ঊনিশ শতকীয় বঙ্গীয় রেনেসাঁর উত্তর সাধক

মনীষী প্রফেসর অনুপম সেন

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

শুক্রবার , ২ আগস্ট, ২০১৯ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
219

প্রফেসর সেনের আশি বছরে পদার্পণ উপলক্ষে চট্টগ্রাম থেকে একটি সংবর্ধনা গ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যাতে দেশ-বিদেশের সুধীবৃন্দ তাঁদের লেখার মাধ্যমে প্রফেসর সেনের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য নিবেদন করবেন। প্রফেসর অনুপম সেন সংবর্ধনা গ্রন্থের জন্য আপনার একটি মূলবান লেখা প্রদান করলে বাধিত হবে।
সমকালীন বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চা ও সমাজবিজ্ঞান গবেষণায় বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, মহান শিক্ষাবিদ, জ্ঞানতাপস, একুশে পদক প্রাপ্ত বিশিষ্ট লেখক প্রফেসর ড. অনুপম সেনের একটি বিশিষ্ট স্থান রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর খ্যাতি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিব্যাপ্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন এবং গবেষণায় তাঁর বই ব্যবহৃত হয়।
প্রথমত এবং প্রধানত শিক্ষকতার সূত্রেই যাবতীয় সম্মান ও স্বীকৃতির হকদার হন তিনি। কিন্তু শিক্ষকতাকে তিনি শ্রেণি কক্ষে সীমাবদ্ধ রাখেন না। ক্লাসের বাইরে তাঁর অফিসে, এমনকি তাঁর বাসায়ও ভিড় জমায় উৎসুক ছাত্র-ছাত্রীরা। তারা যে শুধু সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র তা’ নয়, সাহিত্য, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, অর্থনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি নানা বিষয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের অনন্ত জ্ঞান পিপাসা নিবারণ করেন সেন স্যারের জ্ঞানগর্ভ ভাষণ শুনে।
তাঁর পাণ্ডিত্য সর্বমহলে স্বীকৃত। মুক্তবুদ্ধির অধিকারী, মানবপ্রেমী প্রফেসর সেন চট্টগ্রামে বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে একজন অভিভাবকতুল্য প্রবাদ পুরুষ। যাঁদের নিরন্তর লেখালেখি, বচনে-ভাষণে আমাদের দেশে মুক্তচিন্তার ধারাটি বেগবান ও বহমান তাঁদের সম্মুখভাগেই যাঁকে দৃষ্টিগোচর হয়, তিনিই প্রফেসর অনুপম সেন।
অতঃপর প্রতীতি হয় প্রফেসর সেনের হিকমত রেনেসাঁ যুগের জ্ঞানীর সঙ্গে তুলনীয়; জীবন ও জগতের, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের তাবৎ বিষয়ে যাঁদের অপার কৌতূহল, আশেপাশের মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত ও সঞ্চারিত হয়ে যেত।
প্রফেসর সেন শুধু যে জ্ঞানচর্চাতেই সীমাবদ্ধ আছেন তা’ নয়। তিনি একজন অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, কবি ও সুলেখক। ড. অনুপম সেনকে উনিশ শতকীয় বঙ্গীয় রেনেসাঁর সার্থক উত্তরসাধক বলেই মনে হয়। রেনেসাঁ যুগের মনীষীদের ন্যায় তিনি জাগতিক সমস্ত বিষয়ে তাঁর নিরন্তর কৌতূহলী মানসভ্রমণ জারি রেখেছেন এবং যেসব বিষয় এখনো মানববিদ্যার অধিগত হয়নি, জ্ঞানরাজ্যের সেইসব অজানা, অজ্ঞাত, অন্ধকার প্রদেশে তাঁর জিজ্ঞাসু নেত্রের আলো জ্বেলে জ্বেলে আমাদের জন্য কুড়িয়ে আনছেন মহামূল্যবান মনিমুক্তা।
তিনি পড়ান সমাজবিজ্ঞান। কিন্তু তাঁর অধ্যয়ন ও চর্চার অন্তর্ভুক্ত করে নেন ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, সাহিত্য, শিল্পকলা, ইতিহাসসহ মানববিদ্যার সমস্ত বিষয়। ফলে মানুষের সমাজ, সভ্যতা নিয়ে যখন তিনি লিখতে বসেন, সামগ্রিক দৃষ্টিতে বিচার করবার ফলে তিনি যা’ নির্ণয় করেন, তা’ হয়ে ওঠে মৌলিক। বাংলাদেশে যাঁরা চিন্তারাজ্যে বিচরণ করেন, তাঁদের মধ্যে ড. অনুপম সেন একজন মৌলিক চিন্তাবিদ।
ড. অনুপম সেনের বিদ্যাবত্তা, পাণ্ডিত্য ও চিন্তাচর্চা বাংলাদেশে বহুযুগের সারস্বত সাধনার ক্ষেত্রকে অনেকদূর প্রসারিত করেছে।
