এক শৈল্পিক নির্মাণশৈলী, দেখা মেলেনা এখন আর

অপু ইব্রাহিম : সন্দ্বীপ

সোমবার , ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ
46

গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন জায়গা থেকে সময়ের বিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে শিল্পী, সমপ্রীতি এবং সামাজিক বন্ধনের কারিগর গ্রামগঞ্জে থাকা বাবুই পাখি ও তার স্বপ্নের নীড়বাসাগুলো। গ্রাম বাংলায় এখন আর আগের মতো বাবুই পাখি ও তার বাসা চোখে পড়ে না। প্রকৃতির রূপকথা ও সুন্দর সবুজ ফসলের বুক থেকে কালের বিবর্তনে সন্দ্বীপের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিলুপ্তির পথে বাবুই পাখি ও তার বাসা। বাবুই আবহমান বাংলার শোভন পাখি। তালগাছের পাতায়, নারিকেল গাছের পাতায়, বাবুরের গাছে দল বেধে স্বপ্ন নীড়ে দোল খেত পাখিগুলো। বেশিরভাগ দেখা যেত গ্রাম্য এলাকায়।

বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়ুই, কুঁড়েঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদবৃষ্টিঝড়ে’ কবি রজনী কান্ত সেনের এই অমর কবিতাটি এখন এদেশে ৩য় শ্রেণির বাংলা বইয়ে পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকের কবিতা পড়েই এখনকার শিক্ষার্থীরা বাবুই পাখির শিল্প পাখির নিপুণতার কথা জানতে পারে। এখন আর চোখে পড়ে না বাবুই পাখি ও তার নিজের তৈরি দৃষ্টিনন্দন সেই ছোট্ট বাসা তৈরির নৈসর্গিক দৃশ্য। শুধু তাই নয় দেশের এক সময়ের নজরকাড়া বাবুই পাখিকে নিয়ে কবির স্বাধীনতার সুখকবিতাটি আজো মানুষ উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করলেও হারিয়ে যেতে বসেছে বাবুই পাখি ও তার বাসা। বাবুই পাখির বাসা আজ অনেকটা স্মৃতির অন্তরালে বিলীন হতে চলেছে। অথচ আজ থেকে প্রায় ১৫/১৬ বছর আগেও গ্রামগঞ্জের মাঠে ঘাটের তাল গাছে দেখা যেত বাবুই পাখির নিপুণ কারু খচিত তৈরি বাসা সেটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

তালগাছ, বাবুর গাছগুলোতেই বাবুই পাখির শিল্পিত বাসা নিসর্গকে মনোরম করে তুলতো। যেমন দৃষ্টিনন্দন তাদের বাসা, ঠিক তেমনি মজবুত। প্রবল ঝড় বৃষ্টিবাতাসেও টিকে থাকে তাদের একটি একটি করে লতাপাতা দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তোলা বাসাগুলো। খড়ের ফালি, ধানের পাতা, তালের কচিপাতা, ঝাউ ও কাঁশবনের লতাপাতা দিয়ে উঁচু তালগাছে মাঠে বাবুর গাছে দেখা যায়, খুব চমৎকার আকৃতির বাসা তৈরি করত বাবুই পাখিরা। একান্তবর্তী পরিবারের মত এক গাছে দলবদ্ধ বাসা বুনে এদের বাস। বাবুই পাখি একাধারে শিল্পী, স্থপতি ও সামাজিক বন্ধনেরও প্রতিচ্ছবি। শক্ত বুননের এ বাসা টেনেও ছেঁড়া কঠিন। বাবুই পাখির মত দিনে দিনে উজাড় হচ্ছে তালগাছ, বাবুর গাছ। হারিয়ে যাচ্ছে মিষ্টি মধুর কণ্ঠে বাবুই পাখির গান। একযুগ পূর্বেও গ্রামগঞ্জের তাল, নারিকেল, সুপারি, বাবুর গাছে ব্যাপকভাবে বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়তো। কিন্তু এখন আগের মতো আর গাছপালা নেই তাই চোখে পড়েনা বাবুই পাখির বাসা।

