একজন শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ৫ অক্টোবর, ২০১৯ at ৮:২২ পূর্বাহ্ণ
69

৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিবসে আমার নিজের ও বিশ্বের সকল সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা পণ্ডিতরা শিক্ষা সম্পর্কে বলেছেন, Education not noly for tomrrow but also for today.
আমাদের দেশে শিক্ষকরা যদি সদা এই চিন্তা করে তাঁর পেশায় কাজ করতেন তবে স্বাধীনতার পর এই যাবৎ আমাদের দেশে শিক্ষার প্রসার ও প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা যেমন আমরা দেখতে পেতাম, তেমনি আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে আমরা সক্ষম হতাম। কিন্তু শিক্ষকরা তাদের এই মহান কাজটি যথাযথভাবে অতীতে করেননি, এখনও না। কারণ গবেষণা করতে গিয়ে আমরা যে বিষয়টির সাথে পরিচিত হয়েছি তাহল, শিক্ষককতা পেশাকে ভালবেসে কেউ আসেননি এই পেশায়। শিক্ষার সাথে সংশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আমাদের দেশে শিক্ষাকতায় আসা শিক্ষকদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিষয়টিকে দু’ভাবে ভাগ করেছেন -ক). কেউ দেখে এসেছেন এই পেশায়, খ). আবার কেউ ঠেকে এসেছেন এই পেশায়। তবে যারা এই পেশাকে ভালবেসে এসেছেন তারা অবশ্যই জীবনে প্রথম হয়েছেন এবং বিজয়ের মুকুট তাদের হাতে ছিল, আছে এবং থাকবে। (সূত্র : বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষার ক্রমবিকাশ)
একজন মহান শিক্ষকের কাজ একজন স্থপতি বা শিল্পীর কাজের চেয়েও অধিক তাৎপর্যমণ্ডিত। কারণ একজন শিক্ষকের কাছে তৈরী হচ্ছে শিল্পী, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক, কবি, সাহিত্যিক, কৃষিবিদসহ দেশ পরিচালনার মহান মানুষ। এই হিসাবে একজন শিক্ষকের মূল্য শুধূ তার এই ‘সৃষ্টির সম্মান’। শিক্ষককে তাই শিক্ষাবোদ্ধারা আখ্যায়িত করেছেন, ‘জাতির মহান কাণ্ডারী হিসাবে।’ তাই পেশা হিসাবে শিক্ষাকে অবশ্যই গুরু দায়িত্ব, জাতীয় দায়িত্ব হিসাবে মনে করতে হবে। এখানে ফাঁকির কোন সুযোগ বা স্থান নাই। আছে শুধু সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় কাজ করার মহান দায়িত্ববোধ। আর এই বিষয়টি আমাদের মধ্য থেকে যারা এই পেশায় এসেছেন তাদের উপলব্ধি করা দরকার। এই উপলব্দি নাই বলে আমাদের শিক্ষার এমন আত্মসমর্পণ। শিক্ষাবিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞরা শুধু বছর বছর শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কাজে মনোযোগী হয়েছেন। কিন্তু তারা কখনও উপলব্ধি করেনি যে, একজন শিক্ষক মানে একটি শিক্ষাব্যবস্থা।
আমাদের দেশে প্রচুর মেধাবী শিক্ষার্থী আছে যারা তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারে পৃথিবীর ইতিহাসে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই মেধাবী মানুষগুলোকে তাদের মেধা ও মননকে ব্যবহার উপযোগি করে তুলতে আমরা আমাদের শিক্ষকদের যথেষ্ট যোগ্য করে তুলেছি কিনা? এছাড়াও যারা শিক্ষক তাঁদের শিক্ষক হওয়ার মত এমন যোগ্যতা আছে কিনা? এই বিষয়গুলোও গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমাদের দেশের শিক্ষাটা আজ শুধু শুনে শিখার পদ্ধতিতে আবদ্ধ। অথচ শিখার ৩টি সু-নির্দিষ্ট পদ্ধতির কথা আমরা সদা শুনতে পাই যেমন-ক). দেখে খ). শুনে গ). করে। আমাদের শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেখে ও শুনে শিখার থেকে করে শেখার গুরুত্বটা অনেক বেশি। কারণ করে শিখে শিক্ষার্থী তার সত্ত্বা থেকে। করে শেখার গুরুত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে একটি সমান্তরাল উক্তি শিক্ষা বিভাগে খুবই জনপ্রিয়। উক্তিটি হল- “I hear and foget, I see and remember, I do and learn.
