এই নগরে সেই নাগরিক কই?

শিক্ষার্থীদের 'নিরাপদ সড়ক চাই' আন্দোলন

সফিক চৌধুরী

শনিবার , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ
226

বিগত সময়ে ক্ষুদে স্কুল শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের পর অনেককেই বলতে শুনেছি, শিক্ষার্থীরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, সাধারন নাগরিকের অনেকেই সেই সময় চলতি হাওয়ার পন্থি হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেবুতে প্রোফাইল পিক পরিবর্তন করেও সংহতি দেখিয়েছে। প্রায় সকলেই ভেবেছে, সড়কের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা নানা অনিয়মের হয়তো কিছুটা হলেও হবে অবসান। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সড়কের অনিয়ম ঠেকাতে সরকারের নানা সংস্থা বিশেষ করে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএ ও সড়ক বিভাগ সহ সংশ্লিষ্ট সকলেই নানা উদ্যোগ গ্রহন করেছে। কিন্তু, বিগত বেশ কয়েকদিনের টানা বিভিন্ন পত্রিকার ছবি, সংবাদ ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় আমরা বুঝতে পারছি, আমাদের পরিবর্তন ঐ ফেবুতে প্রোফাইল পিক পরিবর্তন পর্যন্তই। আমরা মননে ও কর্মে সেই আগের অবস্থানেই আছি। তবে আশার কথা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর অবশেষে গত ১৯ সেপ্টেম্বর বুধবার বেপরোয়া মোটরযান চালানোর কারনে সংঘটিত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজার বিধান রেখে সড়ক পরিবহন বিল ২০১৮ সংসদে পাস হয়েছে। পাস হওয়া আইনে শাস্তি ও টাকার অঙ্কে জরিমানা বাড়ানো হয়েছে, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না চালক এতে জরিমানার বিধান যুক্ত হয়েছে, বিধি অমান্য করলে পয়েন্ট কাটার বিধান রাখা হয়েছে, পয়েন্ট শূন্য হলে বাতিল হবে চালকের লাইসেন্স, চালক ও সহকারী’র ন্যুনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা রাখা হয়েছে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ সহ এমন আরও অনেক ভালো কিছু যুক্ত হয়েছে, যা আশাপ্রদ। যদিও এতে অংশীজনদের কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তবুও সবদিক বিবেচনায় এমন একটি আইন পাসের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আমাদের গন-পরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘকাল ধরেই অপরিকল্পিত, সেখানে এই আইন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সেই সংশয় রয়েই যায়।
যাই হোক, নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের প্রত্যাশা, সরকার ও ট্রাফিক পুলিশের সকল ভালো উদ্যোগ, আইন সফল ও কঠোরভাবে পালন হোক। কিন্তু, নগরের পথচলতি মানুষ হিসেবে আমরা যদি নগরের ‘নাগরিক’ হয়ে উঠতে না পারি তাহলে সরকারের এমন আইন ও ট্রাফিক পুলিশের যে কোন ভালো উদ্যোগ, তৎপরতা বা সপ্তাহ পালন কোন সুফল বা সফলতা বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। কারণ, একটা শহরে শুধু পাকা রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উঁচু দালান, কিছু শপিং মল আর ব্যবসা বাণিজ্য থাকলেই তা নগর হয়ে উঠে না, একটা শহর তখনই সত্যিকার নগর হয়ে উঠে যখন সেখানে বসবাসরত লোকজন সেই নগরের আইন ও নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং তার জন্য পালনীয় দায়িত্ব/কর্তব্য সঠিকভাবে মেনে চলেন। আমরা ভুলে যাই, একটা সুন্দর নগর গড়তে হলে আগে নিজে নাগরিক হতে হবে। কিন্তু, এই নগরে সেই নাগরিক কই?
‘পুলিশ জনগনের বন্ধু’, যুগ যুগ ধরে এই আপ্ত বাক্যটি আমরা যতবার বলে পুলিশের কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ/সহযোগিতা প্রত্যাশা করি, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমরা নিজেরাও কী সবসময় তাঁদের সাথে একইরকম ব্যবহার করি? পুলিশের আচরণ/ব্যবহার নিয়ে কথা উঠলে আমরা অনেকেই উদাহরণ হিসেবে উন্নত বিশ্বের পুলিশের কথা বলি। কিন্তু, আমরা ভুলে যাই বা যা বলি না তা হলো, উন্নত বা এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বড় শহরগুলোতে পুলিশ যাঁদের সেবা প্রদান করেন, তাঁরাও নাগরিক হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব/কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা প্রায় সবকিছুতেই অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াই, সমালোচনা করি, কিন্তু আত্ম জিজ্ঞাসা বা আত্ম সমালোচনায় আমরা রাজি নই।