তাঁর পিএইডি অভিসন্দর্ভে ড. সেন ভারতীয় উপমহাদেশে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, শ্রেণি সংগ্রাম, রাষ্ট্রে উদ্ভব ইত্যাদি বিষয়ে ভাবিত হলেও ইদানিং তাঁর কৌতূহল জাগ্রত হয়েছে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির উদ্ভব ও বিকাশের স্বরূপ, সামাজিক স্তরবিন্যাস, সামাজিক শক্তির বৈপরীত্য-দ্বন্দ্ব ও সমীকরণ, শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাময়িক বিপর্যয় সত্ত্বেও সমাজতন্ত্রের অবশ্যম্ভাবীতা।
ব্যক্তি-পরিবার-গোষ্ঠী-কৌম সমাজ, আদিবাসী, ট্রাইব, মানব জাতি, কোসাম্বীর গবেষণা থেকে গ্রাম পত্তনের উদাহরণ, জাতি-উপজাতি, পুঁজির উদ্ভব, উদ্বৃত্ত মূল্য, উৎপাদন, মুনাফা, সম্পদের বন্টনে অসাম্য, শ্রেণি ও শ্রেণিদ্বন্দ্ব, উপনিবেশ, নয়া উপনিবেশ, সাম্রাজ্যবাদ, বাজার-কার্টেল-সিন্ডিকেট-কর্পোরেশন ইত্যাদি বিষয়ে সূক্ষ্ম, সুগভীর আলোচনার পর তিনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তা’ একান্তভাবেই সেন-তত্ত্ব। তেমন আর কারো সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
এমন মৌলিক কণ্ঠস্বরের সন্ধানে বহির্গত হয়ে ড. আনিসুজ্জামান, বদরুদ্দীন উমর, আহমদ রফিক, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সলিমউল্লাহ খান কিংবা একজন ফরহাদ মজহার কিংবা আটলান্টিকের ওপারের নোয়াম চমস্কি, টেমস নদীর তীরে বসবাসকারী অমর্ত্য সেনকে; আবার অতীতে বিনয়কুমার সরকার, নীরদ সি চৌধুরী, তপন রায় চৌধুরী, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, আহমদ ছফা, ড. আহমদ শরীফ, আবদুল হক এই কটা নামই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে, যাঁদেরকে ড. অনুপম সেনের সগোত্রীয় বিবেচনা করা যেতে পারে। মিলটা কোথায়-স্বীয় চিন্তার সাযুজ্যে। এর মধ্যে দু’জনকে মনে হতে পারে নিম্নকণ্ঠ ও নরম। স্নিগ্ধতাই তাদের ভূষণ-এই স্নিগ্ধ ব্যাপারটা বোঝাতে আমার বারবার জ্যোৎস্নারাতের কথা মনে পড়ে যায়। জ্যোৎস্নার ধবল নরম গালিচা পাতা যামিনীর অলৌকিক অপরূপ রূপ শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। এই দু’জন ভিন্ন রুচির মানুষ হচ্ছেন ড. আনিসুজ্জামান ও ড. অনুপম সেন। এঁরা সত্যিই নরম; কাউকে কটু বা কঠোর কথা বলতে পারেন না। কিন্তু নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে তাঁরা এত কঠিন হয়ে যান যে, তখন তাদের অবস্থান থেকে এক চুল পরিমাণও নাড়ানো যায় না।
প্রফেসর সেন চট্টগ্রামের গৌরব। এমনকি বাংলাদেশের গৌরব বললেও সম্ভবত বাড়িয়ে বলা হবে না।
শিক্ষা, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আইন চর্চার সুমহান ঐতিহ্যমণ্ডিত পটিয়া থানার ধলঘাট গ্রামের একটি আলোকপ্রাপ্ত পরিবারে প্রফেসর ড. অনুপম সেনের জন্ম। তাঁর জ্যেঠা কবিভাস্কর শশাঙ্কমোহন সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ছিলেন; তাঁকে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের জনক মনে করা হয়। বহুভাষাবিদ, পরিব্রাজক, তিব্বত বিশেষজ্ঞ মনীষী শরচ্চন্দ্র দাশ এবং কবি গুণাকর নবীন চন্দ্র দাশ তাঁর মাতার দিক থেকে নিকটাত্মীয়। পিতৃকূল ও মাতৃকূল-উভয় দিক থেকে তিনি সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা ও জ্ঞান সাধনার উত্তরাধিকার লাভ করেছেন।
ড. সেনের পিতা বীরেন্দ্র লাল সেন ইংরেজি সাহিত্যে এম.এম ও বি.এল ডিগ্রি অর্জন করে চট্টগ্রাম জেলা আদালতে ব্যবহারীজীবীর পেশা অবম্বলন করেন। প্রসঙ্গত একথাও স্মর্তব্য যে যাঁর হাত ধরে চট্টগ্রামে আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চিন্তার উন্মেষ ঘটে, সেই কিংবদন্তী ব্যবহারজীবী দুর্গাদাস দস্তিদারও ধলঘাটেরই ভূমিপুত্র। উনিশ শতকের শেষ দশকে যখন কবি নবীন সেনের প্ররোচনায় উত্তরের মাদ্রাসা পাহাড় থেকে দক্ষিণের পরীর পাহাড়ে চট্টগ্রাম আদালত ভবন স্থাপিত হয়, তখন নতুন করে আইনপেশার প্রসার জমে ওঠে। এ সময় ১৭ জন উকিল মিলে যে আইনজীবী সমিতি গঠন করেছিলেন, দুর্গাদাসকেই তাতে পৌরহিত্যে করার জন্য সভাপতি পদে নির্বাচিত করা হয়েছিলো।
