উড়াল পাখি

তহুরীন সবুর ডালিয়া

সোমবার , ২৬ মার্চ, ২০১৮ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ
61

বৃদ্ধ লোকটির সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো গোলাপ ক্ষেতের পাশে। ঠিক পাশেও নয়, আরো কিছুটা এগিয়ে উঁচু পাকা সড়কের ঢালুতে। সড়কের ঢালু যেখানে নেমে গিয়ে হাতখানেক পরেই শুরু হয়েছে বিস্তীর্ন ফসলের মাঠ, সেখানে স্বল্প পরিসরের জায়গাতে তার ঝুপড়ি ঘরখানা। অল্প ব্যবধানেই রয়েছে চটে ঘেরা প্রাতকৃত্য ও গোসলের জায়গা। সেই জায়গায় ছায়াছন্ন আলো অন্ধকারে মাথা তুলেছে কলা গাছের ঝাড়। ঠিক বৃদ্ধ লোকটিও নয় আমাকে আকর্ষণ করলো তার হরিণের মত টানাটানা চোখের ছাগল শিশুটি। যেটিকে বাগে আনতে হিমসিম খেতে হচ্ছিলো শুকনো হাড় জিরজিরে মানুষটিকে।

আমি এসেছিলাম গোলাপ ক্ষেত্রে আকর্ষিত হয়ে, বিস্তীর্ন সবুজ ফসলী ক্ষেতের মাঝখানে হঠাৎ এই গোলাপ ক্ষেত। যা শেষ বিকেলের রাঙা আলোয় মূল সড়কের উভয়পাশে ফুটে আছে অপার্থিব সৌন্দর্য্যের বিমুগ্ধতা ছড়িয়ে। একপাশে কৃষক ব্যস্ত হাতে জড়ো করে রাখছে সদ্য কেটে নেয়া ফুটন্ত লাল গোলাপ। সড়কে দাঁড়িয়ে ভ্যানগাড়ি। একটু পরেই গোলাপগুলো পাইকারী বাজার হয়ে চলে যাবে দূর দূরান্তে। হয়তো কোন বাসর শয্যায়। প্রিয় কোন মানুষের হাতে পরিপূর্ণতা পাবে এই ফুল।

গোলাপ ক্ষেত পেরিয়ে এগুতেই আকর্ষণ করলো ছাগল শিশুটি। বৃদ্ধের কাছে জানতে চাইলাম স্থানীয় কিনা। আমি নিজে বাইরের লোক। কার্যোপলক্ষে এই এলাকায় এসেছি মাস দু’য়েক হলো। এখনো তেমন করে সবটুকু চেনা হয়ে ওঠেনি।

লোকটির উচ্চারণও ঠিক স্থানীয় নয়। উত্তর চট্টগ্রামের কোন ভাষায় সে কথা বলছিল না।

দেশ কোথায় চাচা?

ওই’

দূরে কোথাও সে আঙুল উঠালো। পশ্চিমে না দক্ষিণে বোঝা গেল না সে আঙুল নির্দেশনায়।

এতদূর এলেন কি করে?’

কামলার কামে, তারপর হামার ছোলেক।’

ছোলেক ! মানে ছেলে !

সে মেলাদিন, স্বাধীনতার বছর।

কাজের খোঁজে স্বাধীনতা যুদ্ধের বছর চট্টগ্রামে আসা এই লোকটি এইখানে কোথাও হারিয়েছে তার ছেলেটি। আন্দাজে মিলিয়ে নিচ্ছি বৃদ্ধের এলোমেলো কথামালা।

হামার ছোলেক আছে গো আর আছে এক খোয়াব বটেক।’

উত্তর বঙ্গীয় টানের শেষের কথাটি ঠিক আমার বোধগম্য হল না। কিন্তু বৃদ্ধের ছেলের খোঁজে সঞ্চারিত হলো চোখ। বৃদ্ধ তার ধূসর চোখের কালো তারা প্রতিস্থাপন করলো আমার সঞ্চালিত দৃষ্টিপথে।

