উৎসবমুখর জীবনের প্রতিশ্রুতি

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১৫ জুন, ২০১৯ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
26

ঈদ-আনন্দ, ঈদের ছুটি, বন্ধুত্ব এবং বেড়ানোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গা থেকে ধর্ষণের খবর এসেছে প্রচুর। ঈদে মানুষ ঘরমুখো হয়, ঘরের টানে ঘরে ফেরে। কিন্তু ঘর কেন আনন্দ দিতে পারে না আমাদের মেয়েদের, বধূদের? দুদিনের বা দুকলমের বন্ধুত্বের টানে ঘর ছেড়ে অচেনা দূরত্বে কিসের টানে ঘোরাঘুরি?
ঈদ আসে, ঈদ যায়। ঈদ গেল। ঈদমুখো আনন্দ থেকে ঈদের আনন্দ সবই হলো। যার যার মতো করে সবার সবকিছুই তো হয়। তবে সব শুরুর যেমন একটি শুরু থাকে সব শেষেরও তেমনি অন্যরকম আর একটি শেষ থাকে। সে গল্প দিয়েই শুরু করা যাক।
উৎসবের দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত নামতেই নির্বিঘ্ন একটি ঘুমের রাতের কথা ভেবে অন্যরকম একটা আনন্দ হলো। এক মাস ধরে সাহরীর আয়োজনটি যাঁরা একা হাতে করে থাকেন শুধু তাঁরাই জানেন শেষ রাতের কাঁচা ঘুম ভাঙা অনভ্যস্ত প্রহরটিকে সহনীয় থেকে আনন্দময় করে তোলার কাজটি তাঁরা কিভাবে করেন। ঈদরাত পোহালে মাসজুড়ে বন্ধ রাখা প্রাতঃভ্রমণের ভোরটির সঙ্গে নতুন করে দেখা হবার যে আনন্দ সেটাকেও ঈদের আনন্দ বলেই ধরে নিচ্ছি। কাঁটায় কাঁটায় পৌনে পাঁচটায় সকাল। পথে নামতেই মনপ্রাণদেহ জুড়িয়ে দেওয়া জলো বাতাস। বাতাসে ছিটেফোঁটা জলকণার আভাস। ঝরা বকুলের চেনা সুবাস জায়গায় জায়গায় চলার গতি থামিয়ে দেয়। ফিরে ফিরে এসে দাঁড়ায় বকুল কুড়োনো, বকুলের মালা গাঁথা শৈশব-কৈশোর। কিন্তু থমকে দাঁড়ালে সময় নষ্ট। পত্রপল্লবের ভারী ওভারকোট গায়ে জড়িয়ে সটান দাঁড়িয়ে দেবদারু যেন সচেতন করে দিচ্ছে : থামতে নেই। সময় কম। চলাই জীবন। চলতে চলতে আমাদের ৫ নম্বরের ঠিক মধ্যবিন্দুতে কালভার্ট জুড়ে বিশালকায় ছাতার মতো গাছটির সরু সরু ডালে চিরল পাতার ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টি গোলাপী ফুলের আভাস; অচিরেই ডালের গা বেয়ে নামবে হাল্কা গোলাপী প্রপাত। আহা, কি আনন্দ সামনে। কদম্ববন এখন স্বপ্নমগন, সামনে বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলের অপার দানের স্বপ্ন তার ডালে ডালে, পাতায় পাতায়। এইসব দেখাশোনার আনন্দ নিয়ে ঘরে ফেরা অন্য রকম আনন্দ মন ভরে রাখে বহু বহুক্ষণ।
ঈদের আনন্দের অনুষঙ্গী হয়ে আসা বা থাকা আরও কিছু আনন্দের কথা বলতেই হয়। কিন্তু সবার আগে প্রতিটি পরিবারে আনন্দের উৎসবিন্দুতে বা কেন্দ্রস্থলে বসবাস করা সেই নারীর কথা বলতে হয় শেষ পর্যন্ত যার নিজের আনন্দ একরাশ ক্লান্তি ভিন্ন আর কিছু নয়। রোজা রেখে, রোজার যাবতীয় পুণ্যসঞ্চয়ে ব্রতী থেকে একটি মাস সংসার পরিচালনার ফাঁকে ফাঁকে ঈদ আয়োজনে তাকে প্রচুর কাজ করতে হয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন আর কেউ হাত লাগায় না? কেউ মাথা ঘামায় না? মানতে হবে, মাথা ঘামান, হাত লাগান কেউ কেউ। ধরা যাক সকলেই। কিন্তু ‘সংসার’ নামের খেলাঘরটাতে ক্ষুদ্র-তুচ্ছ, ছোট-বড়, সরল-জটিল কত শত কাজ (অকাজ!) নীরবে, নিঃশব্দে (ও গঙ্গা বইছো কেন’রই মতো) শুধু একজনকে করে যেতে হয়- সম্পূর্ণ দায়িত্বভার না নিয়ে সেটা বোঝার চেষ্টাও অনেকের পক্ষে অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, সত্যটা হচ্ছে এই যে, ছবিটা বদলাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল তার শ্রম ও ক্লান্তি বোঝার মতো মানুষটিকে পাশে পেলেই নারী ধন্য হয়েছে। দিনে দিনে কঠিন হয়েছে নারী। একটু হাত লাগাও। একটু রেহাই দাও। এই করতে করতে কতকাল বাদে আজ বেশ কিছু পরিবারে নারীর অবস্থান স্বস্তিদায়ক, আনন্দময়। কিন্তু সংখ্যায় তারা পরিসংখ্যানের জরিপের আওতায় আসার মতো নয় এখনও। তবে পথে আসতে হবে সবাইকে। সমতাই শেষ সত্য। আনন্দকে দুঃখের মতো ব্যাপ্ত ও গভীর হতে হবে। সেজন্য নারীর দুঃখটা বুঝতে হবে সবাইকে।
