একজন শিক্ষকের উক্তি এবং একটি আত্মহত্যা

কাজী জিনাত জাহান

মঙ্গলবার , ১ অক্টোবর, ২০১৯ at ১২:২১ অপরাহ্ণ
136

“সামার হ্যাস কাম এন্ড পাসড, দি ইনোন্যান্ট ক্যান নেভার লাস্ট, ওয়েক মি আপ হোয়েন সেপ্টেম্বর এ্যান্ডস” বিল্লি জো আর্ম স্ট্রং এর লেখা এ গানটি মনকে এতটাই ছুঁয়ে যায়, মনে হয় যে এ পৃথিবীতে সত্য আর সুন্দরের জন্য টিকে থাকা অসম্ভব। মুখে অবাধবাক্য, বিষাক্ততা অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হয়ে যারা চলতে পারে এ পৃথিবী যেন তাদের। গানটিতে সেটাই যেন প্রকাশ পায়।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মধুসূদন চক্রবর্তী ২০১০ সালের ১১ই ডিসেম্বর বিষপানে আত্মহত্যা করে। তার বাবাকে সে “বাবু” বলে ডাকত। যাবার সময় তার রেখে যাওয়া চিরকুট ছিল এমনই-“বাবু, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমি আপনাদের সবাইকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু অনেক দুঃখ নিয়ে আমি চলে যাচ্ছি। এ পড়ালেখা আমার দ্বারা হবে না। আজ স্যার আমাকে যে অপমান করেছে তা আমি কোনদিন ভুলব না। বিদায় এ পৃথিবী। অপর পৃষ্ঠায় লেখা ছিল এমন-“আজকে স্যার বলেছে আমি নাকি পারব না। এ কথাটা বলার জন্যই ক্লাসে যাই। অনেক লেখাপড়া করি, তারপরও স্যারের মন খুশি করতে পারি না। একটা পরীক্ষাও মনের মতন দিতে পারি না বাবা। আমি তো কালি দাসের মত পণ্ডিত হতে চাই।”
মধুসূদনের বাড়ি ছিল চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে। এসএসসি এবং এইচএসসি ভাল ফল করে ২০০৯ শিক্ষাবর্ষে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু শুরুর দিন থেকে তোতলামি আর কথা বলার জড়তার কারণে শিক্ষক আর সহপাঠীদের কাছে তাচ্ছিল্যের পাত্র হয়ে ওঠে ক্রমশ। অতঃপর মধুসূদন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় আট লাখ মানুষ অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৪০ জন আত্মহত্যা করে। সংস্থাটির মতে আত্মহত্যা বিশ্বে ১৫-২৯ বয়সের বছর মানুষের মধ্যে বেশি হয়ে থাকে। এখন কথা হল কেন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারা কি মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়ে যে কারও ওপর ভরসা করার আস্থাটুকুও হারিয়ে ফেলে! গবেষণায় দেখা গেছে নেতিবাচক কথা অনবরত শুনতে শুনতে মানুষ আত্মবিশ্বাস হারায়। অতঃপর বিষণ্নতা ও হতাশায় ভোগে যার পরবর্তী পরিণাম হয় আত্মহত্যা। শুনতে আশ্চর্য্য লাগলেও এটাই সত্য যে একটি আত্মহত্যা ঘটবার পেছনে কারও না কারও মুখের ব্যবহার ও অনৈতিক কথাই দায়ী। সুতরাং ব্যবহারে আমাদের সংযত হতে হবে। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কর্মশালা বা বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কোনভাবে তাদের নিরুৎসাহিত করা যাবে না। কৌশলে তাদের শাসন করতে হবে। উৎসাহিত করতে হবে ভাল কাজে। নাচ-গান, ছবি আঁকা, লেখালেখি, নিয়মিত প্রার্থনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কর্ম ব্যস্ত রাখলে আত্মহত্যা নামের এই ব্যাধি সারানো সম্ভব হবে। বলতে হবে-“তুমি ঠিক আছো তো?” “তুমি পারবে”। সারা বিশ্বে ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। আসুন আমরা সবাই সচেতন হই। সুন্দর ব্যবহার দিয়ে গোটা পৃথিবী জয় করা সম্ভব। অন্যের দোষ না ধরে চলুন সেটাকে একসাথে শোধরাই হাসিমুখে। রাগ, ক্ষোভ, অভিমান সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেন না যায়। আইনস্টাইনের একটা উক্তি আছে-“দুর্বল মানুষেরা প্রতিশোধ নেয়, শক্ত মনের মানুষেরা ক্ষমাশীল হয়। যারা বুদ্ধিমান তারা পরোয়া করে না।” তাই প্রতিটা মানুষেরই উচিৎ গুটিকয়েক মানুষের পরোয়া না করে সামনের দিকে আগানো। সৃষ্টিকর্তা কখনও ভুল করেন না। তাঁর প্রতিটা সৃষ্টির পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট কারণ। তাই আমাদের মানব সমাজের কোন অধিকার নেই “শক্তের ভক্ত নরমের জম” এই পন্থা অবলম্বন করার। গুটিকয়েক মানুষ একটি মানুষকে তাচ্ছিল্য করবে আর একে একে ঝরে পড়বে মধুসূদনের মত নিষ্পাপ প্রাণ। এই অনুপাত যেন কমে আসে নারী, পুরুষ, শিশু এবং আগত প্রজন্মের মাঝে। রাসূল (স.) কে তাঁর একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করেছিলেন-“আপনি আপনার উম্মতের কোন বিষয়ে ভয় পান?” উত্তরে রাসূল (স.) বলেছিলেন-“জিহ্‌্‌বা”। বস্তুত, জিহ্বা থেকে বের হওয়া কথা যেন কেড়ে না নেয় কারও প্রাণ আপনার আমার হাসিমুখে কথা বলা অনুপ্রাণিত করুক চারপাশকে। আসুন-সমস্ত হিংসা, তাচ্ছিল্য, বিষাক্ত বাক্যকে শিফট ডিলিট দেই। কারণ সৃষ্টিকর্তার দেয়া প্রাণ অনেক মূল্যবান।

x