একজন ভেজালধারী মানুষের জবানবন্দি

রম্য রচনা

সত্যব্রত বড়ুয়া

শুক্রবার , ১ মার্চ, ২০১৯ at ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ
114

আমার ধারণা অতি নিকটবর্তী ভবিষ্যতে আদমশুমারিতে ভেজাল আদমদেরও শুমারি করা হবে। এটা হলে আমরা বুঝতে পারবো আমাদের দেশে কত সংখ্যক ভেজাল মানুষ রয়েছে। অচিরেই আমরা দেখবো হাসপাতাল গুলোতে থাকবে ভেজাল রোগীদের জন্যে পৃথক ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ডে ভেজাল রোগীদের চিকিৎসা করবেন ভেজাল ডাক্তাররা। ভেজাল মানুষদের থাকবে সংগঠন। থাকবে রাজনৈতিক দলও। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো এই দলটিরও জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার অধিকার থাকবে। এদের থাকবে সংগঠন। সংগঠনগুলো তাদের দাবি আদায়ের জন্যে মানব বন্ধন কর্মসূচি পালন করবে। সরকারের কাছে তারা দাবি জানাবে ৯০% ভেজাল মিশ্রণের। এমন একদিন আসবে আমরা দেখবো ভেজালবাজরা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। থাকবে ‘ভেজাল মার্কেট’। এখানে খুব সস্তায় ভেজাল জিনিসপত্র পাওয়া যাবে। সরকার কৃষকদের কাছ হতে ধান ক্রয় করবার সময় ভেজাল ও নির্ভেজাল ধানের জন্যে দু’ধরনের ক্রয় মূল্য নির্ধারণ করবে। দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠবে অসংখ্য ভেজাল বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকার বিনিময়ে পাওয়া যাবে মাস্টার্স ডিগ্রির সার্টিফিকেট। বিত্তবানদের সন্তানেরা এস.এস.সি পাস না করেও উচ্চ শিক্ষিত হয়ে যাবে। ভেজাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট সুস্থ মানুষকে করবে অসুস্থ। এতে মন খারাপ করবার কিছু নেই। অন্য একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্টে দেখবেন আপনি একজন সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ। ডাক্তাররা তাঁদের প্রেসক্রিপশনে লিখবে ভেজাল ওষুধের নাম। ভেজাল ওষুধ খেয়ে আপনার পেটের গ্যাস আরো বেড়ে যাবে। আমাদের দেশে গ্যাস সংকট থাকলেও পেটের গ্যাসের কোনো সংকট থাকবেনা। কোনো তরুণ গবেষক হয়তো উদ্ভাবন করে ফেলবেন এমন এক পদ্ধতি যাতে আমরা আমাদের নিজেদের পেটের গ্যাস দিয়েই গ্যাসের চুলা ধরাতে পারবো। আজকাল গরুর দুধে পাওয়া যাচ্ছে বিষাক্ত পদার্থ। আমাদের মায়েদের দুধও পরীক্ষা করলে পাওয়া যাবে বিষাক্ত পদার্থ। এখন অনেকেই কোরবানির গরু পছন্দ করেন ফেসবুক দেখে। ইদানীং ফেসবুক দেখে মেয়ে পছন্দ করা শুরু হয়ে গেছে। ফেসবুকে সুন্দরী মেয়ে দেখে বাপ-মা, ছেলে মোহিত হয়ে গেলেন। ফেসবুকের এই মেয়েটির সাথেই আপনার ছেলের বিয়ে হয়ে গেলো। কয়েক মাস পরে টের পেলেন এটি একটি ভেজাল মেয়ে। আমাদের ভাষাও এখন ভেজাল ভাষাতে পরিণত হয়েছে। আমরা এখন সে ভাষাতেই কথা বলি। আমাদের গান ভেজাল। সুর ভেজাল। ভেজাল মেশানো হচ্ছে- রবীন্দ্রসংগীতে, নজরুল সংগীতেও। ছেলে বেলায় ‘জানা ভালো’ বইতে ‘সপ্তম আশ্চর্যের’ কথা পড়েছি। সেখানে ছিলোনা অষ্টম আশ্চর্যের কথা। অষ্টম আশ্চর্য হলো এতো ভেজাল খাদ্য খাওয়ার পরও আমাদের গড় আয়ু দিন দিন বেড়ে চলেছে। যুক্ত করছি আশ্চর্য হওয়ার মতো আরো অনেক কিছু। আমাদের দেশে ভেজাল মানুষরাইতো দুর্নীতি করছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো এর পরেও ক্রমাগতভাবে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটছে। মায়েরা এখন ভেজাল সন্তান প্রসব করছে। আমাদের ভেজাল সন্তানদের মধ্যে কেও কেও আবার খ্যাতিমান হয়ে যাচ্ছে। আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি যে আমি একজন ভেজালধারী মানুষ। কিন্তু আশ্চর্য হই যখন আমার পরিচিতজনরা বলেন, ইনি একজন নির্ভেজাল ভদ্রলোক। এটা আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি।

x