খাবার-দাবার ঈদের অন্যতম আকর্ষণ। প্রধানও বলা যায়। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি খাদ্যবস্তু বা পোশাক পরিচ্ছদে ঐতিহ্য বিলুপ্তির আনন্দে মত্ত। ঋতুভেদে পোশাকের স্বাচ্ছন্দ্য বা স্বাস্থ্যপ্রদ খাবারদাবারের সঙ্গে উৎসবের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাই যেন স্বাভাবিক। এই তীব্র দাবদাহের মধ্যে ঈদ; আরামদায়ক সুতীর পোশাক সেখানে কল্কে পেল কি? আজাদীর খোলা হাওয়ার পাতায় হেমসেনলেনের দর্জি এ্যাপোলো বড়ুয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গরমে সুতীর কাপড়ের চাহিদা থাকে। কিন্তু গরম হোক বা ঠান্ডা হোক ঈদ তো স্পেশাল। সূতীর মধ্যে স্পেশাল কম থাকে। এ্যাপোলো নিজের কথা বলেননি। বলেছেন ভোক্তার রুচি ও পছন্দের কথা। এমন গরমেও তাই সুতী স্পেশাল হয় না। নির্ভেজাল একখানা সুতী শাড়ি আজ প্রায় সোনার পাথরবাটি। টাঙ্গাইল বা পাবনার সুতিতেও এখন ফুলপাখি পাতালতার উৎকট রঙ এবং জরির বিন্যাস সুতীকে আর সুতী থাকতে দিচ্ছে না। ঠান্ডা ঘরে যাঁদের সার্বক্ষণিক বসবাস তারা না হয় যা খুশী পারছেন কিন্তু অন্যরা? শুধু ফ্যাশন, ডিজাইন এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে ভেবে হাসিমুখে পোশাকের যন্ত্রণা বহন করে এমন কি শিশুরাও। কিন্তু কেন?
খাবার-দাবারে একটা হিসেবের অঙ্ক আজকাল বেশ চালু হয়েছে। কটা পদ রান্না হলো? পদের সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে খাবার টেবিলে ল্যাজে-গোবরে অবস্থাটা অনেকে মুখ বুজে সয়ে যান। কাচ্ছি থাকুক তবু পোলাও চাই। তারও এমন কেন, ওটা নয় কেন? ওদিকে খাসি-গরু-মুরগী সবই চাই এবং রান্নায় চাই নতুনত্ব। মৎস্য বাদ যাবে না তবে চাই ভাপ বা গ্রীল। ভর্তাও থাকবে তবে দীনজনের মতো নয়, বাহারি সাজের গৌরবে। কিন্তু কেন? কত খায় মানুষ? কত খেতে পারে? স্বজন বন্ধুজন যখন একসঙ্গে আহারে বসে তখন আহা রে (!) টাই তো আনন্দ। দু’একটা বিশেষ পদ যার যার রুচি ও হাতের গুনের স্বাদে অনন্য হতেই পারে। একবার ভাবুনতো গৃহকর্মীকে ঈদের ছুটি না দেওয়ার মতো অপরাধ কতটা নির্মম? এত এত থালাবাসন ধোয়া এবং এত এত নষ্ট বা এঁটো খাবার ফেলে দেবার যন্ত্রণার কথাও ভাবতে হবে। ঈদ কিন্তু সবার।
হ্যাঁ, তানিয়াও ঈদ করতে চেয়েছিল। ঈদেরও আগে পয়লা রোজাটিই করতে চেয়েছিল বাবা ও মাতৃহীন ভাইবোনদের সঙ্গে। রাত সাড়ে আটটার দিকে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব সড়কে গজারিয়া বিলপাড় এলাকায় বাসচালক ও তার ২ সহযোগী নার্স শাহীন আক্তার তানিয়াকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে। জনগণের তীব্র বিক্ষোভের মুখে ঢাকা-কাটিয়াদী-পিরুজপুর রুটে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় সরকারি নির্দেশে। কিন্তু সামনে ঈদ বলে কথা। তাই বাসের রঙ এবং নাম পাল্টে একই রুটে চালানোর চেষ্টা চলে। কিন্তু চলেনি সে বাস। জানাজানি হয়ে গেছে। তানিয়ার ঈদ যারা কেড়ে নিয়েছে তারা মনের আনন্দে ঈদ করবে তা যে হলো না এতে আমাদের ঈদে কিছু আনন্দ যোগ হলো তো?
