উন্নয়ন পরিকল্পনায় নদীকে গুরুত্ব দিতে হবে

নদ-নদীকে হাইকোর্টের জীবন্ত সত্তা ঘোষণা

রবিবার , ১৪ জুলাই, ২০১৯ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ
42

 

নদীকে আইনি ব্যক্তি এবং আইনি ও জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২৮৩ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশিত হয়। এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে উল্লেখ করে সংক্ষিপ্ত রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, মানুষের জীবনজীবিকা নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানবজাতি টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নদী। নাব্য সংকট ও বেদখলের হাত থেকে রক্ষা করা না গেলে বাংলাদেশ তথা মানব জাতি সংকটে পড়তে বাধ্য। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকার আইন প্রণয়ন করে নদীকে বেদখলের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে জাগরণ শুরু হয়েছে। রায়ে হাইকোর্ট, তুরাগ নদীকে লিগ্যাল পারসন (আইনগত ব্যক্তি) ঘোষণা করে বলা হয়েছে অবৈধ দখলদাররা প্রতিনিয়তই কমবেশি নদী দখল করছে। অবৈধ স্থাপনা তৈরি করায় সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদী। এসব বিষয় বিবেচনা করে তুরাগ নদীকে লিগ্যাল ও জুরিসটিক পারসন হিসেবে ঘোষণা করা হলো। রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবহমান সব নদনদী একই মর্যাদা পাবে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।