শিক্ষাবোদ্ধারা এখানে দুর্বল শিখন হিসাবে যবধৎ ধহফ ভড়ৎমবঃ কে ংবব ধহফ ৎবসবসনবৎ কে শিখন হিসাবে এবং ফড় ধহফ ষবধৎহ কে সঠিক শিক্ষা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। এখানে প্রশ্ন থাকে তাহলে এই কাজটি কে করবেন? অবশ্যই শিক্ষক। প্রশ্ন হল আমাদের শিক্ষক সমাজের কয়জন এই বিষয়টি অবগত আছেন। শতকরা ১ ভাগ হয়ত! তাহলে আমাদের শিক্ষার মান কিভাবে উন্নত হবে? প্রতিবছর আমাদের দেশ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী ভাল শিক্ষা পাওয়ার আশায় পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। কেন আমরা পারি না এই অবস্থা রোধ করতে? না পারার একটি সঙ্গত কারণ হল আমরা শিক্ষা নিয়ে যতটা না কথা বলছি তার চেয়ে এই ব্যবস্থাকে কীভাবে ধ্বংস করা যায় তা নিয়ে ব্যস্ত আছি। কারণ যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন তাদের ছেলে মেয়েরা তো আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের শিক্ষকদের পড়ালেখা গ্রহণ করছে না। তারা বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রী এনে আমাদের উপর আসীন হচ্ছে। সুতরাং তাদের তো মাথা ব্যথা হওয়ার নয় দেশের বাকী জনগোষ্ঠীর জন্য। এই বিষয়টি আমাদের সকলের উপলব্দি করা দরকার।
শিক্ষার্থী শ্রেণি কক্ষে পাঠকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে শিক্ষক থেকে যেমন আন্তরিকতাপূর্ণ ও যোগ্য পাঠদান আশা করে হতাশ হচ্ছে। তেমনি শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে নাই বললে চলে। অনেক নামী দামী প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে পাঠ্য তালিকার একটি বই পর্যন্ত পাওয়া দুস্কর। নাই নির্দিষ্ট একটি জ্যামিতি বক্স বা শিক্ষা সংশিষ্ট একটি উপকরণ। অথচ শিক্ষার্থীর পঠিত বা ক্লাসে যে বিষয়ের ওপর পাঠ দেয়া হবে সেই বিষয়ের উপর প্রয়োজনীয় পাঠ উপকরণ ছাড়া শিক্ষা দিলে তা যথার্থ শিক্ষা হবে না। শিক্ষার্থী কিভাবে শিখে এই প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদদের মত হল, ‘ক). শিক্ষার্থী দেখে শিখে ৮৩%, খ). শিক্ষার্থী শুনে শিখে ১১%, গ). শিক্ষার্থী গন্ধ নিয়ে শিখে ৩% ঘ). শিক্ষার্থী স্বাদ নিয়ে শিখে ২.৫% ঙ). স্পর্শ করে শিখে ০.৫%।’
এখন প্রশ্ন হল আমাদের দেশে এই পর্যায়গুলোর কোন বিষয় আমরা উপলব্দি করে শিক্ষার্থী কে শিক্ষা দিচ্ছি? আমার ব্যক্তিগত ধারণা হল আমরা শিক্ষার্থীকে ‘শুনে শিক্ষাদানটাই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’ তাহলে আমাদের শিক্ষার্থী শিখছে মাত্র ১১%। বাকী ৮৯% আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিখতে পারছে না। শিক্ষার্থী যে পরিমাণ শিখছে আমরা জাতি হিসাবে ঠিক সেই পরিমানণ সার্ভিস পাচ্ছি তবে হতাশ হওয়ার কি কোন কিছু আছে কি? বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মীর আবু ছালেহ শামসুদ্দীন তার এক লেখায় লিখেছেন, ‘একজন শিক্ষককে শ্রেণী কক্ষে পড়াতে হলে প্রথমে তাঁকে পড়তে হবে, জানতে হবে ও শিখতে হবে।’ কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের কয়জন শিক্ষক তা উপলব্ধি করছেন? কয়জন শিক্ষক আছেন যারা শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রতিদিন বাসায় অন্তত ২ ঘণ্টা পড়ালেখা করেন? কয়জন শিক্ষক আছেন পাঠ দেয়ার জন্য, শিক্ষার্থীকে নতুন নতুন তথ্য জানানোর জন্য নিজে জানেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছেও নাই। শিক্ষকতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, অসংখ্য শিক্ষককে আমি দেখেছি যারা প্রকৃত অর্থে তাদের জাতীয় কবির নামটা পর্যন্ত জানেন না। