উৎসবের রঙে নতুন স্বপ্ন

বৈসাবিতে পাহাড়ে নানা আয়োজন

আজাদী ডেস্ক

শনিবার , ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৫৮ পূর্বাহ্ণ
80

বিজু মানে আনন্দ, নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় আর প্রেরণা। উৎসবের রঙে পাহাড়ে শুরু হয়েছে বৈসাবি উৎসব। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি আছে বর্ণিল আয়োজন। বৃহত্তম এই সামাজিক উৎসবে নানা আয়োজনে মুখর পার্বত্য জনপদ। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে পাহাড়ের প্রধান সামাজিক উৎসব। পাহাড় জুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি বেড়াবে ছেলে-বুড়ো। পাঁচন আর দোচোয়ানির স্বাদে মুগ্ধ পাহাড়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে। আর বেজে উঠবে পাহাড়ি গানের সুর।
রাঙামাটিতে উৎসবের রং : রাঙামাটি প্রতিনিধি বিজয় ধর জানান, কাপ্তাই হ্রদে গতকাল সকালে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে রাঙামাটিতে শুরু হয়েছে চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই ও ত্রিপুরাদের বৈসুক উৎসব। গতকাল ভোরে চাকমা রাজবাড়ি ঘাটে আদিবাসী ফোরামের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন খীসা ও শহরের গর্জনতলীতে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা ও রাঙামাটি পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সূচনা করেন। এ সময় পাহাড়ি চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের নারী-পুরুষ হ্রদের তীরে ফুল ভাসান।
রাজবাড়ি ঘাটে ফুল ভাসাতে আসা চাকমা তরুণী তনয়া চাকমা বলেন, কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে আমরা পুরনো বছরের যত দুঃখ গ্লানি আছে তা ভুলে গিয়ে নতুন করে জীবনের পথ চলা শুরু করি। শহরের গর্জনতলী এলাকার ত্রিপুরা নারী শিখা ত্রিপুরা বলেন, হারি বৈসুকের দিনে আমরা হ্রদে ফুল ভাসিয়ে দিনটি শুরু করি। এদিন আমরা ফুল দিয়ে ঘর সাজাই। বয়স্কদের স্নান করিয়ে তাদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিই এবং বিভিন্ন ধরনের পিঠা-পুলির আয়োজন করে থাকি।
পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা বলেন, সবাই যাতে মিলেমিশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে একসাথে বসবাস করতে পারি। এসময় রাঙামাটি পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী ও জেলা পরিষদের সদস্য স্মৃতি বিকাশ ত্রিপুরা উপস্থিত ছিলেন। সকালে পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ বেদনাই যেন ভাসিয়ে দিলেন। নতুন দিনের সম্ভাবনার আলো জ্বাললেন পাহাড়ের মানুষ।
এদিকে, সকালে শহরের গর্জনতলি এলাকায় ত্রিপুরাদের হারি বৈসুক উপলক্ষে আয়োজিত বয়স্ক স্নান, বস্ত্রদান, গড়াইয়া নৃত্য এবং পানিতে ফুল ভাসানোর কর্মসূচি পালিত হয়। জলে ফুল ভাসানোর পর কাপ্তাই হ্রদে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ দুটি বিভাগে বিভক্ত হয়ে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

