উন্নয়ন চাইলে গ্যাসের বর্ধিত দাম মেনে নিতে হবে

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ।। ‘তারা এ অঞ্চলে আগুন লাগানোর চেষ্টা করছে’

মঙ্গলবার , ৯ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ
1061

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি চাইলে আন্দোলন না করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি মেনে ‘নিতেই’ হবে। আর কেন গ্যাসের দাম বাড়ানো জরুরি সে বিষয়ে সরকারের যুক্তিগুলো তিনি তুলে ধরেছেন এক সংবাদ সম্মেলনে।
সরকার গত ৩০ জুন সব পর্যায়ে গ্যাসের দাম গড়ে ৩২.৮ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিলে তার প্রতিবাদে রোববার সারা দেশে আধাবেলা হরতাল করে বাম গণতান্ত্রিক জোট। বিএনপি ও তাদের কয়েকটি শরিক দলও সেই হরতালে সমর্থন দেয়। সামপ্রতিক চীন সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে প্রধানমন্ত্রী গতকাল সোমবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এলে একজন সাংবাদিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং এর প্রতিবাদে আন্দোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের আগে ঠিক করতে হবে, তাদের গ্যাসের প্রয়োজন আছে কিনা। আমরা যদি দেশের উন্নতি করতে চাই, এই এনার্জি একটা বিষয়। আপনারা যদি লক্ষ্য করেন, ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি কতটুকু বেড়েছে? আর আমরা এখন জিডিপি ৮.১ শতাংশ পর্যন্ত অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এর কারণ আমরা এনার্জির ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছি। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।
শেখ হাসিনা বলেন, বিদ্যুৎ আমদানি বাড়াতে পারলেও বাংলাদেশকে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। আর এলএনজি আমদানির জন্য খরচও বেশি পড়ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে, এটা যদি না বাড়ানো হয়, তাহলে আপনাদের কাছে দুটো পথ আছে। হয় আমরা এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়ে এনার্জির ক্ষেত্র সংকুচিত করে ফেলব, তাতে উন্নতি হবে না। আর যদি সত্যিই অর্থনৈতিক উন্নতি চান, তো এটা তো মেনে নিতেই হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিল্পায়ন করতে হলে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হলে, সার উৎপাদন করতে হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ হতে হলে সরকারকে এলএনজি আমদানি করতেই হবে। এলএনজি আমদানি করতে আমার কত টাকা খরচ হয়, সেই হিসাবটা তো আগে জানতে হবে। প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে আমাদের খরচ পড়ে ৬১.১২ টাকা। সেটা আমি দিচ্ছি ৯.৮০ টাকায়।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করতে গিয়ে যারা ভারতে দাম কমানোর প্রসঙ্গ তোলেন, তাদের উদ্দেশে দুই দেশের গ্যাসের দামের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভারতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম গৃহস্থালীতে স্থানভেদে ৩০ থেকে ৩৭ টাকা, শিল্পে ৪০ থেকে ৪২ টাকা, সিএনজি ৪৪ টাকা আর বাণিজ্যিকে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। আর বাংলাদেশে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম গৃহস্থালীতে ১২.৬০ টাকা, শিল্পে ১০.৭০ টাকা সিএনজি ৪৩ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ২৩ টাকা।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এলএনজি নিয়ে এসে যেটা ৬১.১২ টাকা, সেটা আমরা দিচ্ছি ৯.৮০ টাকায়। তারপরেও আন্দোলন! আন্দোলনে একটা মজার বিষয় আছে, বাম আর ডান মিলে গেছে এক সুরে, এই তো? ভালো।
চলতি অর্থবছরে ৮.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখান থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে এ নিয়ে যাব। আমার এনার্জি লাগবে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ লাগবে। এখন লোডশেডিং নেই, সবাই বেশ আরাম আয়েশে আছে বলেই ভুলে গেছে অতীতের কথা। দশ বছর আগে কী অবস্থা ছিল?
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ অনুষ্ঠানেও বলেন, গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলে তিনি ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেননি। তার ভাষায়, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সেবার ‘গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে’ ক্ষমতায় আসেন। সেই বিএনপি সরকারের সময় ভারতকে পাইপ লাইন দিয়ে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আনার সুযোগ না দেওয়াও ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে মন্তব্য করেন আজকের প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমি থাকলে কী করতাম? পাইপ লাইনে তো গ্যাস নিতে দিতামই, আমি আমার ভাগটা রেখে দিতাম, যে আমাকে দিয়ে তারপর নিতে হবে। তখন যদি মিয়ানমার থেকে পাইপ লাইনে গ্যাস আনতে পারতাম, আর অর্থনৈতিক কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে আমাদের এখন এলএনজি আমদানি না করলেও চলত। কারণ সেখানে প্রচুর গ্যাসের রিজার্ভ আছে।
