এক যে ছিল বাবা

লুসিফার লায়লা

মঙ্গলবার , ৩০ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
44

সাইকেলের চাকা ঘুরছে অবিরাম, সামনে কেবল ছুটে চলার হাতছানি আর পেছন থেকে একজোড়া শক্ত হাত ধরে আছে সাইকেলের পেছনের অংশ। ছুটতে ছুটতে গলির মাথা আবার ফিরে এসে ঘরের চৌকাঠে দাঁড়ানো। তারপর আবার শুরু, এইরকম চলতে চলতে একসময় অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে দেখলাম পেছন থেকে আমায় আগলে রাখা হাতটা আর নেই। সে-হাতের অনুপস্থিতির বিস্ময়ে সাইকেল থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। চোখ ছলছল করে প্রশ্ন করেছিলাম কেন ছেড়ে দিলে? আমার কান্নার উত্তরে বাতাসে হাসির হল্লা ছড়িয়ে দিয়ে বলেছিল ‘ছেড়ে না দিলে কি করে জানতিস একাই চালাতে পারছিস।’ ছেলেবেলার দারুণ সব দৃশ্যকল্পের একটা এটা। এই রকম অগুনতি দৃশ্যকল্পের ভেতর আমি বেড়ে উঠেছি আজকের আমি হয়ে। আর এই হয়ে ওঠার ভেতর বাবা নামের দারুণ ম্যাজিশিয়ানের রুমাল নাড়ানো আজও আমি টের পাই।
আমার প্রথম পাঠশালার নাম বাবা , দিনক্ষণ মনে নেই কবে আমি সে পাঠশালা শুরু করেছিলাম। কেবল মনে আছে বাবা হাঁটছে বড় বড় পা ফেলে আর আমরা তার পেছন-পেছন প্রায় ছুটতে ছুটতে চলেছি। পথের পাশের গাছ, ফুল, পাতা, পাখির নাম শিখতে শিখতে আমরা চলেছি বাবার পিছু পিছু, পিছিয়ে পড়লে খানিকটা থমকে থেকে পাশেই যে আছে তার আশ্বাস দিতে দিতে এগিয়ে যেত। চিরকাল এমনি করেই পাশে থাকবার দৃঢ় সংকল্পের মুখ বাবা। আমাদের প্রথম পাঠশালায় অ, আ, ক,খ বা অ,ই,ঈ,উ বাদ দিয়ে বাকি সব শেখার সুযোগ ছিল। আমরা শীতের সকালে শিউলি কুড়িয়ে শিখেছি শিউলির বোটার রং কমলা, রাতে ফোটে আর সকালবেলায় টুপ করে তারার মত ঝরে যায়। শিখেছি উইপিং দেবদারুর পাতার গা বেয়ে বৃষ্টির জল কান্নার মতোই গড়িয়ে নামে বলে ওর নাম উইপিং দেবদারু। বাজার ফেরত বড় থালায় মাছের থলি উপুড় করতে করতেই কোনটা কি মাছ চেনানোর তোড়জোরের ভেতর আমাদের পাঠশালার দরজা জানালা টপকে পৃথিবীর আলো এসে পড়ত। সেই আলোর ভেতর নতুন দিনের স্বপ্ন দেখার রঙিন চোখের তারা বাবার দেয়া প্রথম এবং পরম উপহার।
আমার ধ্যবড়া নাক নিয়ে ভাইবোনেরা খুব খ্যাপাতো ছেলেবেলার দিনগুলোতে আর বাবা আমার হয়ে উত্তর দিত। একটা শিশুর মনের ভেতর এই ধ্যবড়া নাকের খুনসুটি যেন কিছুতেই মনের মধ্যে স্থায়ী অস্বস্তির ছাপ না ফেলে তাই বাবা সবার মুখের উপর বলত আমার নাক তিল ফুলের মতো সুন্দর। তিল ফুলের দেখা পেতে অনেককাল অপেক্ষা করতে হয়েছে কিন্তু বাবার সেই তিল ফুলের উপমা আমাকে হীনমন্যতায় ভোগার হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিল। এইরকম অজস্র গল্পে মোড়ানো আমার দুরন্ত ছেলেবেলাটা বাবার জন্যেই দুর্দান্ত হয়ে উঠেছিল।