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত কোনটি এবং রণ সঙ্গিত কোনটি? জানেন না আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি কে। যে যাকে পছন্দ করেন তার নাম বলেন। এই কাজটি করছেন জেনে বা না জেনে আমাদের শিক্ষকরা। সুতরাং এই জাতির ভাগ্য তো কেউ ঠিক করে দিবে না। জাতির ভাগ্য ঠিক করবে তার মেধা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সর্বোপরি একদল সুযোগ্য নাগরিক। বছরের পর বছর আমরা কি এই বিষয়ে অনেক বেশি উদাসীনতা দেখাইনি? অবশ্যই। তবে আর কতকাল? শোধরানোর কি এখনও সময় হয়নি? সিলেবাসের পর সিলেবাস মুখস্থ করে, পুস্তকের পর পুস্তক পরিবর্তন করে, ক্রমাগত পরীক্ষা-আর পরীক্ষায় প্রথম হয়ে, লাভ কি হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব অনেক বিজ্ঞ শিক্ষাপণ্ডিতের কাছে পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীটা নিয়ে শুদ্ধ ভাষাজ্ঞানটা ধারন করতে না পারার জাতিতো আমরাই। আর এর পরিনতি বিরাট জিজ্ঞাসার কবলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা। ইংরেজি মহাআতঙ্ক। শৈশব থেকে বাধ্যতামূলক এই বিষয়টির জন্য প্রতিবছর বোর্ড পরীক্ষায় শত শত শিক্ষার্থীর ভরাডুবি এই কথা স্পষ্ট নয় যে, পক্ষান্তরে এই ভরাডুবি আমাদের শিক্ষকদের, নাকি যারা ইংরেজির মত একটি বিষয়ে বই লিখছেন তাদের? এই বক্তব্য ও দোষ কে নিবে? কি শিক্ষার্থী, শিক্ষক নাকি শিক্ষাপণ্ডিত? দোষ যারই হোক না কেন ক্ষতি জাতির, কলংকটাও জাতির। আর এই অবস্থার ফসল হল উচ্চ শিক্ষিতদের গরিষ্ঠ অংশ শুদ্ধ ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে উদাসীন এবং বিদেশে পড়ুয়া ধনীর দুলালদের তামাসার পাত্র।
পরিশেষে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, বহুল প্রচারিত ‘শিক্ষা সমপ্রসারণের’ এ যুগে আমাদের দেশে ‘শিক্ষা সংকোচন’ নীতিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। অনভিপ্রেত সামপ্রতিককালের অনেক সংযোজিত নীতিমালাও। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেসন জটের মত মহাপাবন। বৈপরীত্যে আক্রান্ত আমাদের শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থাটা। এই সকল মহামারী থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উদ্ধারের জন্য সবিনয়ে সুপারিশ করতে চাই,
ক) উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শিক্ষানীতি বাতিল করে একটি সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা
খ) যোগ্য এবং স্বেচ্ছায় আসা লোকবল দ্বারা এবং তাদের শিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষাদান নিশ্চিত করা
গ) সময়োপযোগী পাঠ্যপুস্তক, পাঠ্যসূচি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে সু-পরিকল্পিত দিক-নির্দেশনা ও তদারকি করা
ঘ) শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত অর্থের রক্তখরণ বন্ধ করে তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। (চয.উ গবেষণাকর্ম)
উল্লেখিত সুপারিশ মালার আলোকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সু-পরিকল্পিতভাবে সাজানোর জন্য আমি দেশের বর্তমান সরকারকে বিশেষভাবে অনুরোধ করতে চাই। তেমনি যারা অন্যকোন পেশায় না গিয়ে শিক্ষাকতা পেশাকে জীবনের ব্রত হিসাবে নিয়েছেন তাদের অনুরোধ করতে চাই, আপনার অযোগ্যতা, অদক্ষতার কারণে যাতে একজন শিক্ষার্থীরও জীবন ধ্বংস না হয় এই বিষয়টি শিক্ষক-সর্বোপরি জাতির অভিভাবক হিসাবে আপনাকে চিন্তা করতে হবে। তবে দেশ একটি সুন্দর পথে এগিয়ে যাবে। আর সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, শিক্ষার গতি আনতে হবে সময়ের প্রয়োজনকে স্বীকার করে। মনে রাখতে হবে-‘ অতীতের ভাল, আজকের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ বিষয়কে ভাবনায় আনতে হবে।’ এর সাথে মনে রাখতে হবে একজন যোগ্য শিক্ষক একটি জাতির মহান শিক্ষাব্যবস্থা। সত্যিকার অর্থে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা ও সেই ব্যবস্থার জন্য একজন উপযুক্ত দক্ষ শিক্ষকই পারেন জাতির শিক্ষাকাশের কালো মেঘ সরাতে। তবেই সুস্থ, সমৃদ্ধ ও প্রকৃত জাতি হিসাবে আমরা বিশ্বের বুক দাঁড়াতে সক্ষম হব।

x