ছোলেক হামার দু’ডানার পঙ্খী বটেক। সে উড়াল পঙ্খী।’

উড়াল পাখি ! বৃদ্ধের ভাষায়, ছেলে তার উড়ে উড়ে পথ দেখালো মুক্তির নেশায় পাগল উদ্দীপ্ত প্রাণ কিছু তরুন যুবকদের খানাখন্দ উজিয়ে, গৃহস্থ বাড়ির উঠোন পেরিয়ে, নদীর সাঁতরে, পাহাড় ডিঙিয়ে হাটহাজারী ফটিকছড়ি হয়ে সীমান্তের ওপাড়ে, একটি অসম যুদ্ধ প্রতিরোধের জন্য সংগঠিত হতে।

লোকটির কণ্ঠস্বরে প্রত্যয়। সে প্রত্যয়ের অপার্থিব আলো রাঙা কুয়াশার মত নেমে আসছে প্রকৃতি জুড়ে। অস্তগামী সূর্যের শেষ আভা বৃদ্ধের পর্ণকুটির, গরুর গোহালে, কলা গাছের কচি সবুজ পাতায়।

অল্প দূরে পরিত্যক্ত একটি ুইস গেটকে কেন্দ্র করে অর্ধসমাপ্ত লম্বমান সড়ক। যে সড়কের অভ্যন্তরে রয়েছে নালা, দু’পাশে মজা খাল যা উভয়পাশের ধানী জমিতে সারা বছর পানি সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে তৈরি হতে হতে কোন অজ্ঞাত কারণে থেমে গেছে। তাই লোক চলাচলে ততটা সরগরম হয়ে ওঠেনি এই পথ।

বৃদ্ধ আমাকে স্মৃতিতাড়িত করলো। স্মৃতি মানে যুদ্ধের কোন স্মৃতি নয়। যুদ্ধ হয়েছে এদেশে সে আমার জন্মের পূর্বের ঘটনা। আমার স্মৃতি যুদ্ধ সংক্রান্ত বইপত্র পাঠের উৎসাহে, ডকুমেন্টারি ফিল্মে, বয়সী স্বজনদের মুখে সেই সময়কার দৃশ্যপট, ক্ষত ও বেদনা রোমন্থনে। বৃদ্ধের এলোমেলো কথাগুলো সাজিয়ে তাই আমি নিজেই একটা গল্প তৈরি করে নিতে পারি।

পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমনে ২৫ শে মার্চের মধ্যরাতে যখন এদেশে অপ্রস্তুত একটি যুদ্ধ নেমে এলো যুদ্ধ নেমে এলো সেভাবে বলছি কেন বরং অনিবার্য এক উচ্চারণ অমোঘ এক কণ্ঠের প্রত্যয় ঢাকার রেসকোর্স ময়দান থেকে ছড়িয়ে যায়, গড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশে, যেমন ধমনী থেকে শিরা, শিরা থেকে উপশিরা। আর এই গ্রামগুলো প্রকৃত বাংলাদেশ যেখানে বিস্তৃত। “স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম” শব্দের মহিমায় উজ্জীবিত উদ্দীপ্ত বাঙালি তাই ঘর ছেড়ে পথে, পথ ছেড়ে মাঠে, পাকা সড়ক এড়িয়ে খানাখন্দে ঝোঁপে ঝাড়ে, গৃহস্থ বাড়ির আঙ্গিনার উপর দিয়ে, মজা খালের পাক পেরিয়ে, উত্তাল নদী সাঁতরে দুর্গম পাহাড় ও টিলা উজিয়ে স্বপ্ন সংযোগ সড়কে। এইসব উদীপ্ত প্রাণ তরুন যুবকদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সদ্য হয়ে ওঠা আর এক উজ্জ্বল তরুন সীমান্তের ওপারে সশস্ত্র হানাদারদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে। নিতে নিতে রাত পেরিয়ে ভোর, তখন হয়তো কোন দয়ালু কৃষকের খড়গাদার ভেতর, বাঁশঝাড়ের ছায়া অন্ধকারে আত্মগোপন। দুপুর বিকেল পেরিয়ে আবার যখন রাত্রি তখন মিটিমিটি নক্ষত্র তাদের সঙ্গী। অসম্ভব কিছু নয় এই তারকারাজিরা সদ্য গজিয়ে ওঠা গোঁফের তরুনটির কাঁধে উড়িয়ে দিয়েছে দুটি ডানা। ডানা পেয়ে উড়ছে তরুন।