খাগড়াছড়িতে বর্ষবরণ : খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি সমির মল্লিক বলেন, খাগড়াছড়িতে ফুল বিজু বা নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছর বরণ করতে নদীতে ফুল ভাসানো হয়। গতকাল সকালে জেলার চেঙ্গী ও মাইনী নদীতে ফুল ভাসায় চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষেরা। ভোরের আকাশে রক্তিম সূর্যের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ফুল বিজুর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। চাকমা রীতি অনুযায়ী চৈত্র মাসের শেষ দিনে আয়োজন করা হয় ফুল বিজুর। পুরাতন বছরের গ্লানি ও দুঃখ ভুলে নতুন দিনের মঙ্গল কামনায় গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে নদীতে ভাসানো হয় নানা রঙের পাহাড়ি ফু্‌ল। এসময় দেশ ও বিশ্ব শান্তির মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করা হয়েছে।
পুণ্যার্থীরা জানান, নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বন থেকে সংগ্রহ করা বিজু ফুল ছাড়াও মাধবীলতা, অলকানন্দা, নিমপাতা, রঙ্গন, জবা ফুলসহ বাহারি ফুল কলাপাতায় করে নদীর জলে ভাসানো হয়। ঐতিহ্যবাহী সাজ-পোশাকে চাকমা তরুণ-তরুণীরা ফুল বিজুতে অংশ নেয়।
ফু্‌ল বিজু চাকমাদের উৎসব হলেও ত্রিপুরা ও মারমারাও এতে অংশ নেওয়ায় তা সর্বজনীন রূপ পায়। চাকমাদের প্রধান উৎসব বৈসাবির আয়োজন চলবে আগামী তিন দিন। আগামীকাল চাকমাদের মূল বিজু।
এদিকে, খাগড়াছড়িতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে শুরু হয়েছে ত্রিপুরাদের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসু। এ উপলক্ষে গতকাল সকালে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা প্রাঙ্গণ থেকে বর্ণিল শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রা উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা নিজস্ব পোশাক পরে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।
শোভাযাত্রা শেষে শহরের খাগড়াপুর এলাকায় বৈসু মেলা উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক। মেলায় ত্রিপুরাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী গড়িয়া নৃত্য। বৈসু মেলা চলবে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত।
নদীতে ফুল ভাসালেন তরুণ-তরুণীরা
বান্দরবান প্রতিনিধি আলাউদ্দিন শাহরিয়ার জানান, বান্দরবানে বৈসাবি উৎসবে মেতেছে পাহাড়ের মানুষ। তারা অনেক কাল ধরে ভিন্ন নামে পালন করে বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসব। মারমা ভাষায় সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিষু এবং চাকমা ভাষায় বিজুর সংক্ষেপিত রূপ হচ্ছে বৈসাবি।
গতকাল সকালে বালাঘাটা মুুখে সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু এবং চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু উৎসব শুরু হয়েছে। ফুল পূজায় চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোর এবং নারী-পুরুষ অংশ নেয়। পরে বালাঘাটা বিলকিছ বেগম স্কুলমাঠে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ঐহিত্যবাহী ঘিলা খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঘিলা খেলা টুর্নামেন্টে ৩২টি পাড়ার তরুণ-তরুণীরা অংশ নেয়।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ঘিলা খেলা টুর্নামেন্টে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং।
বিষু উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব উজ্জল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ঘিলা হচ্ছে জঙ্গলি লতায় জন্মানো এক প্রকার বীজ বা গোটা। ঘিলা তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নানা কাজে ব্যবহৃত হয়। তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, ঘিলার লতায় ফুল থেকে বীজ জন্মালেও এর ফুল পবিত্র দেবংশি (স্বর্গীয়) বস্তু হওয়ায় সাধারণ মানুষ ঘিলা ফুলের দেখা পায় না। যারা মহামানব হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন তারাই একমাত্র ফুলের দেখা পান। ফুলের পরিবর্তে ঘিলা পবিত্র হিসেবে সংগ্রহে রাখে তঞ্চঙ্গ্যারা। ঘিলা বাড়িতে রাখলে বজ্রপাত, বিপদ এবং অপদেবতা বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে না।
বিজু উৎসব কমিটির সদস্য বিকাশ চাকমা বলেন, পুরনো বছরের যত অমঙ্গল এবং দুঃখকষ্ট রয়েছে, সেগুলো বিজু উৎসবে নদীতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে ধুয়ে মুছে ফেলি। নতুন বছরকে অতিথি আপ্যায়নের মাধ্যমে বরণ করি।
মারমা অধ্যুষিত বান্দরবানে সাংগ্রাই উৎসবে ‘মিলব আমরা সকলে একত্রিত হয়ে, শুদ্ধ হব মৈত্রী বারি বর্ষণে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে পুরাতন রাজবাড়ি মাঠ থেকে আজ সকাল আটটায় সাংগ্রাই র‌্যালির মাধ্যমে শুরু হবে ৪ দিনব্যাপী সাংগ্রাই উৎসব। এরপর পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগী এবং ১১টায় বয়স্ক পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
পরের দিন দুপুর আড়াইটায় উজানী পাড়ায় সাঙ্গু নদীতে অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র বুদ্ধমূর্তি স্নান। রাতে উজানী পাড়ার বিসিক গলি, মধ্যমপাড়ার ছয় নম্বর গলি, জাদীপাড়া গলিসহ বিভিন্ন মহল্লায় তরুণ-তরুণীদের পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা চলবে।
সাংগ্রাই উৎসবের মূল আকর্ষণ মৈত্রী পানি বর্ষণ জলকেলী উৎসব অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৫ ও ১৬ এপ্রিল বিকালে জেলা শহরের পুরাতন রাজবাড়ি মাঠ, সদর উপজেলার রেইছাথলি পাড়া ও রোয়াংছড়ি উপজেলার হাই স্কুল মাঠে। জলকেলীতে বিবাহিত নারী-পুরুষ অংশ নিতে পারে না। জলকেলীর মাধ্যমে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
এছাড়া পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা, বৌদ্ধ বিহারগুলোতে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনসহ নানা আয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক কোকোচিং মারমা।

x