আমরা প্রায়শই বলি, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পাবলিক বাস, টেম্পো, হিউম্যান হলার, লেগুনা ইত্যাদি এলোমেলো দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠানামা করে, যা যানজটের একটি বড় কারণ। এখন প্রশ্ন এসে যায়, গণপরিবহনগুলো সেখানে দাঁড়ায় কেন? কারণ, আমি আপনি নিজেই একটু সামনে হেঁটে গিয়ে বাস স্টপেজে দাঁড়াতে রাজি নই, তাই! আবার, এই যে গণ পরিবহনগুলো রাস্তার যেখানে সেখানে দাঁড় করিয়ে দেয়, তার কারণও কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমরা! কারণ, আমি আপনি আমাদের সুবিধামতো রাস্তার যে কোন জায়গায় উঠতে ও নামতে চাই বলেই তারা আমাদের হাতের ইশারায় দাঁড়িয়ে যায়! ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় দায়িত্ব পালনের সময় সড়ক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেও দেখা যায় নানা সমস্যা। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের কিছু প্রভাবশালী উল্টো পথে যাতায়াত করেন। কাগজপত্রসহ নানা কারণে পুলিশ তাঁদের যানবাহন আটকালেই শুরু হয়ে যায় তদবির, প্রভাবশালীরা হুমকি-ধামকি দেওয়াও শুরু করেন। আইন না মানাকে আমাদের অনেকেই গর্বের কাজ বলে মনে করেন! আমরা প্রায় ক্ষেত্রেই নিজে আইন/নিয়ম মানতে রাজি নই, কিন্তু অন্যের কাছ থেকে তা প্রত্যাশা করি!
অন্যান্য দেশে ট্রাফিক নিয়ম কানুনের বিষয়টি তাদের স্কুল পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাংলাদেশের স্কুলের বইগুলোতে সেটা কতোটা আছে বা আদৌ কী কিছু আছে? গত আগস্টে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে সড়কে নিরাপদ চলাচলের বিষয়ে ঢাকার আজিমপুরের অগ্রণী স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভাষ্যে জানা যায়, তাদের বাংলা মাধ্যমের তৃতীয় শ্রেণীতে একটি বিশেষ অধ্যায় এবং চতুর্থ শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে একটি ছড়া রয়েছে মাত্র! এ কথা হয়তো বাড়িয়ে বলা হবেনা, পথ সংস্কৃতি নিয়ে কোন শিক্ষা আমাদের ছেলেবেলা থেকে বড়বেলা কোন কালেই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তেমন একটা দেওয়া হয় না বা সরকারিভাবেও কোন উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি আমরা দেখতে পাইনা। আর পথ চলতি সড়কের ন্যূনতম জ্ঞান যদি আমরা না পাই তাহলে তা মানার প্রশ্নতো অনেক ক্ষেত্রেই অবান্তর। আবার ওদিকে ফুটপাতগুলোও হকারদের বেদখলে! তবে, আমাদের যারা নিজেদের শিক্ষিত সমাজ বলে দাবি করেন তাঁরা তাঁদের শিক্ষার প্রভাবে যতটুকু জানেন বা বুঝেন তাও কি তাঁরা পালনে সচেষ্ট? আমাদের বেশিরভাগই যত্রতত্র রাস্তা পারাপারে উৎসাহী, ব্যস্ত সড়কের যেখানে ফুটওভার ব্রিজ আছে সেখানেও দেখা যায় রাস্তার নিচ দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হচ্ছে শিক্ষিত-নিরক্ষর নির্বিশেষে মানুষজন। শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে যারা এভাবে রাস্তা পার হচ্ছেন তাঁদেরতো নিশ্চয়ই এই বোধ আছে এভাবে এলোমেলো রাস্তা পার হওয়া অনুচিত, তবুও তা হচ্ছে। কিছু প্রভাবশালী ও মোটর বাইক চালক যারা উল্টো পথে গাড়ি চালান তাঁরা জানেন এটা অন্যায়, তবুও তা করেন, আর এতেই তাঁদের অসুস্থ মানসিকতার সুখ! তবে একই আমরা আবার সেনানিবাসগুলোতে যথাযথ আইন মেনেই গাড়ি চালাই! গেল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় দেখা গেছে লজ্জায় পড়ে হলেও সাধারন থেকে অসাধারন প্রায় সবাই সেই সময়টায় সাধারন ট্রাফিক আইন মানার চেষ্টা করেছেন। তার মানে, আমরা পথ সংস্কৃতি নিয়ে কোন প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না পেলেও ন্যূনতম যা জানি তাও পালনে সচেষ্ট নই, যদি আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকে। তাই অনেকেই বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ হলেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। হ্যাঁ, কথা ঠিক। কিন্তু, আমাদের বুঝতে হবে, আমাদের জনসংখ্যা অনুপাতে ট্রাফিক সহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আছে, তাই চাইলে একদিনেই আইনের কঠোর প্রয়োগ সম্ভবপর নয়, কিন্তু তাই বলে শিক্ষিত বলে দাবিদার আমরাও কী নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালনে সচেতন হবো না?
কিন্তু, এভাবে আর কতদিন? আর এরকম হাজারো অনিয়ম নিয়েই আমরা নগর গড়তে চাইছি, যা আদৌ সম্ভব নয়। আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের স্কুল/কলেজ সিলেবাসে পথ সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্ত হবে এবং সেই সাথে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আমরা নিজেরাও নাগরিক হিসেবে সচেতন হবো। তবে, আমাদের ছেলেবেলা থেকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্কুল শিক্ষার্থীদের পথ সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান দান করা উচিত। কারণ, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মূল্যবোধ বিকশিত হয় এবং ছোট থাকতেই যদি তাদের ট্রাফিকের বিভিন্ন নিয়মকানুন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করা হয়, তাহলে তা তাঁকে ভবিষ্যতে যোগ্য নাগরিক হয়ে সড়ক আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করবে ও সচেতন করে তুলবে, এ কথা বলাই যায়।

x