ফেনীর নুসরাতেরও এবার ঈদ করা হয়নি। তবে সোনাগাজী পৌরসভার একটি সামাজিক কবরস্থানে চিরঘুমে অচেতন নুসরাতের কবর জেয়ারতে ঈদ উপলক্ষে মানুষের ঢল আমাদের ঈদের আনন্দে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। খবরে এসেছে ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনও ওই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করেছেন। নুসরাতের জবানবন্দির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবার অপরাধে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন এই আইনজীবী। সে মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই ঢাকায় সাইবার নিরাপত্তা ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে।
নুসরাতের মামলাটি নিয়ে প্রচুর কথা হয়েছে। ‘দৃষ্টান্তমূলক’ এই মামলাটি আমাদের ঈদ আনন্দ কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারতো। কিন্তু তা হলো না। ১১ জুন সম্পাদকীয় কলামে (দৈনিক প্রথম আলো) এসেছে, ‘যে প্রক্রিয়ায় ‘পরোয়ানা হাতে পাই নাই’ যুক্তি দিয়ে মোয়াজ্জেমকে ঈদের ছুটি ভোগ ও পালাতে সাহায্য করা হলো তা সত্যিই অমানবিক, অগ্রহণযোগ্য এবং লজ্জাজনক এক লুকোচুরির শামিল। আসলে ধর্ষণের ঘটনা তো অহরহ ঘটছে। নুসরাতের ঘটনার পর হাত-পা বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টাও হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাতে পারে কজন? সাধারণ মানুষের আশা ভরসার জায়গাটি তো থানা। সেক্ষেত্রে ওসি মোয়াজ্জেমের ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের ভূমিকার বিচার বিভাগীয় তদন্তের টিআইবির সুপারিশের সঙ্গে আমরা একমত এবং সোচ্চার।
ঈদ-আনন্দ, ঈদের ছুটি, বন্ধুত্ব এবং বেড়ানোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গা থেকে ধর্ষণের খবর এসেছে প্রচুর। ঈদে মানুষ ঘরমুখো হয়, ঘরের টানে ঘরে ফেরে। কিন্তু ঘর কেন আনন্দ দিতে পারে না আমাদের মেয়েদের, বধূদের? দুদিনের বা দুকলমের বন্ধুত্বের টানে ঘর ছেড়ে অচেনা দূরত্বে কিসের টানে ঘোরাঘুরি? ধর্ষণ তো অগ্নি সন্ত্রাসের চেয়েও ভয়াবহ, ধর্ষণ মৃত্যুর অধিক মৃত্যু।
সম্প্রতি প্রিয় লেখকের কলামের উপশিরোনামে ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’ শব্দ বন্ধের উপর চোখ পড়তেই কেন্নোর মতো গুটিয়ে গেছি আসমগ্র সত্তাসহ। কেন হলো এমন? সংস্কৃতির প্রয়োগ অপপ্রয়োগ তো আকসার হচ্ছে। তাই বলে ধর্ষণের সংস্কৃতি? মনে পড়ছে উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনার কথা। ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ কথাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার গায়ে ‘ভুয়ার কলঙ্ক’ মানায় না। আমাদের কলাম লেখক কিন্তু সংস্কৃতির শিক্ষক। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সংস্কৃতি মনস্ক করে গড়ে তোলার লড়াইটি তিনি করে যাচ্ছেন একরকম একা হাতে। তাঁর কথা ধার করেই বলছি, ‘এ সমাজ সুস্থ সমাজ নয় যেখানে নারী শরীরী ধর্ষণ ছাড়াও পুরুষের কথায়, ইঙ্গিতে, স্পর্শে, ব্যাপকহারে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।’ এ মুহূর্তে বলতে ইচ্ছে করছে-নারীকে নির্যাতনমুক্ত জীবন দিন নারী দেবে উৎসব, উৎসবমুখর জীবন।

x