কথিত আছে, বাবুই পাখি রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করার জন্যে জোনাকি পোকা ধরে নিয়ে বাসায় রাখে এবং সকাল হলে আবার তাদের ছেড়ে দেয়। বাবুই পাখি বাসা তৈরির পর সঙ্গী খুঁজতে যায় অন্য বাসায়। সঙ্গী পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুইকে সাথী বানানোর জন্য নানাভাবে ভাবভালোবাসা নিবেদন করে এরা। বাসা তৈরির কাজ অর্ধেক হলে স্ত্রী বাবুইকে সে বাসা দেখায়। বাসা পছন্দ হলে কেবল সম্পর্ক গড়ে। স্ত্রী বাবুই পাখির বাসা পছন্দ হলে বাকী কাজ শেষ করতে পুরুষ বাবুই পাখির সময় লাগে চারদিন। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরণা পেয়ে পুরুষ বাবুই মনের আনন্দে শিল্পসম্মত ও নিপুণভাবে বিরামহীন কাজ করে বাসা তৈরির কাজ শেষ করে। প্রেমিক বাবুই যত প্রেমই দেখাক না কেন, প্রেমিকা ডিম দেয়ার সাথে সাথেই প্রেমিক বাবুই আবার খুঁজতে থাকে অন্য সঙ্গী। পুরুষ বাবুই এক মওসুমে ছয়টি বাসা তৈরি করতে পারে। ক্ষেতের ধান পাকার সময় হল বাবুই পাখির প্রজনন মওসুম। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবার পরপরই বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য স্ত্রী বাবুই ক্ষেত থেকে দুধ ধান সংগ্রহ করে।

উপজেলার মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের ডা. নুরুল আনোয়ার হিরন বলেন, বাবুই পাখি আসলে প্রাকৃতিক দর্জি। এর বুননে সত্যি জাদু আছে। এছাড়া এ পাখি শিল্পের নিদর্শনও বটে। একে দেখে আমাদেরও শেখার অনেক কিছু আছে।

পরিবেশ ও মানবতাবাদী কর্মী হাসানুজ্জামান সন্দ্বীপি বলেন, এমন একটা সময় ছিল যখন গ্রামাঞ্চলে বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যেত অনেক। এখন এসব যেন বইয়ের ছড়া আর দাদুর কাছে শোনা গল্প। এখন গ্রামগুলোতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। সেই সাথে জলাশয়সহ কৃষি জমি বালু ফেলে ভরাট করে, গাছপালা কেটে বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। তাই এখন আর আগের মতো গ্রামাঞ্চলের রাস্তার ধারে, বাড়ির পাশে ও পুকুর পাড়ে সেই গাছ যেমন দেখা যায় না তেমনি দেখা মিলে না শৈল্পিক বাবুই পাখিরও।

তাই বাবুই পাখি ও এর শৈল্পিক নিদর্শন রক্ষা করার জন্যে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকেই। এসব বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই ছিল না, মানুষের মনে চিন্তার খোরাক যোগাত এবং স্বাবলম্বী হতে উৎসাহিত করত। বিশ্লেষকগণ মনে করেন, বর্তমানে বাবুই পাখি বাসা বাঁধতে পারে এ ধরনের গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে, গ্রাম অঞ্চলেও তৈরি হচ্ছে ইট কংক্রিটের ইমারত। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি। তাই আগের মত তাল, নারিকেল, সুপারি, বাবুর গাছ নেই, আর বাবুই পাখিও নেই। তারা আরো বলেন, এখনি যদি পাখিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারিভাবে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তাহলে হয়তো এসব পাখি টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। আবারও গাছে গাছে বাবুই পাখি দল বেঁধে বাসা তৈরি করে বসবাস করবে, জুড়াবে প্রকৃতি প্রেমীদের চোখের তৃষ্ণা। আবারও বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে ভরে উঠবে সকালসন্ধ্যা আকাশবাতাস।

x