উচ্চ আদালত তুরাগ নদীকে জীবন্ত সত্তা আখ্যায়িত করে যে রায়টি দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী, চলমান মানুষ মাত্রই জীবন্ত সত্তা। নদনদীও তাই। কবিদের অনেকেই নদীকে জীবন্ত সত্তা মনে করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর বলাকা কাব্যগ্রন্থের ‘চঞ্চলা’ নামধেয় কবিতায় নদীকে জীবন্ত সত্তা বলেই মনে করে নদীকে সম্বোধন করেই কবিতাটি শুরু করেছেন। বিদ্রোহী কবি নজরুল তাঁর ‘সিন্ধু হিল্লোল’ কাব্যগ্রন্থের ‘সিন্ধু’ শিরোনামে নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবেই ধরে নিয়েছেন। উচ্চ আদালতও নদনদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবেই মনে করেছেন। তাই, একজন মানুষ যেমন আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ পান, তেমনই নদনদীরও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ হলো বাংলাদেশে। এদেশে নদনদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার রায় এ প্রথম। এর আগে নিউজিল্যান্ড নদনদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা দিয়ে আইন পাস করেছে। ভারতের আদালতও গঙ্গাযমুনাকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা দিয়ে রায় দিয়েছেন। তাই নদনদীর জীবন প্রবাহ রক্ষা করতে হলে দেশের বাকি সব নদীকেও জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করা অপরিহার্য। কারণ অবৈধভাবে বিত্তশালী ও ক্ষমতাশালীরা প্রতিনিয়ত নদী দখল করছে। গড়ে তুলছে অবৈধ স্থাপনা, যাতে নদী ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এমন কি অনেক ক্ষেত্রে নদীর প্রবাহও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে অন্যান্য নদনদীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা দরকার। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আট শতাধিক নদনদী এবং ৫৭টি আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদী রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান, সিকিম এমন কি চীনও জড়িত। কাজেই আন্তঃদেশীয় পানি ব্যবস্থাপনা ও সুষম পানি বণ্টনের ক্ষেত্রেও এসব দেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। অতঃপর পানি সম্পদের সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার জন্য উন্নয়ন সহযোগী ১২টি দেশের সহযোগিতায় ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান (বিডিপি) ২১০০’ নামে একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত এ পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় আগামী ১০০ বছরে পানির প্রাপ্যতা, এর ব্যবহারসহ প্রতিবেশ ও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় রাখা হয়েছে। একে আরো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নদী পথের গুরুত্ব অনস্বীকার্য, বিশেষ করে পণ্য ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে। অবশ্য দেশের বেশির ভাগ নদনদী বৃষ্টি ও বর্ষা মৌসুম ছাড়া অন্য সময় নাব্য থাকে না। তাই সারা বছর নৌ পথগুলো সচল রাখা যায় না। অনেক জায়গাতে নদনদী ভরাট হয়ে ক্ষীণ ধারা বা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কেবল তীর নয়, নদীও দখল হচ্ছে। সেসব জায়গায় চাষবাস হয়, গড়ে ওঠে জনবসতি। এ পরিস্থিতিতে নাব্য উন্নয়ন ও শিকস্তি পুনরুদ্ধার করে অভ্যন্তরীণ নৌপথে সারা বছর নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। দেশের নদনদীতে প্রায় সবখানেই নাব্য সংকট রয়েছে। নদী ভাঙনের সমস্যাও কম নেই। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এক সময় নদী পথই ছিল পণ্য পরিবহনের অন্যতম সহজতর ও বিপণনের সাশ্রয়ী উপায়। নদী পথে পণ্য সহজে, সবচেয়ে কম খরচে, কম ঝুঁকিতে বা দুর্ঘটনা মোকাবেলা করে পরিবহন করা যায়। নদী পথের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য, এক নদী আরেক নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। উৎসস্থল ও সমুদ্র মোহনায় মিলিত হওয়ার স্থান ছাড়া নদীর চলার কোন শেষ বা প্রান্ত নেই। অন্য কোন যোগাযোগ বা পরিবহন ব্যবস্থায় এমন অবারিত, অবাধ ও উন্মুক্ত যোগাযোগের সুযোগ কম। এজন্যই নদী ও নদী পথ পণ্য পরিবহন এবং শিল্পবাণিজ্য বিকাশের ক্ষেত্রে অনবদ্য ভূমিকায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। বিশ্বের সমুদয় বড় বড় নগর ও শিল্পাঞ্চল এবং বাজার ব্যবস্থা এজন্যই নদী বন্দরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। আরো একটি বিষয় হলো, শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহন এবং উৎপাদিত পণ্য বিপণনে সহজতর পরিবহন ব্যবস্থা নদী পথেই মেলে। বর্তমানে সড়কপথের ওপর অত্যধিক নির্ভরতার কারণে পণ্য পরিবহন ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও হয়ে পড়েছে সড়ককেন্দ্রিক। এতে দুর্ঘটনা বেড়ে উঠছে। অথচ দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা নদী পথ ব্যবহার করে সুন্দর ও আরামদায়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত সহজেই। এটা হতো ব্যয়সাশ্রয়ী এবং যানজট সমস্যাও এড়ানো যেত এর মাধ্যমে। এক্ষেত্রে নদীকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো প্রয়োজন। নদী বন্দরগুলোর উন্নয়ন, নৌপথের নাব্যতা প্রতিষ্ঠা, মানসম্পন্ন নৌযান ও সেবা নিশ্চিত করা দরকার। বাংলাদেশের শিল্পবাণিজ্য বিকাশের পটভূমিতে নদীর অবদান অসামান্য। এদেশের এমন কোন জেলা, নগর বা জনপদ নেই যা নদীপথ ব্যবহার বা কেন্দ্র করে নদী তীরে গড়ে ওঠেনি। নদী পথেই বড় বড় বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করে তাদের শিল্পবাণিজ্য ভাবনার বিকাশ সাধন করে চলেছেন। এক সময় নদীকে ব্যবহার করে নদী তীরে গড়ে উঠেছিল যে শিল্পবাণিজ্য ব্যবস্থা, সেই নদীকে তার নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে বেগবান হয়ে গড়ে ওঠার পথে রাখতে পারলে শিল্প বিকাশে নদীর ভূমিকা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার সুবাদে বড় শিল্পকারখানা সমতল ভূমির জমি বিনষ্ট করে গড়ে উঠলেও বর্জ্য অপসারণ ও পণ্য পরিবহনের অবাধ সুযোগ রহিত হয়ে এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি সরবরাহের অপ্রতুলতায় শিল্পের ধরন, চরিত্র, উপায়, উপকরণও বদলে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় যে সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে তা হলো, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য অপসারণ। সড়ক ও বাড়তি বসতি নির্মাণে বড় বড় জলাশয় ভরাট করে পানিপ্রবাহের গতিধারা বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে এবং এতে অতিবর্ষণে আসা পানি দ্রুত অপসারণের পথে বাধা পাচ্ছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

সারাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য খরস্রোতা নদী। বর্তমানে জীর্ণ শীর্ণ বা মরণাপন্ন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক নদী এরই মধ্যে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। এজন্য দায়ী কিছু মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড ও অদূরদর্শিতা। দেশের নদনদীগুলোকে মৃত্যুর হাত থেকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এজন্য আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। আশা করি, সরকার দেশের সব নদনদী রক্ষার এবং একই সঙ্গে অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।

x