এক বিকেলের গ্লানি

বিচিত্রা সেন

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:৩২ পূর্বাহ্ণ
21

বেশ কিছুদিন যাবৎ শরীরটা খুব খারাপ আরতি রায়ের! তাই মন মেজাজ সবসময় বিগড়ে থাকে তাঁর। তেমনি একদিন বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে গিয়ে বসেছেন ডিসি হিল পার্কে। বিষাদমাখা রোদ্দুরে বড় বড় রেইনট্রির নিচে বসে তিনিও যেন অমলকান্তির মতো প্রাণপণে রোদ্দুর হতে চাইছিলেন। ঠিক তখুনি কানের কাছে কী যেন অস্পষ্ট শুনতে পেলেন তিনি ভীষণ উদাসীন থাকায় মনকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সময় লাগলো তাঁর, তারপর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে অবাক হলেন। তাঁর পাশ ঘেঁষেই বসে আছে এক তরুণ। সেই তরুণই যেন অস্পষ্টভাবে কিছু উচ্চারণ করেছিল তাঁকে উদ্দেশ্য করে।মন খারাপের এই তীব্র বিষাদমাখা বিকেলে এমন অনাহুতের উপস্থিতিতে খুব বিরক্ত হলেন তিনি,চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি ছড়িয়ে বললেন,” আমায় কিছু বললেন? কে আপনি?” তাঁর বিরক্তিকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে খুব সপ্রতিভভাবেই সে উত্তর দিল,”রুদ্র।” আরতি রায় কপাল কুঁচকে বললেন,”আমি কি আপনাকে চিনি? এভাবে আমার পাশে এসে বসেছেন কেন? এত বড় পার্কে তো জায়গার অভাব নেই!”
রুদ্র নামের ছেলেটি খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো,
“খারাপ কোনো উদ্দেশ্য নেই।জাস্ট আপনার সাথে কথা বলতে এলাম।সাধারণত আপনার বয়সী মহিলারা তো পার্কে আসে হাঁটতে।কিন্তু আপনি কাল এবং আজ দু’দিনই পার্কে এসে কোনোদিকে না তাকিয়ে,কারো সাথে কথা না বলে এ জায়গাটায় এসে বসে পড়লেন,এবং দুদিনই লক্ষ্য করলাম, আপনি গভীর বিষণ্নতায় ডুবে গিয়ে একদৃষ্টিতে পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।আপনি কি কোনো কারণে হতাশায় ভুগছেন?”খুব অবাক হলেন আরতি রায় অপরিচিত এই তরুণের গায়ে পড়া স্বভাব দেখে। ছেলেটা যদিও খারাপ কিছু বলেনি,তবুও কেন যেন প্রচণ্ড রাগ হলো ওর উপর।চেনে না,জানে না, অমনি এক অপরিচিত মহিলাকে একা পেয়ে ভাব জমাতে চলে এলো! আশ্চর্য এদের জন্য কি কোনো মহিলা এ সমাজে দুদণ্ড একা কোথাও সময় কাটাতে পারবে না? ও তো দেখতেই পাচ্ছে তিনি কোনো তরুণী নন,তাহলে তাঁর সাথে এত ভাব জমানোর চেষ্টা কেন বাপু!তাঁর সাথে এমন গায়ে পড়া আচরণ করছে,না জানি কিশোরী কিংবা তরুণী দেখলে কেমন করে! মনে মনে ভাবলেন, একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে ছেলেটাকে,তাই কণ্ঠে যতটা পারেন ব্যঙ্গ ঢেলে বললেন,” আপনি কি বাংলাদেশের যাবতীয় একা চলা মহিলার এভাবে খোঁজ খবর নেন?” ছেলেটা,যার নাম রুদ্র, আরতি রায়ের ব্যঙ্গ ধরতে পারলো, না পারার তো কোনো কারণ নেই, কারণ তিনি কণ্ঠে যতটা পারেন শ্লেষ মিশিয়েছেন।ধরতে পেরেও সে খুব একটা গা করলো না তাতে, বললো,” হুম ,তা বলতে পারেন মোটামুটি। আমি আপনার মতো এরকম কোনো শিক্ষিতা মহিলাকে রাস্তাঘাটে একা চলতে দেখলে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসি।”
মনে মনে হাসলেন আরতি রায়,বাহ্‌! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হয়েছে এ তরুণ।নারীকুলের রক্ষাকর্তা সেজেছে! তিনি স্বরকে কঠিন করে বললেন,” ধন্যবাদ। আপনার সহায়তা আমার লাগবে না।আমাকে একটু একা থাকতে দিন প্লিজ। রুদ্র বললো,”আচ্ছা।” বললো বটে, কিন্তু আরতি রায়ের পাশ থেকে উঠলো না।আরতি রায় ওকে প্রাণপণে ‘ইগনোর’ করতে চাইলেন,কিন্তু অসুস্থ শরীর মেজাজকে খিটখিটে বানিয়েছে অনেক আগেই।তাই তাঁর পাশে রুদ্রের উপস্থিতি তাঁকে ক্রমান্বয়ে উন্মত্ত করে তুলছিলো।একবার ভাবলেন উঠে যাবেন,পরক্ষণেই মনে হলো তিনি উঠে গেলে ছেলেটা ভাববে তিনি ওকে ভয় পেয়েছেন। এদিকে ডি.সি. হিলে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে পাতার ফাঁকে ফাঁকে।রুদ্রের দিকে নজর দিতে গিয়ে কখন যে তাঁর অমলকান্তি মার্কা রোদ উধাও হয়ে গেছে খেয়ালই করা হয়নি।চারপাশের লোকজন ততক্ষণে ঘরমুখো। আরতি রায়ের মনে হলো,এবার বুঝি তিনি একটু একলা থাকতে পারবেন, নিশ্চয় এই ছেলেটিও এবার ঘরে ফিরবে।কিন্তু সন্ধ্যা সরে গিয়ে রাতকে নামিয়ে আনলেও ছেলেটির জায়গা ছাড়ার কোনো লক্ষণ দেখতে পেলেন না তিনি।মশার আদিখ্যেতায় পা ঝুলিয়ে বসা দায় হলো,তাই পা দুটোকে আসন করে বসে শাড়ির নিচে আড়াল করতে চাইলেন আরতি।সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি বলে উঠলো,” আজ আর না,এবার বাসায় যান।চলুন,আপনাকে পৌঁছে দিই।ছেলেটির ধৃষ্টতা দেখে আরতি রায় হতবাক হয়ে গেলেন।ও কি তাঁকে তরুণী ভেবেছে? কোন সাহসে সে তাঁকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে? কোন স্পর্ধায় সে বিকেল থেকে তাঁর পাশ ছাড়া হয়নি? এরকম যেচে আলাপ করা ছেলেদের কোনোকালেই তিনি পছন্দ করতেন না,তাই ইচ্ছে হলো কষে একটা চড় মারতে ওর শ্যামলা পাতলা গালে,কিন্তু এর পরবর্তী কর্মফলের কথা ভেবে হাতটা গুটিয়েই রাখলেন।তারপর ছেলেটার দিকে ফিরে সোজাসুজি চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,এবং বলতে গিয়ে এবার ইচ্ছে করেই তুমিতে নেমে আসলেন,
”আশ্চর্য! তুমি সীমা ছাড়াচ্ছো কেন? আমার সাথে তোমার চেনা নেই, জানা নেই,অথচ সেই বিকেল থেকে তুমি আমার পাশ থেকে নড়ছো না। আমাকে এভাবে বিরক্ত করছো কেন? বলতে গেলে তুমি আমার ছেলেরই বয়সী, হয়তো ওর চেয়ে কয়েক বছর বড় হবে,কিন্তু মায়ের বয়সী এক মহিলাকে বিরক্ত করতে তোমার লজ্জা লাগছে না?” রুদ্র আবছা আলোয় আরতি রায়ের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলো,তারপর বললো,” মায়ের বয়সী বলেই তো লজ্জা পাচ্ছি না। দেখি, উঠুন তো,বাসায় চলেন। আমি আপনাকে আপনার বাসায় পৌঁছে দেবো।এভাবে এতরাতে এখানে বসা ঠিক হবে না।” তারপর একটু থেমে বললো, “আর কিছু না হোক,জঙ্গল থেকে সাপ নেমে আসতে পারে।” সাপের কথা বলার সাথে সাথে পিঠের শিরদাঁড়া বরাবর যেন একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেলো আরতি রায়ের,বিষণ্নতা এবং ক্রোধ যেন ভীতির কাছে হার মানলো।যদিও রুদ্রকে সেটা বুঝতে দিলেন না,তবুও অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালেন এবং হাঁটাও শুরু করে দিলেন।তাঁর পাশাপাশি রুদ্রও হাঁটছিল। নিচে নেমে তিনি রিক্সা ডাকতেই রুদ্রও তাঁর সাথে উঠতে চাইলো রিক্সায়। আরতি রায় ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,” তুমি কোথায় যাচ্ছো? আমার সাথে তোমাকে যেতে হবে না। আমি একাই চলতে পারি।” রুদ্র অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আরতির দিকে তাকিয়ে বললো,” আপনি বাসায় যাবেন তো? অন্য কোথাও চলে যাবেন না তো?” আরতি রায় আসলেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না রুদ্রকে।এ ছেলে তাঁর পিছু লেগেছে কেন? ও কী চায় তাঁর কাছে? তাঁকে বাসায় পৌঁছে দিতে ওর এত আগ্রহ কেন? তিনি ওর চোখে চোখ রাখলেন,গভীরভাবে পড়ে নিতে চাইলেন ওর দৃষ্টি, কিন্তু কেন যেন মনে হলো ওর চোখে নেই কোনো অসৎ বাসনা,বরং রয়েছে অপরিসীম উৎকণ্ঠা।
ওর দৃষ্টির কারণে কিনা জানি না, হঠাৎ করেই রুদ্রের প্রতি কণ্ঠটা নরম হয়ে গেলো আরতি রায়ের। বললেন “তুমি কি আমাকে বলবে, আসলেই তুমি কে?আমাকে নিয়ে এত ভাবছোই বা কেন?”
রুদ্রের চোখে কি একটু জল দেখতে পেলেন আরতি!একটু কি ঠোঁট কেঁপে উঠলো ওর! কিন্তু তেমনটাই মনে হলো তাঁর। ততক্ষণে রুদ্র নিজেকে সামলে নিয়েছে, বললো,
–আসলে আমার মায়ের কথা মনে পড়েছিল আপনাকে দেখে। আমার মা হারিয়ে গেছে দু’বছর আগে।
–হারিয়ে গেছেন মানে মারা গেছেন? আরতি রায় কিছুটা শঙ্কা নিয়ে বললেন।
— না,ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে।বেরিয়ে যাবার আগে একমাস ধরে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিল মা।ডাক্তার বলেছিলেন উনাকে খুব চোখে চোখে রাখতে।কিন্তু তখন আমরা সবাই নিজেকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম মায়ের দিকে অতটা নজর দিইনি।একদিন বাইরে থেকে বাসায় ফিরে দেখি মা বাসায় নেই। বাসার অন্যরা জানেও না মা কখন বেরিয়ে গেছে। এরপর অনেক খুঁজেছি মাকে।পেপারেও দিয়েছিলাম। কিন্তু এখনো পর্যন্ত মাকে আর পাইনি।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললো রুদ্র।
আরতি রায় স্তব্ধ, এমনকিছু শোনার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না মোটেও।রুদ্র আবারও বললো,
–গতকাল আর আজকে আপনার মধ্যে আমি যেন আমার মাকেই দেখতে পেলাম। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আগে মাও আপনার মতো একা একা একদিকে তাকিয়ে বসে থাকতো। তখন বুঝিনি,কিন্তু মা চলে যাবার পর বুঝি মায়ের দরকার ছিল আমাদের সঙ্গ,ভালোবাসা।তাই আপনাকে দেখে মনে হলো আপনিও মায়ের মতো নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন।মনে হলোআপনার পরিবারে গিয়ে আমি এসব কথা বলি।