বিশ শতকের সবচে’ ঘটনাবহুল দশকের প্রারম্ভে বীরেন্দ্র্র লাল সেনের ঔরসে ও স্নেহলতা সেনের গর্ভে যে শিশুটি জন্ম নেবে, সেই শিশুটি যদি উত্তরকালে ধলঘাটের শিক্ষা ও বিপ্লবের ভাবাদর্শে বর্ধিত হয়ে নিজের জন্য বিদ্বৎ সভায় একটি আসন করে নিতে সমর্থ হয় তাতে আমাদের অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। যুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ছেচল্লিশের দাঙ্গা, সাতচল্লিশে র‌্যাডক্লিফ সাহেবের ছুরিতে বিভক্ত বাংলা মায়ের ন্যায় শিশুটির সত্ত্বাও বিদীর্ণ হয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য, এই শিশুটিই যে আজকের বিশ্ববিশ্রুত মনীষী, বরণীয় শিক্ষক প্রফেসর ড. অনুপম সেন তা’ আমরা ইতিমধ্যে জেনে গেছি।
ড. সেনের পিতৃ-মাতৃকুলের জ্ঞান চর্চার কথা বলেছি। ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন তাঁর জেঠামশাই কবি শশাঙ্ক মোহন সেন চট্টগ্রামেই ছিলেন এবং কবির সফর সূচি তৈরি ও সংবর্ধনার আয়োজনের সঙ্গে তিনিও যুক্ত ছিলেন। পিতৃমাতৃকুল থেকে যদি তিনি জ্ঞানচর্চার প্রেরণা পেয়ে থাকেন, তাহলে শ্বশুরের দিক থেকে তিনি পেয়েছেন বিপ্লবের উত্তরাধিকার। ড. সেনের শ্বশুর সুবোধ বল অগ্নিযুগের বিপ্লবী। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে তিনি চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন। তাঁরই কন্যার পাণিগ্রহণ করে ড. সেন একটি বিপ্লবী পরিবারের বৈপ্লবিক আবহে অবগাহনের সুযোগ পান এবং তাঁদের কাছ থেকে দেশপ্রেমের শিক্ষা লাভ করেন। অবশ্য তাঁর জেঠামশাইও দেশব্রতী ছিলেন।
শিক্ষাবিদ ও লেখক ড. অনুপম সেনকে নিয়ে এখনো কোন আলোচনা করি নি। এখন সেটাই আলোচনা করবো। ড. সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে সমাজতত্ত্বে স্নাতক সম্মান ও ১৯৬৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৭৪ সালে সমাজতত্ত্বে এমএ ডিগ্রি এবং ১৯৭৯ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রাউটলেজ এন্ড কেগানপল থেকে তাঁর ‘দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন এন্ড ক্লাস ফরমেশন ইন ইন্ডিয়া্থ গ্রন্থটি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর উত্তর আমেরিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয় যেমন, কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকার ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়; সুইডেনের টিনবারজেন বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৯ সালে অর্থনীতিতে ১ম নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত টিনবারজেনের নামে এই বিশ্ববিদ্যালয়), ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান, উন্নয়ন অর্থনীতি (ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স) ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যতালিকায় গ্রন্থটি অন্তর্ভুক্ত হয়।
