এই পথ কঠিন, অসম্ভব তো নয়!

মাধব দীপ

শনিবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ
70

মেধার জোরেই ছাত্রীরা মেডিকেলে বেশি জায়গা করে নিচ্ছে। তাহলে, পুরুষশাসিতসমাজের ওই প্রচলিত স্রোতকেই তো নারীচিকিৎসকরা সরাসরি সমর্থন করছেন, তাই নয় কি? এটাও ভাবার সময় এসেছে। এই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ক্যান্সার, মেডিসিন, সার্জারিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও নারী চিকিৎসকরা অনেক বেশি সাফল্য দেখাতে পারবেন- এতে তো কারও সন্দেহ নেই। থাকার কথা না। তবে এমনটা আমরা দেখবো কবে?

গেলো ১৮ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান খবরে মনে যুগপৎ আনন্দ-বেদনার ঢেউ খেলে গেলো। খবরটি হচ্ছে- এ বছর মেডিকেলে ভর্তি হওয়া ১০ হাজার ২২৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ছাত্রী, ছাত্র ৪০ শতাংশ। প্রতিবেদনে এও বলা হয় যে- মেডিকেলে ছাত্রীরা পাসও করছেন বেশি। পাসের ক্ষেত্রে শীর্ষ স্থানগুলো ছাত্রীদের দখলে। বলা হয়েছে, স্ত্রী ও প্রসূতিরোগ বিষয়ে নারী চিকিৎসকদের ৯৬% বিশেষ দক্ষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১০ বছরে মেডিকেল কলেজগুলো থেকে মোট ৩৯ হাজার ২৮৫ জন বাংলাদেশি এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে বের হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ২১ হাজার ১২৩ জন এবং ছাত্রী ১৮ হাজার ১৬২ জন। অর্থাৎ এই সময়ে পুরুষের চেয়ে ২ হাজার ৯৬১ জন বেশি নারী চিকিৎসক ডিগ্রি নিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, আগামী বছরগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬-২৭ সাল নাগাদ প্রতিবছর পুরুষ চিকিৎসকের দ্বিগুণ নারী চিকিৎসক ডিগ্রি নেবেন। ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেডিকেল কলেজে ভর্তি ও এমবিবিএস পাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা এসব চিত্র পাওয়া যায়।
চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবার ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই খবর নিঃসন্দেহে আশাপ্রদ, সুখকর ও আনন্দদায়ক। কিন্তু মনটা বিষাদে ভরে যায় যখন দেখি- পুরুষ চিকিৎসকদের ৮৭ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা মেডিসিন ও সার্জারি বিষয়ে। আর নারী চিকিৎসকদের ৯৬ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা স্ত্রী ও প্রসূতিরোগ বিষয়ে। আমার কথা হচ্ছে- নারী চিকিৎসকদের বেশিরভাগকে কেনো পুরনো ছাঁচে ঢালা (স্টেরিওটাইপড) সেই একই সিদ্ধান্ত নিতে হবে? অর্থাৎ, চিকিৎসাশাস্ত্রের এতো-এতো উচ্চতর শাখা থাকতে স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিষয়ে নারীর বিশেষ পড়াশোনা প্রচলিত সমাজের কাঠামোকেই তো শক্তিশালী করে। তার মানে, এই সমাজ একজন নারীকে শুধু চিকিৎসক হিসেবে যেটুকু দেখতে চায়- তারচে বেশি দেখতে চায় একজন নারীবান্ধব চিকিৎসক হিসেবে। এটাই কি প্রমাণ করে না? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমরাও জানি এবং মানি- মেধার জোরেই ছাত্রীরা মেডিকেলে বেশি জায়গা করে নিচ্ছে। তাহলে, পুরুষশাসিতসমাজের ওই প্রচলিত স্রোতকেই তো নারীচিকিৎসকরা সরাসরি সমর্থন করছেন, তাই নয় কি? এটাও ভাবার সময় এসেছে। এই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ক্যান্সার, মেডিসিন, সার্জারিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও নারী চিকিৎসকরা অনেক বেশি সাফল্য দেখাতে পারবেন- এতে তো কারও সন্দেহ নেই। থাকার কথা না। তবে এমনটা আমরা দেখবো কবে?
অপরদিকে, গবেষণা বলছে- সামাজিক মর্যাদা, বাবা-মায়ের চাপ, বিয়ের বাজারে এই পেশার দাম- এই তিনটি বিষয় মেয়েদের পেশা হিসেবে চিকিৎসাকে বেছে নেওয়ার পেছনের কারণ বলে গবেষণায় ওঠে এসেছে। আমার প্রশ্ন, এতে নারীর স্বকীয়তা কোথায়? নারীর নিজের পছন্দ-অপছন্দ কোথায়? তিনটি কারণই তো নারীর ওপর সমাজ ও পরিবারের চাপানো বাস্তবতা। এই ব্যাপারটি কি আমরা ভেবে দেখেছি? উপরন্তু, ভাবনার আরও একটি বিষয় হচ্ছে- গবেষকদের সঙ্গে দলগত আলোচনায় ছাত্রীরা পেশা চর্চার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, বিয়ের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মনে করেন, চিকিৎসা পেশা চর্চার চেয়ে পারিবারিক দায়িত্ব পালন করা গুরুত্বপূর্ণ। পরিণতিতে, সংসার সামলে ওঠতে না পেরে অনেকে পেশা ছেড়ে দেন। এই বাস্তবতা কতোটা নির্মম একজন নারীচিকিৎসকের জন্য- সেটা লিখে কতোটুকুই বা বোঝানো যাবে?
তারও ওপর, নারী চিকিৎসকদের জন্য অন্যতম একটি বড় চ্যালেঞ্জ যা গবেষণায় ওঠে এসেছে তা হলো- কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টির ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদাসীনতা প্রদর্শন করা। হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে হয়, কিন্তু নারী চিকিৎসকদের রাতের পালায় দায়িত্ব পালনের সমূহ সমস্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়ে গেছে এখনও।
সবশেষে বলবো- সরকার মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এরই ফলাফল নারীদের বেশি সংখ্যক চিকিৎসক হওয়ার সুখকর সংবাদ। নারী চিকিৎসকের এই সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ুক। কিন্তু, নারীর ওপর সমাজ ও পরিবারের চাপানো বাস্তবতা কমে আসুক। কমতে থাকুক। নারী এগিয়ে যাক। প্রথার বিপরীতে দাঁড়াক। তবেই নারীর স্বতন্ত্র পরিচয় চিহ্নিত হবে। তাই নয় কি? জানি- এ পথ কঠিন। কিন্তু অসম্ভব তো নয়!

x