এক মুঠো রোদ

ফারজানা রহমান শিমু

মঙ্গলবার , ২ জুলাই, ২০১৯ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ
14

প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর পুতুল টিচারকে দেখে আঁৎকে উঠল জেরিন। বারবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে আর আপনমনে ভাবছে। শতচ্ছিন্ন নোংরা শাড়িতে জড়ানো ঐ বৃদ্ধা কি আসলেই পুতুল মিস? এও কি সম্ভব সেই দুর্দান্ত সুন্দরী, স্মার্ট ও বিদুষী আর্ট টিচার আজ পথে পথে ঘুরে ভিক্ষা করছে? তাও আবার সেন্ট স্কলাসটিকা স্কুলের একজন টিচার? ভাবতে ভাবতেই রিকশাওয়ালার ধমক খেয়ে বাস্তবে ফিরল সে-“দেখে চলতে পারেন না? আরেকটু হলে রিকশার ধাক্কায় ছিটকে পড়ে যেত। ঠিক তিনদিন পরের ঘটনা। সকাল থেকে রোদের উত্তাপ আগুন ছড়াতে লাগল। আর টাটকা সবজি পাওয়ার আশায় জেরিন গলি পার হয়ে মূল সড়কের দিকে হাঁটছিল। রাস্তার অন্যপাশ দিয়ে পুতুল মিস যেন ঘোরের মধ্যে হেঁটে চলেছে। মনে হল অভ্যস্ত পায়ে পথ চলছে শুধু , চোখে দেখতে পাচ্ছে না। কি করবে জেরিন? এগিয়ে গিয়ে কথা বলবে, নাকি……ইতস্তত করতে করতেই চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল টিচার।
তৃতীয়বার একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। বৃদ্ধার বাম হাতটি নিজের হাতে নিয়ে জেরিন জানতে চাইল “আপনি কি সেন্ট স্কলাসটিকা স্কুলে টিচার ছিলেন?” বৃদ্ধা পাল্টা প্রশ্ন করল- কেন? আপনি কে? জেরিনের কাতর অনুনয় ‘প্লিজ, বলুন না। আপনি কি টিচার ছিলেন? বৃদ্ধার মুখে সামান্য হাসির ভঙ্গি ফুটে উঠল। অতীত ঐতিহ্যের আভিজাত্য যেন শরীরের দীনতাকে এক লহমায় মুছে দিয়ে গেল। মৃদুস্বরে বৃদ্ধা জবাব দিল-“ছিলাম। অনেক বছর আগে। আপনি কেন জানতে চাচ্ছেন? এক আশ্চর্য অনুভূতি। বেদনাবোধ ও ভক্তি নিয়ে জেরিন বৃদ্ধার পা ছুঁয়ে বলল, ‘টিচার আমি আপনার ছাত্রী। আমাকে তুমি করে বলুন।” বাঁ হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধা জেরিনকে স্পর্শ করার চেষ্টা করল। জেরিন এগিয়ে এল। নির্মল হাসিতে ভরে গেল বৃদ্ধার মুখখানি। জেরিনের মাথায় হাত রেখে বলল ‘নাম কি তোমার? জবাব দিল সে ‘আমার নাম জেরিন। আপনি ভালো আছেন মিস? কোন জবাব না দিয়ে সামান্য হেসে উঠল বৃদ্ধা। অসংখ্য প্রশ্ন তখন জেরিনের মনে, কিন্তু টিচারকে কি প্রশ্ন করা যায়? অগত্যা দোয়া চেয়ে কেটে পড়ল সেবার।
চতুর্থবারের সাক্ষাত বড়ই বেদনাদায়ক, তুমুল বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছিল চারপাশ। প্রাণপণে ছাতা আঁকড়ে হাঁটছে জেরিন। মূলত ছুটছে বাসার দিকে। সঙ্গীত ভবন পার হয়ে সুগন্ধা ঢুকতেই দেখে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো চরম নির্মমতায় ঝরে পড়ছে টিচারের গায়ে। তার ফর্সা হাত দুটোকে ফ্যাকাশে লাগছে। আর লাঠি হাতে খুব সাবধানতার সাথে এক পা এক পা করে তিনি হাঁটার চেষ্টা করছেন। জেরিনের সমস্ত শরীরটা কেঁপে উঠল