এক খেতে সরিষা-মধু

শুক্রবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ
92

নাটোরে সরিষার বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। সেই সঙ্গে একই ক্ষেত থেকে পাচ্ছেন মধুও। কৃষি বিভাগ বলছে, আবহাওয়া ভালো থাকলে এবং ভালোয় ভালোয় ফসল ঘরে তুলতে পারলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে এবার। পাশাপাশি সরিষা ফুলের জমি থেকে মৌ চাষিরা চার টনেরও বেশি পরিমাণ মধু আহরণ করেছেন।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে অর্জিত হয়েছে ৬ হাজার ২২৯ হেক্টর। গত বছর অর্জিত হয়েছিল ৩ হাজার ২১১ হেক্টর। এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮৩১ মেট্রিক টন। সেখানে সম্ভাব্য উৎপাদন হবে ৭ হাজার ৪৭৪ মেট্রিক টন সরিষা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার বৃদ্ধি পাবে সম্ভাব্য ৩ হাজার ৬১৭ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে মোট উৎপাদন হয়েছিল ৩ হাজার ৮৫৭ মেট্রিক টন। খবর বাংলানিউজের।
সূত্র আরো জানায়, এবার সদর উপজেলায় ১ হাজার ৫০ হেক্টর, নলডাঙ্গায় ৫৪৪ হেক্টর, সিংড়ায় ৩ হাজার হেক্টর, গুরুদাসপুরে ৭৫৫ হেক্টর, বড়াইগ্রামে ৩৮৫ হেক্টর, লালপুরে ২৫৫ হেক্টর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় ২৪০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, সরিষা রোপণ করা থেকে কাটা পর্যন্ত ৭৫ থেকে ৮০ দিন সময় লাগে। প্রচলিত স্থানীয় টোরি-৭ জাতের সরিষার আবাদ সর্বাধিক। এই জাতের সরিষার জীবনকাল তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। তাই কৃষকরা এই সরিষা আবাদ করে খুব সহজেই বোরো ধান রোপণ করতে পারেন। পাশাপাশি চলতি মৌসুমে নতুন ও উন্নত বারি সরিষা-১৪ ও ১৫ এবং বিনা-৯ জাতের সরিষা আবাদ হয়েছে। এসব সরিষার জীবনকাল একটু বেশি হলেও ফলন বিঘা প্রতি সাড়ে ছয় থেকে সাত মণ পর্যন্ত।
জেলা কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ আরো জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় জেলায় আড়াই হাজার কৃষকের জমিতে সরিষার প্রদর্শনী খামার স্থাপন করে তাদের বীজ, সার ও সেচ সুবিধা দেওয়া হয়।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কোথাও ফুল ধরেছে আবার কোথায় ফল ধরেছে। যে সমস্ত কৃষক আগাম চাষাবাদ করেছেন, তারা ইতোমধ্যে ফসল কাটতে শুরু করেছেন। তবে পুরোদমে ফসল ঘরে তুলতে আরো অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লেগে যাবে।
নলডাঙ্গা উপজেলার হলুদঘর গ্রামের কৃষক আজাহার আলী জানান, বন্যার পানি এবার আগেই নেমে যাওয়ায় তিনি আগেভাগেই এক বিঘা জমিতে সরিষা বীজ বপন করেছিলেন। তার ফসল কাটার উপযোগী হয়েছে। একই গ্রামের কৃষক সমজান আলী জানান, এবার মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া ভালো ছিল। তাই তার ফসলও বেশ ভালো হয়েছে। আশাকরি বাম্পার ফলন হবে।
অপরদিকে গুরুদাসপুর উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম ২০ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ১৮ বিঘাতে টোরি-৭ এবং দুই বিঘাতে বারি সরিষা-১৪ এর প্রদর্শনী খামার স্থাপন করেছিলেন। ইতোমধ্যে উভয় জাতের সরিষা কাটা ও শুকানো কার্যক্রম শেষ করেছেন তিনি। ফলন পেয়েছেন টোরি-৭ জাতের বিঘা প্রতি সাড়ে পাঁচ মণ এবং বারি সরিষা-১৪ সাড়ে ছয় মণ করে।
জমিতে উৎপন্ন সরিষার বিক্রয় কার্যক্রমও শেষ করেছেন শফিকুল ইসলাম। এক হাজার ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে উৎফুল্ল শফিক বলেন, লাভজনক বলে গত ১২ বছর ধরে সরিষা আবাদ করছি। বিঘা প্রতি চার হাজার টাকা উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলে মুনাফা হয়েছে চার হাজার ২০০ টাকা।
এদিকে শুধু সরিষা চাষই নয়, সরিষার জমি থেকে মধু আহরণও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে মধু আহরণই নয়, সরিষা ফুল থেকে মৌমাছির মধু সংগ্রহকালে পরাগায়নের হার বাড়ে। তাই সরিষার ফলন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গুরুদাসপুর উপজেলার মৌচাষি আব্দুল করিম এবার সরিষার জমিতে ১৭০টি মৌবাক্স স্থাপন করেছিলেন। মধু পেয়েছেন ৩৫ মণ। এই মধু খুচরা ২০০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করছেন বলে জানান তিনি।
জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে তিনটি উপজেলার ১০৭ হেক্টর সরিষার জমিতে মোট ৫২০টি মৌবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল। এসব মৌবাক্স থেকে সোয়া চার টন মধু পাওয়া গেছে।
জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম জানান, অল্প খরচে অনায়াসলব্ধ সরিষা উৎপাদনে মুনাফার পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে এই জমিতে মৌবাঙ স্থাপনের ফলে মধু আহরণ ছাড়াও ফুলের পরাগায়নে ফলন বৃদ্ধি পায়।
কৃষি বিভাগের প্রণোদনা এবং প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের কারণে জেলার কৃষকরা সরিষা চাষে বেশি আগ্রহী হয়েছেন।

x