উৎকণ্ঠা জয় করে প্রশ্ন ফাঁসহীন নির্বিঘ্ন পরীক্ষা

রতন বড়ুয়া

মঙ্গলবার , ৩ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
314

প্রশ্নফাঁসহীন পরীক্ষার কথা যেন ভুলেই গিয়েছিল দেশের মানুষ। প্রাথমিক সমাপনী থেকে শুরু করে সব ধরনের পাবলিক পরীক্ষা তো ছিলই, বাদ যায়নি ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষাও। বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত এসএসসির প্রতিটি পরীক্ষাই যেন সমার্থক শব্দ হয়ে উঠেছিল এক একটি বিভীষিকার। তাই এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে উৎকণ্ঠার পাশাপাশি আতঙ্কও ছিল পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকের মাঝে। তবে প্রশ্ন ফাঁসের উৎকণ্ঠা থাকলেও নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের প্রথম দিনের পরীক্ষা। কোথাও প্রশ্নফাঁসের খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি গুজবও শোনা যায়নি। এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থীঅভিভাবকরা। আর প্রশ্ন ফাঁসহীন ও গুজবহীন এমন পরীক্ষা শেষে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে প্রশাসন, শিক্ষাবোর্ড ও মন্ত্রণালয়ে। যেন বহুদিন পর এক চিলতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার উপল পেলেন এসব দফতরের কর্মকর্তারাও। তাঁরা বলছেনপ্রশ্ন ফাঁস রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সব মহলের সতর্ক তৎপরতা সারাদেশের মানুষের উৎকণ্ঠাকে জয় করতে সক্ষম হয়েছে।

এদিকে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ভাবেই প্রথম দিনের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান। ৯৯৮ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলেও বহিস্কারের কোন ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান তিনি।

সোমবার বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা শেষে আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ফয়সাল নামের এক পরীক্ষার্থীর সাথে কথা হয়। ওমরগণি এমইএস কলেজের এই শিক্ষার্থীর কেন্দ্র পড়েছে হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজে। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে কিছু শোনা গেছে কিনা জানতে চাইলে ফয়সাল বলেএ রকম কিছুই শুনিনি। বন্ধুদের কাছেও কিছু শুনিনি। শান্তিপূর্ণ ভাবে পরীক্ষা দিতে পেরেছি। নৈর্ব্যত্তিক কয়েকটা কঠিন মনে হলেও সব মিলিয়ে পরীক্ষা ভালো হয়েছে বলেও জানায় ফয়সাল।

এনায়েত বাজার মহিলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে প্রান্তিকা বড়ুয়া। তার পরীক্ষা কেন্দ্র নগরীর ইসলামিয়া কলেজে। গতকাল নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পেরে অনেক খুশি প্রান্তিকা। সে জানায়– ‘আমার পরীক্ষা ভালো হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি জেনে ভালো লাগছে।’ বাকি পরীক্ষাগুলোও এভাবে নির্বিঘ্নে দিতে চায় প্রান্তিকা।

প্রশ্ন ফাঁস ছাড়াই পরীক্ষা হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন প্রান্তিকার মা শিক্ষিকা কমলতা বড়ুয়া। তিনি বলছিলেনগত এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের খবরে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। শঙ্কায় ছিলামমেয়ের এইচএসসি পরীক্ষায়ও যদি এমন ঘটনা ঘটে। তাহলে মেয়ের দুই বছরের সব পরিশ্রমসব কষ্ট তো বৃথা যাবে। তবে প্রথম দিন তো ভালো মতোই শেষ হয়েছে। এ নিয়ে আমরা কিছুটা হলেও সন্তুষ্ট। বাকি পরীক্ষাগুলোও ভালোয় ভালোয় শেষ হলেই হয়।

এদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষা প্রশাসনের তৎপরতার কারণেই প্রশ্ন ফাঁসের অপবাদ প্রথম দিন স্পর্শ করতে পারেনি বলে মনে করেন অপর এক অভিভাবক আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসান। তিনি বলেনপ্রশ্ন ফাঁস বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের সতর্ক তৎপরতা কিছুটা হলেও কাজ দিয়েছে বলে আমি মনে করি। যার সুফল আমরা সোমবার এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন পেলাম। যে নিয়মগুলো করা হয়েছে তা পালনে কঠোর ভাবে তদারকির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব মহলের তৎপরতা অব্যাহত থাকলে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতেও এ অপবাদ থেকে মুক্তি মিলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই আইনজীবী।

মিডিয়া, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন, শিক্ষাবোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ সতর্কতায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন আবু বক্কর নামের আরেক অভিভাবক। সব মহলের এই সতর্কতা ও তৎপরতা অব্যাহত রাখার দাবিও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সকলের সতর্কতার কারণেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম। তিনি বলেনমন্ত্রণালয়ের বিশেষ কিছু পদক্ষেপ এবার প্রশ্ন ফাঁস রোধে কাজ দিয়েছে। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরের তৎপরতাও সুফল বয়ে এনেছে। সবাই সহযোগিতা করলে প্রশ্ন ফাঁস রোধ অসম্ভব নয়, সেটাই প্রতীয়মান হলো বলেও মনে করেন শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান।

অন্যদিকে, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস না হওয়ার কৃতিত্ব সংশ্লিষ্ট সব দফতরকেই দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব চৌধুরী মুফাদ আহমেদ। তিনি বলেনসংশ্লিষ্ট সব দফতরের কমকর্তারা তৎপর থাকায় প্রশ্ন ফাঁসকারী বা চক্র সফল হয়নি, ব্যর্থ হয়েছে। এ কৃতিত্ব সকলের।

প্রশ্ন ফাঁস রোধ করতে পারায় পরীক্ষার দায়িত্ব পালনকারী সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন। প্রথম দিনের এ ধারা অব্যাহত রাখার আহবান জানিয়ে নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে তিনি লিখেছেন– ‘পরীক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী সকলের নিকট বিনীত নিবেদন কেউই পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে যাবেন না। আমি এবং আমার মন্ত্রীও নেই না।’

x