একলা রাতে ভূতের সাথে

ফাইরোজ আয়মান নিটোল

বুধবার , ১ আগস্ট, ২০১৮ at ৯:১০ পূর্বাহ্ণ
100

৩২,১২৪

ছোটবেলায় মামাবাড়ি গেলে সবাই গোল করে বসে মেঝমামার কাছে ভূতের গল্প শুনতাম। আমদো ভূত, মামদো ভূত, মেছো ভূত, গেছো ভুত। কতো জাতের ভূত যে আছে। সব ভূতের সাথে মেঝমামার বন্ধুত্ব ছিল। এ পর্যন্ত যতগুলো ভূত মেঝমামাকে ভয় দেখাতে এসেছে সবগুলো ভূত মামার বন্ধু হয়ে গেছে। মেঝমামা গল্পগুলো এমনভাবে বলতো, ভূত যেন ভয় পাবার কিছু নয়, ভূত হলো প্রিয় বন্ধু। পিচ্ছিরা মিছেমিছি ভূতকে ভয় পায়। মামা যতই বলুক, ভূতের গল্প শুনে রাতে ঘুমুতে গেলেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতো। আম্মুকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরে ঘুমালেও রাতে কে যেন হাতটা টেনে নিয়ে খাটের নিচে নিয়ে যেতো। চিৎকার করে ডাকলেও মাবাবা কেউ আমার ডাক শুনতে পেতো না। সারারাত কান্না করতাম। কেউ আমাকে বাঁচাতে আসতো না। সকালে উঠে সে কথা বললে সবাই হাসাহাসি করতো।

আজ মেঝমামা নেই। এখন আর কেউ ভূতের গল্পও বলে না। কিন্তু ভূত দেখার ইচ্ছেটা এখনো মনের মধ্যে গেঁথে আছে। মেঝমামা এমনভাবে বলতো, যেন মামা ভুতের সাথেই প্রতিরাতে ঘুমাতো। তাই মনে মনে ভাবতাম, ইস্‌ একদিন যদি ভূতের দেখা পেতাম!

অনেক অনেক দিন পর মামার বাড়ি গেলাম। মেঝমামা নেই। মেঝমামার জন্যে মনটা হু হু করে উঠলো। পুরো মামাবাড়ি জুড়ে মেঝমামার স্মৃতি। শুধু হাসিখুশি মাখা মামাটি নেই। মামার মুখে ভূতের গল্প শুনতে খুব ইচ্ছে করল। সেই ইচ্ছে পুরণ না হওয়ার কষ্ট নিয়ে খেয়ে ধেয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

রাত তখন ক’টা বাজে জানি না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। মামাবাড়ির কলিং বেলটা বেজে উঠলো। চোখ মেলে তাকাই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোথাও কোন শব্দ নেই। মনের ভুল ভেবে আবার চোখ বুঁজে ফেলি। চোখে ঘুম লেগে আসে। আবার কলিং বেল বাজার শব্দ। আবার চোখ মেলি। আবার দু’চোখ ঘিরে অন্ধকার। বুকটা ধক্‌ করে উঠলো। বিছানা ছেড়ে উঠলাম। বাতি জ্বালালাম। রাত দু’টো। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে গলা ভিজালাম। এত রাতে কে কলিং বেল বাজালো? পাশের রুমে গিয়ে মাকে জাগালাম। মা জাগলো। বাবা জাগলো। বড় মামী জাগলো। মেঝ মামী জাগলো। নিঝুম আপু জাগলো। জাগলো নিবিড় আপুও। নোলক, নোটন সবাই জাগলো। না, কলিং বেল বাজার শব্দ শোনেনি। ব্যাপার কি? কেউ কিছু শুনলো না। তাহলে আমার কানে কলিং বেলের শব্দটা কোত্থেকে এলো? সবাই বললো, স্বপ্ন দেখেছি। মা ও বড় মামী দোয়াদরুদ পড়ে মাথায় ফু দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বললো। কিছুই না বুঝে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। আবার চোখ লেগে এলো। আবারো কলিং বেলের শব্দ। চোখ মেললাম। রুমের বাতি জ্বালানো। ঘড়ির দিকে চোখ গেলো। রাত আড়াইটা। বিছানায় উঠে বসলাম। কলিং বেলটা আবার বেজে উঠলো। না, এবার স্বপ্ন নয়, সত্যিই সত্যিই কলিং বেল বাজছে। রুমের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াতেই একটি ভয় পাওয়া মেয়ের গলা। প্লিজ দরজাটা একটু খুলুন। এখন কাউকে ডাকবেন না। হৈ চৈ পড়ে যাবে। আপনি দরজাটা খুলে আমাকে একটু ভেতরে আসতে দিন। আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সব খুলে বলবো। প্লিজ দরজাটা একটু খুলুন।

আমি অদ্ভুত এক সম্মোহনী টানে কাউকে না ডেকে দরজাটা খুলে দিলাম। দরজা খুলতেই একটা ফুটফুটে মেয়ে আমাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে সোজা আমার শোবার রুমে গিয়ে চলে গেলো। আমি দরজা বন্ধ করে রুমে এসে দেখি মেয়েটি মিটিমিটি হাসছে। হাসিতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে। ইয়া লম্বা চুল। পরণে শিউলি ফুল আঁকা সুন্দর একটি জামা।

আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটি জানতে চাইলো, কেমন আছেন নিটোল?

আমি চমকে উঠলাম। তুমি আমার নাম জানলে কি করে?

আপনার মেঝমামা বলেছে।

আমার মেঝমামাকে তুমি কোথায় পেলে?

আমি আপনার মেঝমামার বন্ধু।

মেঝমামার বন্ধু মানে?

আমি আপনার মেঝমামার ভূতবন্ধু। আপনার মেঝমামা বললো, আপনার খুব ইচ্ছে ভূত দেখার। তাই আপনার সাথে দেখা করতে এলাম। আজ সারারাত আপনার সাথে গল্প করবো।

আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। কি করবো বুঝতে পারছি না। এমন সময় আবার কলিং বেলটা বেজে উঠে। মেয়েটি আমার পথ আগলে দাঁড়ায়। প্লিজ দরজাটা খুলবেন না। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।

ওরা কারা?

কিছু বদ ভূত। ওরা চায় না, আমরা মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করি। আপনার মামার সাথে বন্ধুত্ব করার কারণে ওরাই আপনার মামাকে মেরে ভূত বানিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে আমাদের ভূত সমাজ থেকে বের করে দিয়েছে।

আবার কলিং বেলটা বেজে উঠলো। আবার বাজলো। আবার। এবার দরজা ভেঙে ফেলার অবস্থা। শেষমেশ দরজা খুলতেই হলো। দরজা খোলার সাথে সাথে মেয়েটি বেরিয়ে গেলো। তার পেছনে পেছনে ছুটে গেলো আরো কয়েকজন। সবাই অন্ধকারে হারিয়ে গেলো।

x