একদল শিশু মুক্তিযোদ্ধার কথা

মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছিলেন এটাই তাদের গর্ব

মাহবুব পলাশ : মীরসরাই

সোমবার , ২৪ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
29

বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দেশের লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগের সাথে লক্ষ লক্ষ মানুষের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার ইতিহাসও রয়েছে। শিশু কিশোর থেকে প্রবীণ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পর্যন্ত অসংখ্য নারী-পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আড়ালে আবডালে গোপনে লুকিয়ে সহযোগিতা করার গল্প দেশের প্রতিটি এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের গল্পে বিদ্যমান। ঠিক তেমনি মীরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর এলাকার একদল শিশু কিশোরের গল্প এটি। এ নিয়ে তাঁদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। শুধু গর্ববোধ করেন দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য কিছু করতে পেরেছিলেন বলে।
৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যাবে ৬ দফার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের ঘোষণা এলো। রেডিওতে এই ঘোষণা শুনে মীরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পূর্ব দুর্গাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণির ছাত্র যথাক্রমে জসিম উদ্দিন (১০), জয়নাল আবেদিন (১০), আবুল কালাম (৯), আহমদ হোসেন (১০), জহিরুল হক (১১), সুজাউল হক (১০), আহমদ উল্লাহ (১০), নিজাম উদ্দিন ( ৯), তাজুল ইসলাম (১১), আবুল কাশেম (১০) সহ একদল ছাত্র ক্লাস করবে না বলে ঘোষণা দিয়ে সকল ছাত্রদের নিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠে অবস্থান করে। কিছুক্ষণ পর বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান। তিনি ছাত্রদের এই বিশৃঙ্খলার নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের বেত এনে অনেক মারলেন। কিন্তু তবুও উল্লেখিত ছাত্ররা বললো আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েছি আমরা আজ ক্লাস করবো না স্যার। স্যার অনেক ছাত্রকে বুকে টেনে আবার আদরও করলেন। সেই শিক্ষক আব্দুল মান্নান (৬০) সহ ছাত্র আন্দোলনের শিশুরা সবাই বৃদ্ধ বয়সে গত ঈদুল ফিতরের পরদিন (৬ জুন) একত্রিত হলেন তাদের নেতা মীরসরাইয়ের বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনের বাড়িতে। সবাই স্মৃতিচারণ করলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই ছাত্র আন্দোলন ও তার পরে কে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত ভাবে সাহায্য করতো।
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন রফিকের নেতৃত্বে দুর্গাপুরের পাহাড়ি এলাকায় এলো সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের দল। মুক্তিযোদ্ধারা ইতিমধ্যে কয়েকদিন গ্রামের দিকে আসতো । এখানে মুজিবুল হক চেয়ারম্যান সহ অনেকে তাঁদের খাবার যোগান দেয়াসহ বিভিন্ন বিষয় সাহায্য করতো। কিন্তু এক পর্যায়ে মুজাহিদ বাহিনী রেললাইনে অবস্থান করায় কোনদিকে যেতে পারছিল না মুক্তিযোদ্ধারা। তখন এই শিশুরা পাহাড়ে অবস্থান করা মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহ শুরু করলো নানা কৌশলে। কেউ কয়েকটা করে গরু নিয়ে পাহাড়ে গরু চরাতে যাবার ভান করে খাবার নিতো। কেউ মাঠে কাজ করছে তাদের জন্য খাবার নিতে যাচ্ছে বলে। কিন্তু এক পর্যায়ে মুজাহিদরা গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে তাণ্ডব চালাতে শুরু করলো আবার এই শিশুদের উপর ও কড়া নজর রাখা শুরু করলে শিশুরা ছদ্মবেশে তাঁদের খবর জানালে মুক্তিযোদ্ধাদল রাতের অন্ধকারে এসে তাদের মেরে ফেললো।
এই মুক্তিযোদ্ধাদল একে একে মিঠাছরা বাজার, মীরসরাই, আবুতোরাব এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধ করে। আবার মুজাহিদ বাহিনী মিঠানালা ও রাজাপুর এলাকায় নারী-পুরুষদের হানা দেয়ার চেষ্টাকালে মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার অহিদুল হক এর নেতৃত্বে বামনসুন্দর সড়কে চলে মুজাহিদ নিধন অপারেশান। ১লা অক্টোবর দুর্গাপুর হাইস্কুলের মাঠে নায়েক আবুল কালাম আজাদ এর নেতৃত্বে যুদ্ধে অনেক মুজাহিদকে পরাস্ত করে দুর্গাপুর এলাকাকে শত্রুমুক্ত করা হয়।
উল্লেখিত শিশু কিশোর দল এইসব এলাকায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছে নানাভাবে। দিনভর ঘুরে বেড়ানোর ভান করে মুজাহিদদের অবস্থানের নানা তথ্য খাবার ইত্যাদি পৌঁছে দিতো মুক্তিযোদ্ধাদের। এইসব শিশুদের অনেকেই আজো আছেন। এখনো তখনকার বন্ধুদের একত্রিত হবার আড্ডায় উঠে আসে নানা তথ্য। এইসব গল্প বলতে এখনো সবাই শিহরিত হন। কোন চাওয়া পাওয়া নেই তাঁদের। দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছেন তাই গর্ববোধ করেন। প্রেরণা পান। এবারের ঈদের পরদিন একত্রিত হয় সবাই সহযোদ্ধা উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনের বাড়িতে। নিজেদের বন্ধু শিশুযোদ্ধা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছে এটাই তাদের গর্ব। শ্রদ্ধা এই সকল শিশু মুক্তিযোদ্ধাদের।

x