সেই গ্যাস এখন পাইপলাইনে করেই চীনে যাচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কতগুলি বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব যদি ভুল করে, বা সরকার যদি ভুল করে, তার খেসারত জনগণকে দিতে হয়।
এখন যে পরিমাণে দাম বাড়ানো হয়েছে, তারপরও বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলন যেহেতু করেছি, তাহলে একটা কাজ করি, যে দামে কিনব, সেই দামে বেচব। ৯ টাকার বদলে ৬১ টাকা দরে বেচব।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে হরতাল হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করে সরকার প্রধান বলেন, সমস্ত ট্যাঙ মাফ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষের কাছে যাতে সহজলভ্য হয়, আমি সেই ব্যবস্থাটা করেছি। তারপরও উনারা হরতাল ডাকেন, আন্দোলন করেন। খুব ভালো, বহুদিন পর হরতাল পেলাম তো, পরিবেশের জন্য ভালো, ধন্যবাদ।
প্রধানমন্ত্রী জানান, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চীন সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে। তাদের (চীন) কাছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। তাই বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা বিষয়টিও তারা বুঝতে পেরেছেন। তারা বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
তারা এ অঞ্চলে আগুন লাগানোর চেষ্টা করছে
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই অঞ্চলে ‘আগুন লাগানোর চেষ্টা করছে’ যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য ব্রাডলি শেরমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার একটি প্রস্তাব তোলেন।
তার প্রস্তুাবের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে শেখ হাসিনা বলেন, একটা দেশের ভেতরে এই ধরনের গোলমাল পাকানো, এটা কোনোমতেই ঠিক না। আর যেখানেই তারা হাত দিয়েছেন, সেখানেই তো আগুন জ্বলছে। কোথাও তো শান্তি আসেনি, বরং জঙ্গিবাদ সৃষ্টি হয়েছে এবং অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলটা; আমরা একটু শান্তিপূর্ণভাবে থাকার চেষ্টা করছি, এখানেও তাদের আগুন লাগানোর প্রচেষ্টা, এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য না।
তিনি বলেন, আমাদের যে সীমানা আছে, আমাদের যে দেশটা আমরা তাতেই খুশি। অন্যের জমি নিয়ে আসা বা অন্যের প্রদেশ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এটা আমরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করি। এটা আমরা কখনো নেব না। কারণ প্রত্যেক দেশ তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে। মিয়ানমার তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে তারা রাখাইন স্টেট জুড়ে দিতে চায় কেন? এই ধরনের কথা বলা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। অত্যন্ত অন্যায় কাজ বলে আমি মনে করি।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাকরিতে বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে যখন আলোচনা শুরু হয় তখনই আমি পিএসসির চেয়ারম্যানকে ডেকে এ বিষয়ে আলোচনা করি। কিন্তু এটা সম্ভব না। গত কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষায় পাসের পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একটু দেরি হলেও ১৬ বছরে এসএসসি, ১৮-তে ইন্টারমিডিয়েট, চার বছর অনার্স, এক বছর মাস্টার্স। সে হিসেবে ২৩-২৪ বছরে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারে। তিনি বলেন, কাজ করার জন্য একটা সময় থাকে, বয়স থাকে। একটা সময় পর তা আর হয় না।
ধর্ষণ বন্ধে পুরুষদেরও সোচ্চার হতে বলব
দেশজুড়ে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা সবসময় সব দেশেই আছে। তবে হ্যাঁ, এখন মেয়েরা সাহস করে নির্যাতনের কথাটা বলে। এর বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার তা নিচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে তাদের (অভিযুক্ত) ধরা হচ্ছে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের জঘন্য কাজ যারা করছে, তারা মানুষ না। এক্ষেত্রে পুরুষ সমাজকেও বলব, তাদের এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়া উচিত।
বিদেশি ঋণের ফাঁদে পড়বে না বাংলাদেশ
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের ফাঁদে পড়বে না। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু করছি। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও নিজস্ব অর্থায়নে নেওয়া হচ্ছে। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক বাড়লে আমেরিকার সঙ্গে কোনো সমস্যা হবে কিনা? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার দিয়ে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। আমরা এ নীতি মেনে চলেছি।
আমাদের ছেলেরা খেলেছে, সেটাই কম কী?
চলতি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের পারফরমেন্স নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ খেলায় যথেষ্ট উন্নতি করেছে। বিশ্বের নামিদামি টিমের সঙ্গে খেলে হারিয়ে দিচ্ছে, কম কথা না। তাদের পারফরমেন্স ভালো ছিল। সাকিব একটা স্থান করে নিয়েছে, মোস্তাফিজ নিয়েছে। আমি দোষ দেব না, আসলে খেলায় ভাগ্যও লাগে। তবে সাহস নিয়ে মোকাবিলা করার প্রশংসা করি তাদের।

x