প্রফেসর সেন ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান বুয়েটে) সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর (তখন সিনিয়র লেকচারার) হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে। এবারের সংগ্রাম’ এই নামে ১৭ মার্চ থেকে লালদিঘির ময়দানে সপ্তাহব্যাপী এক কর্মসূচি পালন করেন। এই অনুষ্ঠানে বাইরে থেকে যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও সংস্কৃতি কর্মী ডা. কামাল এ. খান, বিশিষ্ট নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন, কবি-অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিক প্রমুখ। ডা. আনিসুজ্জামান ও বাংলা বিভাগের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক আবু জাফরের সহযোগিতাও বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সহায়ক ও টিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে দেশে ফিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে পুনরায় যোগদান করেন।
১৯৮৪-এর জুন থেকে তিনি একই বিভাগের প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ড. সেন ১৯৮১ সালের ১২ আগস্ট থেকে ১৯৮৪ সালের ১১ আগস্ট পর্যন্ত সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, ১৯৮৪ সালের ৪ নভেম্বর থেকে ১৯৮৬ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভারতে গিয়ে মুজিব নগর সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
জন্মস্থানের মায়া কাটানো সহজ নয়। ড. সেনও তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রামের মায়ায় বাঁধা পড়েছেন, তাই তিনি চট্টগ্রাম ছেড়ে আর কোথাও গেলেন না। চাইলে যেতে পারতেন, সে সুযোগ তাঁর ছিলো। কিন্তু ৬৮-৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর এখানেই তিনি স্থায়ীভাবে থেকে গেলেন। ইচ্ছে করলে দেশের বাইরের আন্তর্জাতিক খ্যাত যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় তিনি নিয়োজিত হতে পারতেন। এমনকি ঢাকায় যাওয়ারও চেষ্টা আর করেননি।
চট্টগ্রামে তাঁর অনেক স্মৃতি; তাঁর পূর্বপুরুষের বাস, তাঁর জন্ম চট্টগ্রামে। তাঁর শৈশব, কৈশোর, তরুণ বয়স কেটেছে চট্টগ্রামে। সেইসব স্মৃতি তো ভোলার নয়। মানুষ তো স্মৃতির মধ্যেই বাস করে। স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা যা থেকে জ্ঞানের উদ্ভব-মানবজাতির সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি এই দুইয়ের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় প্রবহমান মানব সভ্যতা ও জ্ঞান। চট্টগ্রাম কোর্টে তাঁর জেঠামশাই ও তাঁর বাবা ওকালতি করেছেন। তাঁর বিখ্যাত দাদু শরচ্চন্দ্র ও নবীন চন্দ্র দাশ তাঁদের শেষ জীবন চট্টগ্রামে কাটিয়েছেন এবং চট্টগ্রামেই দেহ ত্যাগ করেছেন।
চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মানুষের জন্য তাঁর কিছু করণীয় আছে বলেও মনে করেন ড. সেন। চট্টগ্রামের অনুন্নয়ন, অশিক্ষা, পশ্চাৎপদতা এসব দূরীভূত করার ক্ষেত্রে তার বিশেষ কিছু করার নেই। কিন্তু তিনি চট্টগ্রামে অবস্থান করলে উচ্চ শিক্ষার যেমন সহায়ক হয়, তেমনি মানুষকে তিনি আলোর পথ দেখাতে পারেন। সেটা করছেনও তিনি। গত তিন দশকে চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, স্বৈরাচার বিরোধী যত প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক, বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে এবং অনুরূপ সংগঠন গড়ে উঠেছে-তার প্রায় সব ক’টির সঙ্গেই ড. সেনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যাবে। মূলত তিনিই এসব উদ্যোগ আয়োজনের মূল প্রেরণা; তাঁকে কেন্দ্র করে, তাঁর পৌরহিত্যে, তাঁর নেতৃত্বের সমস্ত সাংগঠনিক কাঠামো গঠিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতার চেতনা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি কত ভাবেই না বলে চলেছেন তাঁর বক্তৃতা, বিবৃতি ও লেখায়। বস্তুত তিনি প্রকৃতই একটি আলোকিত বাতিঘর, যিনি চট্টগ্রামকে নিরন্তর আলোর পথে আসার আহ্বান জানিয়ে চলেছেন। তিনি চট্টগ্রামের বৌদ্ধিক অভিভাবক। একই সঙ্গে চট্টগ্রামে অবস্থান করে তিনি বাংলাদেশের চিন্তা, জ্ঞান ও মননশীলতার ধারাটি সমৃদ্ধ করে চলেছেন।
