এক মাতৃবন্দনা। বেনু লিখেছেন…. নির্ঘুম রাতের নাম,বিচলিত হৃদয়ের নাম মা। মা এক ছায়াবৃক্ষের নাম, মায়া-মমতার অবিশ্রান্ত এক ঢলের নাম। সর্বংসহা মৃত্তিকার নাম মা। মা এক রূপকথার নাম। মাতৃবন্দনার ছলে বেনু কিছু প্রশ্নও তুলেছিলেন। বলেছেন অবহেলিত এক পরিচিতির নাম মা। মতবাদের এক উপহাসের নাম মা। লিঙ্গবৈষম্যে কুঁকড়ে যাওয়া এক অস্তিত্বের নাম মা। পুষ্টিহীনতায় ভোগা এক ভগ্নস্বাস্থ্যের নাম মা। ভাষার মাধুর্যে প্রশান্তি দেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টার নাম মা। বেণুর সম্পূর্ণ লেখাটিই উদ্ধৃতিযোগ্য। আরও দুটি বাক্য যোগ না করলেই নয়। বেণু বলেছেন, সন্তানের ত্রুটিপূর্ণ জন্ম এবং আচরণের দায় বর্তে যাওয়া অভিভাবকের নাম মা। বলেছেন, দায়িত্বহীন মানুষদের আস্ফালনে বিহ্বল এক সম্পর্কের নাম মা। আমরা জানি প্রতিটি মায়ের গল্প শুরু হয় ন মাস লালিত এক স্বপ্নের পর এক অনির্বচনীয় আনন্দানুভূতি নিয়ে। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শঙ্কা, মৃত্যুভয় এবং অনিশ্চয়তা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবিত জয়যাত্রার পরেও অন্তত এই পোড়া দেশে। যেমন করেই হোক মা হবার পরে সন্তান মাকে যতটা বোঝে তার আগে ততটা বা সেভাবে বোঝেনা। সেজন্যই মাতৃউপলব্ধিতে নারীর অগ্রাধিকার। আমার ধারণা ছেলেরা মাকে ঠিক সেভাবে উপলব্ধি করে মাকে হারাবার পরে। মেয়েদের কথাই বলি। বিলেতের ‘সেইনসবারিস মোবাইল’কৃত একটি গবেষণা জরিপ বলছে সেখানকার ৬০ শতাংশ নারী মোবাইলে সবচেয়ে বেশি কথা বলে মায়ের সঙ্গে ওই বিশেষ দিনটিতে। একটি মোবাইল ফোন তাদের ইচ্ছেপূরণের কাজটা সহজ করে দিয়েছে। এখন যে কাজটা এত সহজ, মোবাইলবিহীন দিনে তেমন সুযোগ যাদের ছিল না তাদের অনেকের কাছে মা এখন কেবল পুঞ্জীভূত স্মৃতির বেদনা।
নিজের কথাই বলি। বাঁশবনের ছায়ায় কালো জলের পুকুর, তার শাওলা পিছল ঘাটের ভেলভেটে ডাহুকীর সাবধানী হলুদ পায়ের পাতার মতো আমাদের মাটির উঠোন জুড়ে আমার মায়ের পায়ের পাতার স্মৃতি এখনও পরিস্কার দেখি। লতা গুল্মে নিবিড় ঘন গাছ গাছালির ঠাস-বুনটের মধ্যে এক রূপকথার ঘর। সে ঘরে লালঠোঁট টিয়ে পাখিটার মতো আমার মা। জসিম উদ্‌্‌দীনের দাদীর কবরের মতো ফিরোজা পাথরের নাকফুলবিহীন এক স্মৃতির নাম আমার মা। মনে পড়ামাত্র এই চট্টগ্রাম থেকে ভোরের প্রথম বাসটি ধরে ছুটে গেছি, ফিরেছি দিনান্তে। আজ মা নেই। আছে তাঁর আসা-যাওয়া পথের ধারে ঘুম ঘুম পাহাড় থেকে নেমে সমতলের শষ্যক্ষেত ধান থেকে তিল তিসি, আঁখ থেকে পাট, সিম থেকে লাউ-কুমড়োর ফুল, টলটলে জলের পুকুর থেকে হাজা-মজা-ডোবা খাল, ধানকল-চাতাল, চাতালে পায়ে পায়ে ধান মেলে দেওয়া মেয়েরা-সবই আজ মায়ের স্মৃতি। মাঝে মাঝে বেপরোয়া বাতাসে ভেসে আসা নিম-নিশিন্দার ঝাঁঝালো ঘ্রাণে মায়ের মুখের পান-জরদার-সুবাস-সব মায়ের স্মৃতি।
না, মায়েরা আর আগের মতো নেই। সময় তাদের বদলে দিচ্ছে। মা মানে আর শুধু অসহায়তা নয়, কেবল বোরুদ্যমানতা নয়। মা এখন সিংহ-মাও বটে।