জ্বল জ্বল করে ওঠে বৃদ্ধের চোখমুখ। বৃদ্ধ যেনো এখনো দেখছে, তারা উড়ছে, উড়ছে বৃদ্ধের সদ্য হয়ে ওঠা তরুন পুত্রটি। তার পেছনে উড়ছে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর একদল মানুষ।

উইড়তে উইড়তে এই হামার মাথার উফরে। জমিনে খাড়ায়ে পাঞ্জাবীরা। উচায়ে ধরিছে তাদের বন্দুকের নল।’

আমি মাথা তুলে আকাশ দেখলাম। আকাশ বেয়ে দ্রুত নামছে অন্ধকারের চরাচর ব্যাপ্ত কুয়াশাবৃত চাদর। ফসলের মাঠ থেকে, মজা খালের অন্ধ গহ্বর থেকে, যেখানটায় সন্ধান করলে হয়তো বা উত্থিত হবে গণকবর ঠিক সেইখান থেকে উঠে আসছে ফেনায়িত ধোঁয়া, উঠে আসছে হিম হিম বারুদগন্ধী সাদা ধোঁয়া।

বারুদগন্ধী বলছি কেন !

আর কেনইবা বলব না! বাস্তবিক সাদা কুয়াশার আস্তরণ জনমনিষ্যিহীন এই ফসলী ক্ষেতের তেপান্তরে তৈরি করেছে এক অন্যলোকের বাতাবরন ইতিহাস যেন এই চরাচরব্যপ্ত করে নেমে আসা সন্ধ্যা ও রাতের মিহি অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে মেলে ধরেছে তার অশরীরী পাতা। সে পাতায় বৃদ্ধের চোখের অভ্যন্তরে দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা কান্নার কনা জমাট মুক্তো হয়ে তৈরি করেছে শুভ্র স্ফটিক যা থেকে সাদা কুয়াশা নয় উঠে আসছে বারুদগন্ধী গন্ধ।

অনুমান করি, মজা খালের অভ্যন্তরে যে গণকবর হয়তো ঐ গণকবরে শুয়ে আছে বৃদ্ধের তরুন পুত্র। যে ছেলে এবং তার পেছনে মুক্তিকামী জওয়ান মানুষগুলো সীমানা পেরুবার আগেই পড়ে গেছে খান সেনাদের মেশিনগানের মুখে।

লোকটিকে হঠাৎ আমার অলীক মনে হয়, মনে হয় কুহেলিকা। সহসা শিউড়ে ওঠে আমার দু’কাঁধের শিরদাঁড়া। অসম্ভব কিছু নয় ছাগল শিশুটিকে পরিচর্যারত এই বৃদ্ধ হয়তো বা লুকিয়ে রেখেছে তার শার্টের অভ্যন্তরে পরিত্যক্ত দু’খানা ডানা। যে ডানা এই বিস্তীর্ন ফসলের মাঠের উল্টোদিকে মজা খালের অভ্যন্তরে অবহেলায় অসচেতনতায় পড়ে রয়েছে যে গণকবর, সেই কবরটিকে পাহারা দেয় উড়ে উড়ে।

এরকম কতশত অনাবিস্কৃত গণকবর যে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদে ছড়িয়ে আছে, কে জানে।

x