খুব অসুখ করেছিল আমার ছেলেবেলায়, সবরকম ছুটোছুটি, হুল্লোড় গানবাজনা সব বন্ধ। দীর্ঘদিন কেবল বিছানায় বন্দি হয়ে কাটাতে হবে, এটা জানার পরে আমার জন্যে নতুন কোন জগৎ তৈরি করে দিতে উঠে পড়ে লাগলেন। আমার হাসপাতালে কাটানো দিনগুলোতেই একদিন আমায় নিয়ে সে-নতুন জগতে ঢুকে গেলেন। একটা রাশান রূপকথা আর আকাশ চেনার একটা কি বই আর একখানা সুকুমার শিশু সমগ্র। ব্যাস শুরু হয়ে গেল আমার আলাদা জগতের সাথে চলার দিন । মধ্যবিত্ত পরিবারের দায়িত্বের বোঝায় মেরুদণ্‌ড সোজা করতে না পারা বাবা তার অসুস্থ সন্তানের জগৎ নির্মাণের জন্যে প্রাণান্ত চেষ্টা চালাতে লাগলেন। আমি খুব দ্রুত শেষ করে ফেলি বই আর আমার সেই পড়ার খোরাক জোগাতে বাবা। বাসে ঝুলতে ঝুলতে যেত কাঁটাবন পুরনো বইয়ের দোকানে। রোদে পুড়ে ঘামে ভিজে বই কিনে বাবা যখন ফিরত তখন সেই ক্লান্ত মুখটার ভেতর আনন্দের ছাপ লেগে থাকত। সেসময় কোনো এক দুপুরবেলায় বাবার সাথে আমি ‘ডাকঘর’ গল্পটা প্রথম পড়ি। একসাথে সে পড়ার অভ্যেস বহু বছর জারি ছিল। এমন হত অনেক সময় আমার একাডেমিক পড়াশোনাও বাবা পড়ে রাখত আগেভাগে যাতে গল্প করতে করতেই আমার পড়ার কাজ অনেকটা এগিয়ে থাকে। ছুটোছুটি করা বারণ বলে আমার যে দুঃখবোধ সেই ক্ষতির গায়ে যত্ন করে মলম লাগাত বাবা। বলত সবার ছেলেবেলা একই রকমের হবে এমন কোনো কথা নেই , তোমার না হয় অন্যরকম হল, সবার থেকে আলাদা। আজ বুঝি সবার চাইতে আলাদারকম করে বাড়তে দেবে বলেই হয়তো চারপাশের অনেক কিছুকেই ধর্তব্যে নিলেন না, অসুখের সাথে আমার লড়াইটা যাতে খুব বেশি সংঘাতময় না হয় ,আমার মন যেন শুশ্রুসা পায় সেইদিকে সাবধানী চোখ রেখে আমায় বেড়ে উঠতে দিয়েছে।
বড় হয়ে কী হবে বা কী হতে হবে এমন কোনো লক্ষ্য সামনে রেখে দিয়ে আমাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে কোনো ইঁদুরদৌড়ের মধ্যে ফেলে দিতে চাননি বলে কত শত কথার তীরে বিদ্ধ হতে হয়েছে। কিন্তু ভারী শান্ত আর লক্ষ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত নিশ্চিত ছিল বলেই হয়তো এই সব প্রশ্নবানের ভেতর বাবার প্রশান্ত মুখটা জেগে থাকত তথাকথিত সংসারবিমুখ সন্ন্যাসীর মতো। বাবার এই সন্ন্যাসের ভেতর আমাদের চাপমুক্ত বেড়ে ওঠার দিন কলকল করত। যেমন ইচ্ছে যা খুশি তেমন হয়ে উঠবার এমন অবাধ স্বাধীনতার ভেতর বাবার ইচ্ছে ছিল কেবল আমরা মান আর হুসের সমন্বয়ে মানবিক মানুষ হয়ে উঠব।
