একজন অর্ণবের মায়ের সংগ্রাম

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৯:২০ পূর্বাহ্ণ
138

অটিজম শব্দটি ইদানীং খুব পরিচিত। আগের পরিবারগুলোতে সাত আট কিংবা আরো বেশী সন্তান থাকতো কিন্তু অস্বাভাবিক সন্তান দেখা যেতো না দু’একটা ব্যতিক্রম ছাড়া। এখন প্রায় দেখা যাচ্ছে দুটি সন্তানের একটি এএসডি আক্রান্ত। পরিবেশগত কারণে এর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এএসডি আক্রান্ত পরিচিত এক শিশুর সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম শিশু বিশেষজ্ঞ বাসনা মুহুরীর সাথে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেম্বারে। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেধাবী মুখ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন অটিজম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে। অধ্যাপক বাসনা মুহুরী তাঁর নিজের সন্তানের জন্য লড়তে লড়তে হয়ে উঠেছেন অটিজম শিশুদের বাতিঘর। তিনি বলেন, অন্ধ হলে বোবা হলে বধির হলেও তারা তাদের নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু অটিজম শিশুরা তা পারে না। এইখানেই তাদের অসহায়ত্ব। তাছাড়া সমাজও তাদের সেভাবে নিতে পারে না। অটিজমের বিভিন্ন স্তর থাকে। কিছু কিছু এএসডি মূল ধারায় ফিরে যেতে পারছে তার জন্য প্রয়োজন হয় অভিভাবকদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ধৈর্য্য। অটিজম স্পেকট্রাম ডিস অর্ডার স্নায়ুবিক বিকাশ সংক্রান্ত রোগ। তাদের ভাষাগত ও আচরণগত সমস্যা দেখা যায়। এএসডি ৩ বৎসর বয়স থেকে স্পষ্ট হয় এবং শেষ জীবন পর্যন্ত থাকতে পারে। একজন এএসডি শিশুর মধ্যে যা যা দেখা দিতে পারে ১২ মাস বয়সে নাম ধরে ডাকলে কোন প্রতিক্রিয়া করে না।
১৮ মাস বয়সেও খেলতে পারে না। এরা সাধারণত অন্যের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকানো এড়িয়ে চলে এবং একা থাকতে পছন্দ করে। এরা নিজের অনুভূতি বা অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারে না।
কিছু নির্দিষ্ট জিনিসের প্রতি আগ্রহী থাকে কিছু শব্দ, গন্ধ স্বাদ, চেহারা বা অনুভবের সাথে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
প্রফেসর বাসনা মুহুরী তার জীবনের গল্প শোনাতে গিয়ে কখনো কখনো অশ্রুসজল হয়ে উঠছিলেন। আমাদের সমাজ খুব সহিষ্ণু ও সহানুভূতিশীল নয়। মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ব ব্যতিক্রম ঘটনা মাত্র। অর্ণবকে নিয়ে তাঁর সংগ্রামের শুরুতে সমাজের রূঢ় রূপও তাঁর দেখা হয়ে গেছে। অর্র্ণব তাঁর প্রথম মাতৃত্বের আকাশজোড়া আনন্দ। তিন বৎসর বয়সেই বুঝতে পারেন অর্ণবের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, অর্ণব অন্য আট-দশটা শিশুর মতো নয়। দুশ্চিন্তার আর উদ্বিগ্নতায় পড়ে গেলেন তারপর ছুটলেন কোলকাতায়। না, কোন ওষুধ কোন চিকিৎসার সন্ধান পেলেন না। ঢাকা চট্টগ্রাম বহু খোঁজাখুঁজি করলেন। তখন ১৯৯৩ সাল। অর্ণবের বয়স পাঁচ বৎসর। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল গাইনী বিভাগে। সিদ্ধান্ত নিলেন শিশু বিভাগে আসার। কারণ ছিল অর্ণব এবং অর্ণবদের মতো বিশেষ শিশুদের নিয়ে কাজ করার। ১৯৯৫ সালে তার দ্বিতীয় সন্তান সমীক বিশ্বাসের জন্ম। ১৯৯৭ সালে তিনি এফসিবিএস শেষ করলেন। তার নিরন্তর সংগ্রাম ছিল অর্ণবকে নিয়ে। ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ছিলেন চৌধুরী বি. মাহমুদ। বাসনা মুহুরী তখন অধ্যক্ষ সাহেবকে অনুরোধ করলেন অটিজমের উপর একটা ওয়ার্কশপ করার জন্য। তিনি রাজি হলেন। সেই ওয়ার্কশপে অর্ণবকে তিনি এনে বসালেন তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করার জন্য ও বোঝার জন্য। কথায় কথায় তিনি সেই স্মৃতি স্মরণ করলেন আরো বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে স্মৃতিচারণ করলেন অর্ণবের জন্মদিনে উপহার নিয়ে হঠাৎ বাসায় হাজির হওয়ার কথা, তিনি সুইড বাংলাদেশ চট্টগ্রাম শাখা এবং নিষ্পাপ অটিজম ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামে কাজ করছেন এই দুইটি প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছে। এই মা বলেন আমার সন্তানই আমার শিক্ষক। নিষ্পাপ ফাউন্ডেশনে তিনি গড়ে তুলেছেন অর্ণব সেঞ্চুরী থেরাপি সেন্টার। সেখানে এই বিশেষ শিশুদের সেবা দেওয়া হয়। তার স্বপ্ন স্থায়ী অটিজম পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা। চট্টগ্রামের অনেক মহৎ প্রাণ ব্যক্তি এগিয়ে এসেছেন বলেও তিনি জানান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য সায়মা ওয়াজেদ এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও তাকে সহায়তা করেছেন। তিনি সারাদেশ জুড়ে অটিজম নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে জানান। অটিজম পুরাপুরি সুস্থ করা না গেলেও অনেকাংশে সুস্থ করা যায়। এ-ব্যাপারে প্রয়োজন সচেতনতা।
দেশে ও বিদেশে অনেকে কাজ করে চলেছেন সামাজিক ও মানবিক দায়বোধ থেকে নিজেকে আড়াল করে প্রফেসর বাসনা মুহুরী সেরকম একজন মানুষ তিনি নিরন্তন ছুটে চলেছেন কখনো ভারতে, কখনো মালয়েশিয়া, কখনো সিঙ্গাপুরে। কোথায় কীভাবে অটিজম আক্রান্তদের সুস্থতা দেওয়া যায় বা স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো যায় সেই প্রত্যাশায়। তিনি সরকারের কর্ম পরিকল্পনায়ও যুক্ত আছেন। বাসনা মুহুরী রাউজানের বিনাজুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা অমৃতন্দ্র মুহুরী মা বিনা মুহুরী। বিনাজুরী হাইস্কুল ও কুন্ডেশ্বরী বালিকা মহাবিদ্যালয় থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। তাঁর স্বামী অর্থোপেডিক্স বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর অলোক বিশ্বাস চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ। এখন অবসরপ্রাপ্ত। তার দ্বিতীয় সন্তান সমীক বিশ্বাস ইন্টার্ন ডাক্তার। এই সংগ্রামী মা স্বপ্ন দেখেন এমন এক পৃথিবীর যেখানে অর্ণব এবং অর্ণবের মতো সন্তানেরা নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। অর্ণব এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। অর্ণব সুস্থ হয়ে উঠুক। অটিজম সন্তানেরা ভালো থাকুক।

x