দক্ষিণ আফ্রিকার এক মা (নকুবঙ্গা কাস্পি) এক মধ্যরাতে মেয়ের ফোন পেলেন। মেয়ে রুদ্ধশ্বাসে জানায়, সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষকদের ৩ জনকেই সে চেনে। পুলিশকে ফোন করে উত্তর না পেয়ে নিজেই অকুস্থলে ছুটলেন নকুবঙ্গা। যাবার আগে রান্নাঘর থেকে ধারালো ছুরিটা নিতে ভুললেন না। যথাস্থানে পৌঁছে কন্যাকে পেলেন এক ধর্ষকের কব্জায়। অন্য দু’জন তখন অপেক্ষায়। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন ছুরি হাতে। এক ধর্ষককে শেষ করে, বাকি দু’জনকে গুরুতর আহত রেখে মেয়েকে নিয়ে ছোটেন তিনি কাছাকাছি এক বন্ধুর বাসার উদ্দেশ্যে। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কারাগারে মেয়ের খবর পাচ্ছিলেন না বলে তাঁর সে কি দুশ্চিন্তা। বলেছেন, সে অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। ছদিন পরে জামিনে মুক্ত হয়ে মায়েতে-মেয়েতে সেই যে এক মহামিলন হলো, সেই থেকে (দেড় বছর আগেকার ঘটনা) তাঁরা একে অন্যের মানসিক অবলম্বন। ঘটনায় এক সপ্তাহ পরে নকুবঙ্গার পক্ষে এগিয়ে এলেন এক আইনজীবী যিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন নকুবঙ্গা যা করেছেন আত্মরক্ষার্থে করেছেন, আত্মজাকে বাঁচাতে করেছেন। গণমাধ্যম এই মায়ের ত্রাণকর্তা রূপে এগিয়ে এসেছে আজ। আজ তিনি ‘সিংহ-মা’ পরিচয়ে ধন্য মা।
১৪২৬ বঙ্গাব্দের বর্ষ শুরুর প্রাক্কালে সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতের উপর যে পৈশাচিক বর্বরতার ঘটনাটি ঘটে গেল তার সঙ্গে উপর্যুক্ত ঘটনার মিল মূলগত। নুসরাতের মায়ের কাছে নকুবঙ্গার সাহস আমরা আশা করি না। কিন্তু আমাদের (নুসরাতের) এই মা দেশ-কাল-সমাজের প্রেক্ষাপটে যে সাহসটুকুর পরিচয় দিয়েছেন তা কোনও অংশেই নকুবঙ্গার চেয়ে কম নয়। পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দীতে তিনি উল্লেখ করেছেন পুত্রের মুখে খবরটি পাওয়া মাত্র তিনি মাদ্রাসা অভিমুখে ছোটেন এবং অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে জোর গলায় কৈফিয়ত চান। ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ এ মায়ের প্রতিক্রিয়ায় ভীত অধ্যক্ষ আত্মরক্ষার্থে তৎক্ষণাৎ পুলিশ ডাকতে বাধ্য হন। নুসরাতের মা শিরীন আক্তারের সাহস নকুবঙ্গার ছুরির চেয়ে কম ধারালো ছিল না। মামলাটি বিচারাধীন বলে আমরা সবটুকু খুলে বলছি না। শুধু বলছি যে আমাদের মেয়েরা যেমন বদলে যাচ্ছে, তাদের মায়েরাও তেমনি বদলে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অস্বীকার করার উপায় নেই যে নবতিপর অসমর্থ মাকে বৃদ্ধাশ্রমে, বাঁশঝাড়ে বা গোয়ালঘরে দেখার দুর্ভাগ্যও হচ্ছে আমাদের। সৌভাগ্য যে মানুষ আর চোখ বুঁজে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে না। বরং এগিয়ে আসছে মানুষ। জয় হচ্ছে মানবতার, মানবিকতার। মাকে বাদ দিয়ে হয় কিছু? মাকে বাদ দিলে থাকে কিছু? তাই জয় হোক মাতৃদিবসের। অর্থাৎ মায়ের এবং প্রতিটি দিন হোক মায়ের দিন, মাতৃদিবস।

x