মানবিক মানুষ হবার হাতে খড়ির সেদিন আমাদের ভাইবোনদের জীবনে দারুণ উজ্জ্বল। আজও চোখ বুজে সেই দিনের ভেতর ভ্রমণ করে আসা যায়। সেই দিনটা অন্য আর সব দিনের মতোই একটা দিন কেবল। সেদিনের সন্ধ্যার পরে আমাদের বাসার পরিবেশটা থমথমে হয়ে গেছিলো। বড় ফুপুর বড় ছেলে আর আমাদের একমাত্র ভাই চুরি গেছে সে কথাটা আমরা সে-সন্ধ্যায় যখন জানতে পারি তখন বাসার চারপাশে আত্মীয় বন্ধুদের ভীড়, চিৎকার চ্যাঁচামেচি,কান্নাকাটি। কেবল আমার বাবার ঘরের পরিবেশটা একদম ঠান্ডা। শোক আছে কিন্তু মাতম নেই , বাবা পথ খুঁজছেন ভাইদের ফিরিয়ে আনবার আমার মা চুপচাপ তার প্রার্থনা জারি রেখে অপেক্ষা করছেন। দুর্বিষহ সে সন্ধ্যা কাটিয়ে রাত গভীর হলে আমার দ’ুভাই ফিরে এসেছে এক অজানা-অচেনা মানুষের হাত ধরে। লোকজন উত্তেজনার বসে সেই লোকটাকেই প্রায় মারতে ছুটে গেছিলো। ছোট ছোট দুহাত তুলে আমার ভাইরা থামিয়ে ছিল সেদিনের মারমুখী হাতগুলোকে। রাত পার করে সকাল হলে খুঁজে পেতে ধরে আনা হয়েছিল সেই ছেলেধরাকে, যে-কিনা আমাদের বাসার কাজে সহায়তা করতে আসা মেয়েটার ভাই। আনতে আনতেই প্রচুর মেরেছিলো ছেলেটাকে। ধরে এনে আমাদের বাসার পেছনের উঠোনে ওকে বেঁধে যেই ওর উপর আবারো চড়াও হতে গেছে সবাই আমার বাবা হুঙ্কার দিয়ে থামিয়েছিলেন। বাবাকে অতটা রেগে যেতে কেউ এর আগে দেখিনি। সবাই চুপচাপ সরে গিয়েছিল, তারপরে সে দুপুরবেলায় থালায় খাবার সাজিয়ে চামচ কেটে ছেলেটাকে খাইয়ে দিয়েছে বাবা। বিকেলবেলায় বাড়ি ফেরার টাকা আর প্রাথমিক ওষুধপত্র দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেদিনের বাবা আমাদের কাছে হয়ে গেল মানবিকতার স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সেদিন জীবনে প্রথম আবিষ্কার করেছি যাকে বাবা বলে আমরা ডাকি সে মানুষটার ভেতর যে মানবিক মানুষটা জেগে থাকে সে আমাদের নিত্য দিনের বাবা নন, অন্যকেউ।
রাস্তার বেড়ালছানা নালায় পড়ে গিয়ে কাঁদছে আর মা বেড়ালটা উদ্ধারের পথ খুঁজছে, অফিসের জামা কাপড়েই নালায় নেমে ছানাটা উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তবেই স্বস্তি। কিংবা গাছ কাটা হবে নতুন বাসার কাজ শুরু হলে সেই নিয়ে চার কথা হচ্ছে বাবার সাথে। কিছুতেই গাছ কাটা চলবে না তাতে নতুন বাড়ির কাজ খানিকটা বিঘ্নিত হোক তাতেও কোনো আপত্তি নেই। দূরে বসে ফোনে আমি সবচাইতে বেশি ঝগড়া করেছি গাছ কাটার পক্ষে। আমার সাথে না পেরে অনুমতি দিয়েছিল বটে কিন্তু মন থেকে মানতে পারেনি বলেই সেই গাছ কাটার দিন বিছানা ছেড়ে উঠলো না ঠিকমত খেলো না ,কথা বললো না। সেই অভিমানী বাবার মুখ আমি দূরে বসে দেখতে পাইনি কিন্তু মনে মনে জেনেছি বাবার ভেতর অনেক তোলপাড় হয়ে গেছে।