এ দৃশ্য দেখে। ছুটে গিয়ে সে টিচারের মাথার উপর এক হাতে ছাতা ধরে অন্যহাতে তাঁর বাঁ হাতটি ধরে বলল, ‘মিস, আপনি ভিজে যাচ্ছেনতো, ঠান্ডা লেগে যাবে।” বরফের মত শীতল হাতটি তিরতির করে কাঁপছিল তখন। বৃদ্ধা যেন নালিশ জানাল ছাত্রীকে, কি করব? আমারতো ছাতা নেই। তুমি আমাকে একটা ছাতা কিনে দেবে? একসময়ের দোর্দন্ড প্রতাপশালী পুতুল টিচার তার ছাত্রীর কাছে একটা ছাতার আবেদন জানাচ্ছে দেখে জেরিনের চোখ ভিজে উঠল। সমস্ত ব্যবধান ভেঙে জেরিন টিাচারকে একহাতে জড়িয়ে ধরে বলল,‘দেব মিস, আমি কালই ছাতা নিয়ে আসব। এখন চলুন আপনাকে বাসায় দিয়ে আসি।’ পুতুল টিচার বলল, ‘আমাকে যে বিস্কুট কিনতে হবে। জেরিন টিচারকে নিয়ে সামনের দোকানে ঢুকে বলল, সব ধরনের বিস্কুটের একটি করে প্যাকেট দিন। পুতুল টিচার আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যে দুই হাতে বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে ধীরে ধীরে প্রবর্তকের পাহাড়ে উঠতে লাগল টিচার। আর একহাতে টিচারকে জড়িয়ে ধরে, অন্যহাতে ছাতা ধরে পাশাপাশি যেতে লাগল জেরিন। মনে মনে ভাবছে সে এই বৃষ্টিভেজা পিচ্ছিল পথে কি করে প্রতিদিন উঠানামা করেন টিচার। কিন্তু পুতুল মিসের কোন বিকার নেই। অভ্যস্ত পথে হাঁটতে হাঁটতে আপনমনে কথা বলেই যাচ্ছে টিচার। একসময় জেরিন জানতে চাইল, ‘মিস, আপনার আর কোন শাড়ি নেই? টিচার সহাস্যে জানাল, আছেতো। আরো দুইটা আছে। কিন্তু ওগুলো একটু একটু ছিঁড়ে গেছে। তাই এটা বেশি পরি। আচ্ছা জেরিন, তুমি আমাকে একটা শাড়ি দেবে? আর একটা ব্লাউজ? জেরিন হেসে বলে উঠল দেব মিস। কি যেন ভেবে টিচার আবার বলল, ‘নতুন লাগবে না। তোমার পুরনো শাড়ি দিলেও হবে। জেরিন বলল, ‘না মিস, আমি নতুন শাড়ি আনব আপনার জন্য।
সেই থেকে প্রতি মাসে দু’একবার জেরিন প্রবর্তকের পাহাড়ে যায়। প্রবর্তক স্কুলের দুইটি হোস্টেল রয়েছে ওখানে। আর পুরনো হোস্টেলে সিঁড়ির তলায় স্যাঁতস্যাঁতে, অন্ধকারাচ্ছন্ন একটু জায়গা পুতুল টিচারের জন্য বরাদ্দ। ধীরে ধীরে স্কুল ও হোস্টেলের অনেকে জেরিনকে চিনে নেয়। তাকে উঠতে দেখলেই বলে উঠে, ‘পুতুলদির ছাত্রী এসেছে। টিচারের মর্যাদার কথা ভেবে কাউকে কোন প্রশ্ন করে না জেরিন। কিন্তু সময়ের আবর্তে জেনে যায় এক নারীর চরম মর্মবেদনার কথা।
পুতুল টিচারের আসল নাম স্বর্ণলতা চক্রবর্তী। মূলত তিনি আর্ট শেখাতেন স্কুলে। ব্রাহ্মণ পরিবারে তার জন্ম। অত্যন্ত রূপসী পুতুল টিচারের ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। চমৎকার ছবি আঁকতেন। উড়ন্ত পাখি দেখে এঁকে ফেলতেন তিনি। কত সুদর্শন তরুণ তার জন্য উদগ্রীব ছিল। কিন্তু তিনি মনেপ্রাণে ভালবাসতেন এক ডাক্তারকে। সেই ডাক্তার যখন প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে পুতুল টিচারকে ছেড়ে গেল, প্রচণ্ড আঘাতে মুষড়ে পড়লেন তিনি। জীবনে কোনদিন আর কোন পুরুষের দিকে চোখ তুলে তাকাননি। নিজের