উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারে আনতে কার্যকর ‘পলিসি সাপোর্ট’ তৈরি করতে হবে

বিএসইসি রজত জয়ন্তীতে ভূমি প্রতিমন্ত্রী

আজাদী প্রতিবেদন

শুক্রবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:৫৫ পূর্বাহ্ণ
58

ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেছেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ দীর্ঘ মেয়াদে অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রে তারা পুঁজিবাজারের দিকে ঝুঁকে। শুধুমাত্র স্বল্প মেয়াদের ক্ষেত্রে তারা ব্যাংক ঋণ নেয়। কিন্তু আমাদের দেশে সেটি দেখা যায় না। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের পেছনে দৌঁড়ায়। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) রজত জয়ন্তী উপলক্ষে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, পুঁজিবাজারের পলিসি সাপোর্টে আমাদের দুর্বলতা রয়েছে। রেগুলারিটি অথরিটির (নিয়ন্ত্রক সংস্থা) যে ভূমিকা পালন করার কথা সেটি অনেক ক্ষেত্রে তারা করতে পারেনি। বিশ্বের অনেক দেশে পুঁজিবাজারের ওপর তাদের অর্থনীতির উঠানামা করে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটি পরিলক্ষিত হয় না। আমাদের দেশের টোটাল ইকোনোমিক ইনডিকেশনে পুুঁজিবাজারের উঠানামা খুব বেশি প্রভাব রাখে না। উল্টো অনেক সময় আমরা শুনি কোম্পানি অনেক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। তারপরও পুঁজিবাজারে ওই কোম্পানির ট্রেড হচ্ছে। এ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। সর্বোপরি কার্যকর একটি পলিসি সাপোর্ট তৈরি করে উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

ভূমিপ্রতিমন্ত্রী বলেন, যেসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিনিয়োগকারীদের ঠিকমতো ডিভিডেন্ট দেয়, তাদের নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিকরণ সহজ করতে হবে। তাদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। আমাদের দেশে গার্মেন্টস শিল্প অর্থনীতির আরেকটির লাইফ লাইন।

চট্টগ্রামের অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময় আমি চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ছিলাম। তখন থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের করার কথা বলে আসছিলাম। কিন্তু দু:খজনক হচ্ছে, এত বছর পরেও সেটি আমরা করতে পারিনি। এখন আমাদের মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ফ্লাইট ছাড়া আর কোনো দেশের ফ্লাইট চালু নেই। আমাদের চট্টগ্রামে একটি ফাইভ স্টার হোটেলের অভাব ছিল। রেডিসন ব্লু সেই অভাব পূরণ করেছে। আমি কিছুদিন আগেও আর্মি চীফকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রেডিসন ব্লু’র অবস্থা কী? তিনি আমাকে জানালেন, এখনো লোকসান দিয়ে চালাতে হচ্ছে।

সেমিনারে সিএসই পরিচালক মেজর (অব.) মো. এমদাদুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও পলিসি মেকিং থেকে শুরু করে সবকিছু ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়। চট্টগ্রামে যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা সে অনুযায়ী তেমন কিছুই হয়নি। চট্টগ্রাম এমন একটি নৈসর্গিক লীলাভূমি যেখানে একই সাথে সমুদ্র ও পাহাড় রয়েছে। ভৌগলিক দিক থেকেও চট্টগ্রামের গুরুত্ব অনেক বেশি। চট্টগ্রাম বন্দরের যেরকম গতিশীলতা বাড়ানোর দরকার ছিল সেটি আমরা বাড়াতে পারিনি।

তিনি আরো বলেন, ধীরে ধীরে কর্ণফুলী চ্যানেলে পলি জমে ভরে যাচ্ছে। কথা ছিল, কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে কয়েক লাখ ট্রাক মাঠি সরিয়ে নেয়া হবে। ড্রেজিং হয়েছে ঠিকই, সব মাঠি কর্ণফুলীর পাড়ে ফেলে নদী সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। এসব জায়গায় পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। কর্ণফুলীর ড্রাফট (গভীরতা) কমছে, পানি নিষ্কাশন করতে পারছে না। ঠিকাদার টাকা নিয়ে মালয়েশিয়া চলে গেছে। বড় জাহাজ বহির্নোঙরে বসে থাকে। ব্যবসায়ীরা লাইটার (ছোট) জাহাজ পাচ্ছে না, ঘাট খালি পাচ্ছে না।

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় দেশের পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজধানীতে নয়। যেমন, ভারতের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অফিস নয়াদিল্লীতে নয়, মুম্বাইয়ে। একইভাবে পাকিস্তানে করাচিতে, চীনে সাংহাইয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অফিস নিউইয়র্কে। কিন্তু আমাদের দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অফিস ঢাকায়। ফলে ঢাকায় বিভিন্ন মিটিংয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য সিএসইর এমডি সাহেবকে সপ্তাহে ৫৬ বার ঢাকা আসাযাওয়া করতে হয়। একেকজন ডিরেক্টর ঢাকা যায় এয়ারপোর্টে একেকটি গাড়ি আসে। প্লেন ভাড়া, গাড়ি ভাড়া, হোটেল ভাড়া কোত্থেকে? আবার সিএসইর শেয়ার হচ্ছে ৩ শতাংশ। ঢাকার স্টক একচেঞ্জের শেয়ার ৯৭ শতাংশ হওয়ার পরেও তাদের এত খরচ করতে হয় না।

দৈনিক পূর্বকোণের পরিচালনা সম্পাদক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বাণিজ্যিক রাজধানী না হলেও চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক শহর করতে পারলেও খুশি হব। আমি বিদেশি নাগরিকত্ব নিইনি এদেশে প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বাঁচার জন্য।

মেজর এমদাদের বক্তব্যের সূত্র ধরে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, ফ্লাইওভার, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী এলএনজি টার্মিনাল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মিরসরাইয়ের স্পেশাল ইকোনমিক জোন, আউটার রিং রোডসহ বর্তমান সরকার চট্টগ্রামের উন্নয়নে যা করেছে ১৯৭৫ সালের পর আর কোনো সরকার করেনি। এটা আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি।

সিএসই পরিচালক ডা. মঈনুল ইসলাম মাহমুদের সভাপতিত্বে সেমিনারে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান, লোটাস সিকিউরিটিজের আবুল বাশার ভূঁইয়া। স্বাগত বক্তব্য দেন সিএসইর এমডি এম সাইফুর রহমান মজুমদার এবং সিডিবিএলের এমডি শুভ্র কান্তি চৌধুরী। এছাড়া বিশেষ অতিথির হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন বিএসইসির কমিশনার ড. স্বপন কুমার বালা, কীনোট স্পিকার ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন, প্যানেল আলোচক ছিলেন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি এমএ সালাম।

x