এইসব গল্প বলতে বলতে বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছে, মনের ভেতর তোলপাড় হচ্ছে। খেই হারিয়ে বারবার যে শূন্যতার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি সে শূন্যতায়ও সঙ্গী হচ্ছে বাবা। যেমন করে বিখ্যাত সব প্রদর্শনী দেখবার সময় বহু দূরে বসেও আমার সঙ্গী হয়েছে তেমনি। বিখ্যাত সব কাজের সামনে দাঁড়িয়ে আমার বিস্ময়কে ভাগ করে নিয়েছে বাবা। সমস্ত খুঁটিয়ে এমন করে জানতে চেয়েছে যে আমার মনেই হতো না একা একাই আমি সেসব কাজ দেখছি। বরং বাবার হাত ধরে এমন বহু ভ্রমণে আমি গেছি যে ভ্রমণ বাস্তবে হয়তো আর কোনদিন সম্ভব নয়। আমি দেশের বাইরে যাবার পরে খালি বলতো ঘুরে দেখ ঘুরে দেখ আর আমি তোর চোখ দিয়ে দেখব। অথচ আমি মনে মনে জেনেছি বাবার চোখ দিয়ে পৃথিবীর এমাথা-ওমাথা দেখছি কত কত দুপুর সন্ধ্যায়। কখনো চীনের প্রাচীর তো কখনো আইফেলটাওয়ার। কোনোদিন অজন্তা ইলোরা অথবা কোনোদিন মিশরের পিরামিড , হিমালয়ের চূড়ায় বসে কফি খাবার ছবি তোলা থাকত মনের মধ্যে। এই হলো বাবা আমার চিরকালের ভ্রমণ সঙ্গী। বইয়ের উড়োজাহাজে চেপেও যে এই জগতটা ঘুরে দেখা চলে বাবা না হলে জানাই হতো না। এমন সব অজানাকে জানবার রঙিন সম্ভার বুকে আগলে রেখেও বাবার সেভাবে কোথাও ভ্রমণ করাই হলো না। অথচ আমার যে পরিব্রাজক মন সেটা বাবার দেয়া। আজকাল ঘুরতে গেলেই বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করে আমার একা লাগে খুব তোমাকে ছাড়া।
সবসময় বিষয় সম্পত্তির দিকে প্রচন্ড নির্লিপ্তি ছুড়ে দিয়ে রাজার মত জীবনযাপন করা মানুষটাকে দেখেই জেনেছি যে মানুষ মনে মনে রাজার বেশে ঘুরে তার পর্ণ কুটিরও রাজপ্রাসাদ। ফলে বাবার অধিকার কেউ কেড়ে নিয়ে ভোগ করেছে, ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছে, অথবা বেহাত করে নিয়েছে সহায় সম্বল সেসবে কোনোদিন বিচলিত করতে পারেনি। বরং দেশ পত্রিকার কোনো সংখ্যা কেউ পড়তে নিয়ে ফেরত দেয়নি অথবা পুরনো বই পোকায় কেটেছে তাতেই আফসোসের শেষ থাকত না। পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. জামাল নজরুল ইসলামের বিখ্যাত বই দ্যা আল্টিমেইট ফেইট অফ দ্যা ইউনিভার্স বইটার প্রথম অনুবাদক আমার বাবা। রাতদিন এক করে বইটার অনুবাদ শেষ করে সেই অনুবাদের কোনো কপি না রেখে জামাল স্যারকে দিয়েছিলেন। সেই অনুবাদের পাণ্ডুলিপি স্যারের বাসা থেকেই হারিয়ে যায়। এই ঘটনায় আহত হয়েছিল কিন্তু আশাহত হয়নি। স্বপ্ন দেখত কেউ একদিন অনুবাদ করবে বইটা। এমন নির্মোহ হতে পারে মানুষ বাবা না হলে জানাই হতো না। যেদিন চাকরি ছেড়ে বাসায় ফিরে এলেন সেদিন সন্ধ্যায় সপরিবারে বসে রবি ঠাকুর পড়েছি, বাবা দুঃসময় পড়ে শুনিয়েছে অথচ তারপরদিনের বাজার খরচও আমাদের ছিল না। মারের সাগর পাড়ি দেয়া অমন রসিক কান্ডারি আমাদের ছিল বলেই দারুণ তপ্ত দিনের দুপুরে আমার মা গাইতে পারত মধুরও বসন্ত এসেছে।