একাকীত্ব নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সিঁড়ির অন্ধকারে। শোনা গেছে, পাকিস্তানি বর্বরেরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কেমন করে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে এসেছেন, সেটা অবশ্য কেউ ঠিকমত বলতে পারেনি। নিজের মধ্যে নিজেকে বন্দী করে তিনি যেন এই পাহাড়ের ফুল, পাখি ও গাছের সাথে নিবিড় হয়ে গেছেন জেরিনের ইচ্ছে করে এই অসাধারণ মানুষটিকে বুকের মধ্যে রেখে দিতে। কিন্তু তাও কি কখনো সম্ভব? জেরিনের সংসার কি ব্রাহ্মণ পুতুল টিচারকে মেনে নিতে পারবে? তাই প্রতিমাসে দু’একবার করে টিচারকে দেখতে আসে।
জেরিন এলেই পুতুল টিচার আনন্দে উচ্ছ্বাসিত হয়। জগতের যাবতীয় নালিশ ছাত্রীর কাছে জানাতে একটুও ভুল হয় না তার। আর ছাত্রীও সামান্য টাকার সাথে এটা ওটা নিয়ে আসে। প্রত্যেকবার টিচারের নানা রকম আব্দার থাকে। আর দিনের পর দিন সেই আব্দারের লিস্ট কেবল বাড়তেই থাকে। প্রবর্তক স্কুলের টিচারেরা হাসে আর বলে, পুতুলদি, তুমি এত কিছু চাইলে তোমার ছাত্রী আর দেখতে আসবে না। জেরিন মাথা নেড়ে বলে ‘না, না মিস, আমি আসবো। আপনার আর কি কি লাগবে? বিশাল লিস্টের কিছু কিছু আব্দার পূরণের চেষ্টা করে জেরিন।
একবার অন্যান্য আবদারের সাথে একটা রেডিও চেয়ে বসলেন পুতুল টিচার। জেরিন জানতে চাইল, ‘রেডিও দিয়ে কি করবেন?’ টিচার বলল, ‘আমি গান শুনব’। জেরিন হাসল। কিন্তু রেডিওর কথা মনেই রাখল না। এরপরের মাসে রেডিওর কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিল টিচার। জেরিন চলে আসার সময় বলল যে রমজান মাসে ব্যস্ত থাকবে বলে একেবারে ঈদের পরেই দেখা হবে। টিচার সায় দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, তবে বেশি দেরি করো না। ঈদ শেষ হলেই আসবে।’
নানা ঝামেলায় প্রায় দেড় মাস পার হয়ে যায়। রমজান ও ঈদ শেষে জেরিন টাকা ও খাবারসহ পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগল। তাকে দেখে দারোয়ান এগিয়ে এসে বলল, ‘পুতুলদির খুব অসুখ’। জেরিন উদ্বিগ্নকণ্ঠে বলল, ‘আমাকে কেউ জানায়নি কেন? মোবাইল নম্বরতো টিচারের কাছে আছে’। দারোয়ান বলল, ‘দিদিমণি ফোন করতে চাইছিল। পুতুলদি বলেছে আপনি দেরিতে আসবেন বলেছেন। ফোন দিলে যদি বিরক্ত হন।’ জেরিন বলে উঠল, ‘আশ্চর্য ব্যাপার! অসুখ হলে ফোন করবে না? বিরক্ত কেন হব?’ দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল জেরিন। পথে হোস্টেলের কয়েকজন মেয়ের সাথে দেখা। সবাই বেশ উদ্বিগ্নকণ্ঠে বলতে লাগল-‘পুতুলদির বেশি অসুখ। ডাক্তার বলেছে বাঁচে কিনা ঠিক নেই।’ জেরিন এক প্রকার ছুটতে শুরু করল।
অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণায় জুবুথুবু শুয়ে থাকা পুতুল টিচারকে দেখে জেরিনের বুক ধক্‌্‌ করে উঠল। বোটকা একটা গন্ধ নাকে ঝাপ্টা মারল। সেই গন্ধকে অগ্রাহ্য করে ডেকে উঠল জেরিন, ‘মিস, আপনি জেগে আছেন?’ জেরিনের পিছু নিয়ে হোস্টেলের কয়েকটা মেয়ে এসেছিল তাদের পুতুলদিকে দেখতে। সবাই নাকে ওড়না চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জেরিন টিচারের গায়ে হাত রেখে বলে উঠল, ‘মিস বেশি খারাপ লাগছে? আমাকে ফোন দেন নি কেন?’ পুতুল মিসের কোন সাড়া নেই। উদ্বিগ্ন জেরিন মোবাইলের টর্চ জ্বেলে টিচারের মুখটা দেখার চেষ্টা করে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চোখজোড়া ধীরে ধীরে খুলে পুতুল টিচার ঠোঁট নেড়ে বললেন, “আমার রেডিও?” বিব্রত জেরিন অপরাধী কণ্ঠে বলল, ‘সরি মিস, আমার মনে ছিল না।’ পুতুল টিচার চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললেন। বারবার ডেকেও যখন জবাব পাওয়া গেল না, উপস্থিত সবাই তটস্থ হয়ে উঠল। হোস্টেলের ডাক্তারকে ডাকা হল। আর জেরিন টিচারকে দেখার জন্য মেয়েগুলোকে অনুরোধ করে বেরিয়ে গেল ছুঁটতে ছুঁটতে।
এক ঘণ্টা পর জেরিন যখন পাহাড়ে ফিরে এলো, দারোয়ান তাকে দাঁড় করিয়ে বলল, ‘পুতুলদি তার ঘরে নেই।’ দম বন্ধ করে জেরিন জানতে চাইল, ‘নেই মানে?’ দারোয়ান জানাল যে অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়াতে পুতুল টিচারকে নতুন হোস্টেলে মেয়েদের একটা রুমে নিয়ে গেছে। উদ্ভ্রান্তের মত জেরিন ছুঁটতে লাগল হোস্টেলের দিকে। তার মনেই রইল না যে হুট করে হোস্টেলে ঢুকে পড়ার নিয়ম নেই। আর দারোয়ান তাকে থামাতে গিয়েও থামাল না।
জেরিনকে দৌড়ে ঢুকতে দেখে এক মেয়ে দোতলা থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘পুতুলদি এখানে আছে’। প্রতি মাসে জেরিনকে দেখতে দেখতে সবাই ওকে আপন করে নিয়েছিল। হয়ত সেজন্যই তাকে বাধা দেয়ার কথা কারুর মনে আসেনি। দোতলায় সিঁড়ির পাশের রুমটিতে পুতুল টিচারকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনেকে। ডাক্তার পালস দেখা শেষ করে প্যাড টেনে লিখতে শুরু করলেন। জেরিন টিচারের গায়ে হাত রেখে ধীরে ধীরে বলল, ‘মিস, শুনতে পাচ্ছেন?’ ক্লান্ত চোখ জোড়া একবার খুলে আবার বন্ধ করে ফেললেন পুতুল টিচার। ডাক্তার বলে উঠলেন, ‘হাসপাতালে নিতে হবে’। জেরিন ব্যাগ থেকে একটি রেডিও বের করে টিচারের হাতে দিয়ে বলল, ‘মিস, আপনার রেডিও এনেছি’।
ধীরে ধীরে চোখ খুললেন পুতুল টিচার। শীর্ণ দুহাত দিয়ে রেডিওটা আঁকড়ে ধরলেন তিনি। নির্মল হাসিতে ভরে উঠল তার মুখ। এরপর পরম শান্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করে বিড়বিড় করে কি যেন বলতে লাগলেন। খানিকটা ঝুঁকে জেরিন শুনতে পেল পুতুল টিচারের নতুন আব্দার, ‘আমাকে একটা হরলিক্স কিনে দেবে? একটা ভ্যানিটি ব্যাগ…’। হাত রাখল জেরিন টিচারের মাথায়। কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়া নক্ষত্রের দিকে পুরো আকাশটা যেন তাকিয়ে রইল পরম মমতায়। আর জানালা গলে ঢুকে পড়া রোদের ঝিলিক পুতুল টিচারের মুখখানিকে আশ্চর্য রকম জ্যোতির্ময় করে তুলল।

x