রুদ্র যখন কথাগুলো বলছিল,তখন ওর চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল তীব্র আত্মগ্লানি।
ওর সেই গ্লানিমাখা মুখ আরতি রায়ের দু’চোখকেও কখন যে অশ্রুসিক্ত করে দিয়েছে তা তিনি টেরই পাননি।
একটু আগেই তিনি ছেলেটা সম্পর্কে যাচ্ছেতাই ভাবছিলেন,তার চরিত্র নিয়েও শংকিত ছিলেন,অথচ বুঝতেই পারেননি তাঁরই চোখে বখে যাওয়া তরুণটি তখন তাঁরই কথা ভেবে উৎকণ্ঠিত হয়ে তাঁরই পাশে অবস্থান নিয়েছিলো। নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছিলো আরতির,রুদ্রের গ্লানি কি তবে তাঁকেও স্পর্শ করলো!তিনি কি রুদ্রকে বলবেন তাঁর সাথে যেতে?
নাগরিক মনের দ্বিধা-সন্দেহ কাটতে সময় লাগে।তবুও সব দ্বিধাকে ঝেড়ে ফেলে আরতি রায় রুদ্রকে বললেন,” চলো,আমাদের বাসায় চলো।” রুদ্র মুচকি হাসলো,তারপর কী যেন ভেবে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,” না,আজ না।আরেকদিন।” বলেই হনহন করে হেঁটে মোমিন রোডের দিকে চলে গেলো। ওর চেল যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আরতি রায় টের পেলেন তাঁর ঘর তাঁকে ডাকছে।তাঁর রুদ্রও হয়তো এতক্ষণে মায়ের খোঁজে পথে নেমেছে, কারণ তিনি তো আসার সময় ইচ্ছে করে মোবাইল ফোনটিও বাসায় রেখে এসেছেন।

x