প্রফেসর অনুপম সেনের রচিত বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং প্রবন্ধ সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং বিদ্বৎসমাজে নতুন চিন্তার অবকাশ সৃষ্টি করেছে। তাঁর সিএইচ, ডি-থিসিস ‘দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড ক্লাস ফরমেশন ইন ইন্ডিয়া’ (ঞযব ঝঃধঃব, ওহফঁংঃৎরধষরুধঃরড়হ ধহফ ঈষধংং ঋড়ৎসধঃরড়হ রহ ওহফরধ) গ্রন্থটি ১৯৮২ সালে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। এছাড়া ‘বাংলাদেশ: রাষ্ট্র ও সমাজ’ বইটি ১৯৮৮ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা রেনেসাঁ এবং স্বাধীনতার ওপর প্রতিফলন’ বিষয়ে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারক বক্তৃতা প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ‘ঞযব চড়ষরঃরপধষ ঊপড়হড়সু ড়ভ ইধহমষধফবংয্থ শিরোনামে আরো একটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি এখন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
তাঁর প্রকাশিত আরও দুটি গ্রন্থ : বাংলাদেশ ও বাঙালি রেনেসাঁস স্বাধীনতা – চিন্তা ও অনুসন্ধান। অনূদিত কবিতা গ্রন্থ : বিলসিত শব্দগুচ্ছ।
১৯৭১-এ বম্বের বিখ্যাত মননশীল পত্রিকা ‘কোয়েস্ট’-এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সংখ্যায় তাঁর রচিত ‘ঞযব ঝড়পরধষ ইধপশমৎড়ঁহফ ড়ভ ঃযব ইধহমষধফবংয গড়াবসবহঃ্থ শীর্ষক একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব সোসিওলোজিতে প্রকাশিত হয় ‘ঞযব ইঁৎবধঁপৎধপু ধহফ ঝড়পরড়-ঊপড়হড়সরপ উবাবষড়ঢ়সবহঃ রহ ইধহমষধফবংয্থ শিরোনামে অপর একটি নিবন্ধ। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সোসিওলোজি এসোসিয়েশন আয়োজিত তৃতীয় জাতীয় সম্মেলন এবং দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক পরিবর্তনের ওপর আন্তর্জাতিক সেমিনারে তিনি ্তুঝড়পরধষ ঈযধহমব রহ ঝড়ঁঃয অংরধ্থ বিষয়ে সভাপতির বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
প্রফেসর সেন “দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন এন্ড ক্লাস ফরমেশন ইন ইন্ডিয়া ছাড়াও অনেকগুলো গ্রন্থের পরে রাউটলেজ আবার প্রকাশ করেছে ২০১৭ সালে, ‘রাউটলেজ লাইব্রেরি এডিশন: ব্রিটিশ ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামে।
প্রফেসর অনুপম সেন ১৯৮৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ সোসিওলোজি এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, ১৯৮৮ সালের আগস্ট থেকে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ সোসিওলোজি এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।
তিনি ১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, ১৯৮৫-র জানুয়ারি থেকে ১৯৮৬-র জানুয়ারি পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন ১৯৮৫-র ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮৬-র মার্চ পর্যন্ত। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট, সিন্ডিকেট এবং একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য, সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য, কলকাতা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, ঢাকা’র সম্মানিত সিনিয়র ফেলো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের পরিচালক, চট্টগ্রাম বইমেলা (একুশ মেলা)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও বহুবারের সভাপতি। তিনি স্বাধীনতা স্মৃতি ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম-এর চেয়ারম্যান। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। বর্তমানে তিনি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন।

x