প্রথম প্রেমে পড়ার দিন, প্রথম সিগারেট অথবা প্রথম বিয়ারের ক্যানে চুমুক দেবার গোপন রোমাঞ্চ, প্রথম মা হবার অভিজ্ঞতা অনায়াসে ভাগ করে নেবার গোপন বন্ধু বাবা। ভাবছেন এ-কেমন মানুষ? আমরাও ভাবতাম ছেলেবেলায় বড় হতে হতে জেনেছি বাবা কখনো ভালটাই করতে হবে মন্দটা ছাড়তেই হবে সেসব জোর করে চাপিয়ে দিত না বরং ভাল-মন্দ দুয়ের পথ চোখের সামনে খুলে দিয়ে বলেছে বেছে নিতে, আর বিপথে ভ্রমিতে চাওয়া এ-হৃদি শুশ্রূষা পেয়েছে বাবার বুকে ঠাঁই নিয়ে। এই এক জীবনে কত কিছু শেখার সঙ্গী বাবা ছিল আমার জীবন্ত ডিকশনারি। হাজার হাজার মাইল দূরে বসেও আমার শব্দের মানে জানতে ইথারে চেপে বাবার কাছেই আসতে হয়েছে।
এগারো মাস বিছানায় পড়ে ছিল, চোখে দেখতে পেত না ,শরীর জুড়ে অসহ্য ব্যাথা অথচ জানতে চাইলেই বলেছে আমি ভালো আছি। অমন যন্ত্রণার ভেতর হাসি মুখে যমের সাথে লড়াই করে বাঁচতে চাইত কেবল তার ছেলেমেয়ের কষ্ট হবে তাকে ছাড়া। পাশে বসে শঙ্খ ঘোষের বেড়াতে যাবার সিঁড়ি পড়বার সময় শূন্য চোখে বেড়াতে যাবার স্বপ্ন দেখতে পারার মত অমন মানসিক শক্তি রাখা মানুষটি আমার জীবনে সবচাইতে লড়াকু বীর। শেষ সময়ে এসেও রবিঠাকুরের গানের ভেতর দিয়ে জীবনকে উদযাপন করতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখা মানুষটা আমাদের জীবনে নেই! আর সে না-থাকা কেবল শরীরী কারণ আমরা আমাদের প্রতিটা মুহূর্ত তার অনুপস্থিতির ব্যাথা বাজিয়ে জেনেছি বাবা আমাদের ছেড়ে যেতেই পারে না। তাই বাবার নামের আগে কেউ প্রয়াত বা মরহুম লিখলে আমার মনে হয় কেটে শুধরে দিই। যে মানুষের উপস্থিতি এত তীব্র তাকে এইসব শব্দের মোড়কে বেঁধে মৃত আখ্যা দেয়ায় আমার আপত্তি আছে। বাবা কেমন সে-কথা একবার ফেসবুকে লিখছিলাম, বাবার ধারণা হয়েছিল ওটা কবিতা। বারবার বলেছি ওটা কবিতা না, তুমি বাবা। তবু কবিতাই ভাবতে চেয়েছে , আজও সে ভাবনা ধ্রুবসত্যি।
আমি বলছি অন্ধকার, বাবা বলছে আলোটা জ্বলেনি। পুরনো নিয়মে চলছি, বাবা বলছে অনাধুনিক। বলছি আমি ক্লান্ত, বাবা বলে আরও দূরে মেঘালয়। আমি বলছি এখানেই গন্তব্য নির্ধারিত হোক, বাবা বলছে সামনে পথ বিস্তর। আমি বলছি এটাই সহজ পন্থা, বাবা বলছে মূল্য দিয়ে পেতে শেখ। বলছি প্রার্থনার বিকল্প কই? বাবা বলে ওখানে অর্জনের কৃতিত্ব নেই। মাকে শোনাচ্ছি ‘জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার…’ বাবা মাকে ডাকছে শুনে যাও ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর…।’ বলছিলাম বুদ্ধ, বিদ্যাসাগর এনারা বিশ্বস্ত নাস্তিক, বাবা বলছিল নেক্সট টু গড। আমার তিরিশ পেরিয়ে, বাবার পঁচাত্তর। দরজার এপাশে আমি বললাম যাই ওপাশে বাবা বলছে যাওয়া নেই আয়…।

x